E-Paper

চিকিৎসা বর্জ্যও চৌবাগা খালে, রাশ টানার উপায় এখনও অধরা

ওষুধের পাতা থেকে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, কাটা আঙুল থেকে ভ্রূণ— সবই পড়ে থাকতে দেখা যায় খালপাড়ে। অভিযোগ, আশপাশে থাকা একাধিক হাসপাতাল ও কারখানা থেকে রাতের অন্ধকারে খালে বেআইনি ভাবে ফেলে দেওয়া হয় শিল্প ও চিকিৎসা-বর্জ্য।

প্রবাল গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬ ০৬:৩১
স্তূপীকৃত: চৌবাগা খালের পাশে এ ভাবেই ফেলে যাওয়া হয় বর্জ্য।

স্তূপীকৃত: চৌবাগা খালের পাশে এ ভাবেই ফেলে যাওয়া হয় বর্জ্য। — নিজস্ব চিত্র।

কলকাতার পূর্ব প্রান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ চৌবাগা খাল। শহরের নিকাশি ব্যবস্থা ও পূর্ব কলকাতা জলাভূমি অঞ্চলের পরিবেশের ভারসাম্য-সহ একাধিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এই খালের। অথচ, সেই খাল আজ দূষণের ভারে জর্জরিত। প্লাস্টিক, শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য, এমনকি হাসপাতালের বিপজ্জনক চিকিৎসা বর্জ্যও নিয়মিত ফেলা হচ্ছে খালের জলে ও খালপাড়ে। অথচ কারা এই বর্জ্য ফেলছেন, তা চিহ্নিত করার মতো নজরদারি বা পরিকাঠামো নেই। ফলে বছরের পর বছর ধরে সমাধান হয়নি এই সমস্যার। প্রতিদিন আরও দূষিত হচ্ছে চৌবাগা খাল, যার জল শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিশছে বিদ্যাধরী নদীতে।

ওষুধের পাতা থেকে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, কাটা আঙুল থেকে ভ্রূণ— সবই পড়ে থাকতে দেখা যায় খালপাড়ে। অভিযোগ, আশপাশে থাকা একাধিক হাসপাতাল ও কারখানা থেকে রাতের অন্ধকারে খালে বেআইনি ভাবে ফেলে দেওয়া হয় শিল্প ও চিকিৎসা-বর্জ্য।

উল্লেখ্য, কলকাতার মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া খালগুলির মধ্যে দূষণের নিরিখে চৌবাগা খাল অন্যতম। কলকাতা পুরসভার ১০৮ ও ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে এই খাল। তার মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা ১০৮ নম্বর ওয়ার্ড সংলগ্ন অংশে।

সম্প্রতি ওই খালের পাড় পরিদর্শনে গিয়েছিলেন পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। খালের ধারে জড়ো হয়ে থাকা প্লাস্টিকের স্তূপ দেখে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তবে সেচ দফতরের একাংশের দাবি, সমস্যার মূল শুধু প্লাস্টিক নয়। ওই এলাকার বিভিন্ন কারখানা ও হাসপাতালের বর্জ্য প্রতিনিয়ত আরও তীব্র দূষণ ছড়াচ্ছে।

চৌবাগা খাল পরিষ্কার করতে নেমে বিভিন্ন সময়ে ভাঙা অ্যাম্পুলের কাচ এবং ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ফুটে জখম হয়েছেন সেচ শ্রমিকেরা। সেই ঘটনা সামনে আসার পর বিধানসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগে তৎকালীন সরকারের তরফে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, খালে নামানোর আগে শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা পোশাকের ব্যবস্থা করবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সংস্থা। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত এখনও কার্যকর হয়নি বলেই খবর।

সেচ আধিকারিকদের একাংশ জানান, খাল থেকে তোলা আবর্জনা কয়েক দিন রেখে শুকিয়ে নেওয়ার পর অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যেতে হয়। এর জন্য নির্দিষ্ট কিছু জায়গা রয়েছে। অভিযোগ, সেই সব জায়গাতেও বিভিন্ন সময়ে হাসপাতাল ও শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য ফেলে দেওয়া হয়। সেচ এবং কলকাতা পুরসভার আধিকারিকদের দাবি, খাল থেকে তোলা আবর্জনা বাছাইয়ের সময় হাসপাতাল বর্জ্যের মধ্যে ব্যবচ্ছেদ হওয়া মানবদেহের অঙ্গ থেকে ভ্রূণ পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে। পাশাপাশি রাসায়নিক বর্জ্যও প্রায়ই উদ্ধার হয়। সেচ দফতরের অভিযোগ, বেসরকারি হাসপাতালগুলি ঘিরে রয়েছে হোম-স্টে, হোটেল, লজ এবং খাবারের দোকান। অভিযোগ, ওই সব জায়গা থেকেও উৎপন্ন আবর্জনার একাংশ অনেক ক্ষেত্রে পুরসভার কর্মীরা সংগ্রহ করে সেচ দফতরের জমিতে ফেলে দিয়ে যান।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, চৌবাগা খালের জল বিভিন্ন ভেড়ির পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়। সেই সব ভেড়িতে এই খালের জল টেনে এনে পরিশোধনের মাধ্যমে মাছ চাষ করা হয়। এমনকি, আশপাশের কৃষিজমিতেও সেচের কাজে ব্যবহৃত হয় এই জল। ফলে দূষণের প্রভাব শুধু খালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; তা খাদ্যশৃঙ্খল এবং জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি করছে।

সমস্যা সমাধানে এখনও পর্যন্ত কার্যকর কোনও পদক্ষেপ করা যায়নি বলেই দফতর সূত্রের দাবি। এ নিয়ে সেচ দফতর ও কলকাতা পুরসভার মধ্যে একাধিক বার আলোচনা হলেও পরিস্থিতির বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। এমনিতেই খালপাড়ের বাসিন্দাদের একাংশের কারণেও সারা বছর বিভিন্ন খাল দূষিত হয়। অভিযোগ, প্লাস্টিক থেকে পশুর মৃতদেহ— বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলে দেওয়া হয়। এ নিয়ে বার বার সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হলেও উল্লেখযোগ্য ফল মেলেনি।

অন্য দিকে, নজরদারির জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও পরিকাঠামোর অভাবের কথাও স্বীকার করছেন আধিকারিকেরা। তাঁদের একাংশের দাবি, কলকাতা পুরসভা অতীতে চৌবাগা খালের আশপাশের হাসপাতাল ও কারখানাগুলিকে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু কারা নিয়মিত বর্জ্য ফেলছে, তা নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করা সম্ভব না হওয়ায় এখনও পর্যন্ত কোনও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। ফলে শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই খাল ক্রমশ আরও দূষিত হয়ে উঠছে, আর তার প্রভাব গিয়ে পড়ছে বৃহত্তর জলাভূমি ও নদী ব্যবস্থার উপরে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Chowbaga Canal Water pollution

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy