হুইলচেয়ারে বন্দি বালক। সামনে চলছে ইএসআই জোকা হাসপাতালের চিকিৎসদের বোর্ডের বৈঠক। উপস্থিত ডাক্তারেরা এক ঝলক বালককে দেখেই বলে উঠলেন, ‘‘এই রোগীকে ওষুধ দিয়ে কী লাভ? ওর তো সবরকম ক্ষতিই হয়ে গিয়েছে।’’ জিনঘটিত বিরল রোগ স্পাইনাল মাস্কুলার অ্যাট্রফি (এসএমএ টাইপ টু)-তে আক্রান্ত, বছর তেরোর কুশল চক্রবর্তীর সামনেই সে দিন কথাগুলো বলেছিলেন চিকিৎসকদের অনেকে।— ফোনে তা জানিয়ে থামলেন কুশলের বাবা কৌশিক চক্রবর্তী। বললেন, ‘‘পরের চার বছর ধরে শুধুই নানা বাহানায় ঘুরিয়ে গিয়েছে জোকার ইএসআই হাসপাতাল।’’
কৌশিকের দাবি, ২০২২ সাল থেকে টানা চার বছর ইএসআই কর্তৃপক্ষের কথামতো যাবতীয় নথি জমা করে এসেছেন তাঁরা। অথচ অভিযোগ, এসএমএ রোগের নির্ধারিত ওষুধ তো দূর, প্যারাসিটামল পর্যন্ত দেওয়া হয়নি তাঁদের এসএমএ আক্রান্ত ছেলেকে। এখন কুশলের মেরুদণ্ড অনেকটাই বেঁকে গিয়েছে। বাঁ হাত এবং দু’পা সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে হুইলচেয়ারে বন্দি তার জীবন। করোনার পর থেকে বন্ধ কুশলের স্কুলে যাওয়া। ঘন ঘন ফুসফুসে সংক্রমণ, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়ায় ভুগতে হয় কুশলকে। এর জেরে সে হাসপাতালে ভর্তিও হয় মাঝেমধ্যেই।
পেশায় ব্রডব্যান্ড সংস্থার কর্মী কৌশিক। বহরমপুরে স্ত্রী এবং দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে থাকেন। মাসে মাত্র ১৫ হাজার টাকা রোজগারে ছেলের চিকিৎসা করাতে নাজেহাল অবস্থা পরিবারের। কুশলের চিকিৎসার জন্য গাড়ি ভাড়া করে কলকাতায় আসতেই প্রতি বার খরচ হয় হাজার আটেক টাকা।
কৌশিক জানাচ্ছেন, ইএসআই থেকে বলা হয়েছিল, কুশলের রোগ নির্ধারণ করে ওষুধের নাম-সহ প্রেসক্রিপশন সরকারি হাসপাতাল থেকে লেখাতে হবে। সেই মতো তথ্য জমা দিলে কয়েক মাস পরে পরিবারকে বলা হয়, প্রেসক্রিপশনে দু’রকমের কালি আছে, তাই সব বাতিল। যা আদতে দু’জন চিকিৎসকের পেনের কালি। এক জন ডাক্তার লিখেছিলেন রোগীর অসুস্থতার ইতিহাস এবং অন্য জন ওষুধের নাম। ফের নতুন করে সব কিছু যখন জমা করা হল, তখন বলা হয়, এসএসকেএমের রেয়ার ডিজ়িজ় পোর্টালে কুশলের নাম তুলতে হবে এবং সেই তথ্য জমা দিতে হবে। পোর্টালে নাম তুলিয়ে আবার সব কাগজ জমা দেওয়া হয়। ফের কর্তৃপক্ষের ‘আবদার’, সব নথিপত্র ইমেল করে দিলে দ্রুত ওষুধ মিলবে। ওষুধ এলে দ্রুত ডেকে নেওয়া হবে। সেই কাজও করা হয়।
পরে ইএসআই হাসপাতালে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, নিয়ম বদলেছে। প্রেসক্রিপশনে ‘মে বি’ শব্দবন্ধ রাখা যাবে না। ওষুধের নাম দিয়ে স্পষ্ট লেখা থাকতে হবে যে, সেই ওষুধ খেলে কুশল সুস্থ হয়ে যাবে। হাসপাতালের এমন দাবি শুনে বিস্মিত চিকিৎসকেরা।
কেন কুশলকে ওষুধ দেওয়ার প্রক্রিয়া এ ভাবে দীর্ঘায়ত করা হল? রাজ্যের ইএসআই হাসপাতালের ডিন নন্দকিশোর আলভা বলেন, ‘‘চার বছর আগে যখন কুশল ইএসআই হাসপাতালে আসে, তখন তার স্নায়ুর অনেকটাই ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। তখনও ওষুধ পেলে কাজ হত না। যেহেতু এসএমএ চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, তাই কঠোর নিয়মকানুন অনুসরণ করতে হয়। চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় সদর দফতর।’’
তবে কৌশিকের প্রশ্ন, ‘‘বিশ্বে অনেক বয়স্ক মানুষ এই রোগের ওষুধ পাচ্ছেন। সরকার তো লিখে দেয়নি যে, কত বছর পর্যন্ত রোগীকে ওষুধ দেওয়া হবে! ওষুধ নির্মাতা সংস্থাও এমন কিছু নির্দেশ দেয়নি বলেই জানি। তা হলে আমার ছেলে পাবে না কেন? কোন যুক্তিতে চিকিৎসকেরা ওষুধ থেকে বঞ্চিত করছেন কুশলকে?’’
শিশুরোগ চিকিৎসক সংযুক্তা দে বলেন, ‘‘হুইলচেয়ার বন্দি এবং স্কোলিয়োসিস আছে, এমন বহু রোগী এসএমএ-র ওষুধ পাচ্ছে। বিদেশে এবং এ দেশেও বহু পূর্ণবয়স্ক রোগী নিচ্ছেন এই ওষুধ। ওষুধ যত তাড়াতাড়ি মিলবে, তত ফল ভাল হবে, এটা ঠিকই। কিন্তু দেরিতে ওষুধ পেলেও রোগীর স্কোলিয়োসিস, আঙুলের কাজ, শ্বাসের সমস্যা অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। হুইলচেয়ারে বন্দি হয়ে গেলে কী তার ওষুধ পাওয়ার কোনও অধিকার নেই! কুশলের মতো বয়সের রোগীকে ওষুধ না দেওয়াটা ঠিক সিদ্ধান্ত নয়।’’
কিয়োর এসএমএ ফাউন্ডেশন-এর সহ প্রতিষ্ঠাতা মৌমিতা ঘোষ বলছেন, ‘‘এসএমএ-র ওষুধ সারা বিশ্বে ১৮৫০০ জনের মতো রোগী পাচ্ছেন। সেই তালিকায় ৭৫ বছরের রোগীও আছেন। এ দেশে প্রায় ২০০ জন ওষুধ নিচ্ছেন, যাঁদের মধ্যে ১৫-২০ জন যথেষ্ট বয়স্ক। যতটা ক্ষতি হয়ে গিয়েছে, তা ওষুধ খেলেও ফেরানো যাবে না। কিন্তু পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া অবশ্যই আটকে দেয় ওষুধ। হাতের কাজ, যেমন খাওয়াদাওয়া, লেখা— এ সব ক্ষেত্রেও রোগীর উন্নতি হয়। স্কোলিয়োসিস হওয়া বাচ্চাদের উপরেও এই ওষুধের ট্রায়াল চলেছে। ট্রায়াল ৬০ বছর পর্যন্ত বয়সিদের উপরে হয়েছে। ফল যদি না-ই হয়, তা হলে কি কেউ ব্যবহার করতেন ওষুধ?’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)