E-Paper

উদ্‌যাপন নয়, ছেলের জন্মদিনে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন স্বামীহারা স্ত্রী

নির্বাচনী ব্যস্ততা বাড়ার ঠিক আগে, গত ১৯ মার্চ আর জি করের লিফ্টে আটকে, থেঁতলে মৃত্যু হয় কালিন্দীর বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। অনেকেই মনে করেন, হাসপাতালের ভিতরে চিকিৎসক-পড়ুয়াকে খুন ও ধর্ষণের ঘটনার মতোই ভোটের আগে ফের বিঁধল আর জি কর-কাঁটা।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:৩১
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়।

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।

স্বামীর জন্মদিনটাই মৃত্যুদিন হয়ে গিয়েছে। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের লিফ্টে আটকে থেঁতলে যাওয়া স্বামীকে হারানোর ঠিক এক মাস পরে, শনিবার ছিল তাঁদের একমাত্র ছেলের জন্মদিন। কিন্তু কোনও উদ্‌যাপনের কথা ভাবেননি, বরং জন্মদিনেই যেন ছেলেকে আরও বেশি করে আগলে রাখতে চেয়েছেন স্বামীহারা মহিলা। বললেন, ‘‘সে দিনও বাড়িতে পায়েস হয়েছিল। আগের রাতে কেকও কাটা হয়। দিনটা যে এ ভাবে সব বদলে দেবে, ভাবিনি। আবার একটা জন্মদিন। এখন ছেলেই একমাত্র সম্বল। ভয় করে, যদি আবার কিছু খারাপ ঘটে যায়!’’ পরিস্থিতির কিছুই বোঝে না, সদ্য চার বছরে পা দেওয়া ‘বার্থডে বয়’। গত এক মাস জুড়েই ঘুরেফিরে আসতে থাকা প্রশ্নটা এ দিনও সমানে করে গিয়েছে সে— মা, বাবা কোথায়? কখন আসবে? কোথায় গিয়েছে? কবে কেক কাটা হবে? বাবা রিমোট গাড়ি কিনে দেবে তো?

নির্বাচনী ব্যস্ততা বাড়ার ঠিক আগে, গত ১৯ মার্চ আর জি করের লিফ্টে আটকে, থেঁতলে মৃত্যু হয় কালিন্দীর বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। অনেকেই মনে করেন, হাসপাতালের ভিতরে চিকিৎসক-পড়ুয়াকে খুন ও ধর্ষণের ঘটনার মতোই ভোটের আগে ফের বিঁধল আর জি কর-কাঁটা। অরূপের স্ত্রী সোনালির দাবি, তাঁদের সন্তান ছোট্ট আরুষের হাত ভেঙে যায় খেলতে গিয়ে। তাকে নিয়ে অরূপ ও সোনালি আর জি করে পৌঁছন। চিকিৎসকেরা আরুষের অস্ত্রোপচার প্রয়োজন বলে জানান। অস্ত্রোপচারের ঘরের বাইরে অপেক্ষা করার মধ্যেই শৌচাগারে যাওয়ার জন্য লিফ্টে ওঠেন অরূপ, তাঁর স্ত্রী এবং সন্তান। কিন্তু লিফ্টে আটকে পড়েন তাঁরা। এর পরে লিফ্টে থেঁতলে মৃত্যু হয় অরূপের। কোনও মতে সন্তানকে নিয়ে বেঁচে যান সোনালি। থেঁতলে যাওয়া অরূপের দেহ সোনালির গায়ের উপরেই পড়ে। অরূপের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্তে নামে। জানা যায়, ওই লিফ্টের রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকঠাক হচ্ছিল না। ঘটনার সময়ে লিফ্টকর্মী এবং নিরাপত্তারক্ষীদের কাউকেই প্রথমে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। এর পরে তড়িঘড়ি এসে লিফ্ট উপরে তুলতে গিয়ে দেখাই হয়নি, লোকজন কোথায়, কী অবস্থায় রয়েছেন। তাতেই থেঁতলে যান অরূপ। পুলিশ দুই নিরাপত্তারক্ষী এবং তিন জন লিফ্টকর্মীকে গ্রেফতার করলেও রক্ষীরা জামিন পেয়ে যান। জানা যায়, তিন জনকে লিফ্টে আটকে থাকতে দেখেও কোনও পুলিশকর্মী বা সিআইএসএফ অফিসার সাহায্য করেননি। প্রায় এক ঘণ্টা তাঁরা লিফ্টে আটকে থাকলেও তালা ভেঙে বার করে আনার চেষ্টাও করা হয়নি।

আপাতত এই মামলার বিচার শিয়ালদহ আদালতের অতিরিক্ত মুখ্য বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে চলছে। দুই নিরাপত্তারক্ষীর জামিনের বিরোধিতা করে পুলিশ শিয়ালদহের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালতে গিয়েছে। কিন্তু এক দফা শুনানি হলেও নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরে, অর্থাৎ, ৫ মে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সোনালির প্রশ্ন, ‘‘এত বড় ঘটনার পরেও কি কিছু বদলাল? মামলা কোন পথে চলছে, তা-ও বুঝতে পারছি না। আপাতত সকলেই ভোট নিয়ে ব্যস্ত। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নগুলি উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।’’

প্রসঙ্গত, আর জি করের ঘটনার পরে শহরের সমস্ত মেডিক্যাল কলেজে ঘুরে দেখা গিয়েছে, লিফ্টের বেহাল অবস্থা। বেশির ভাগ জায়গাতেই লিফ্টকর্মীর দেখা নেই। বিপদ হলে কী ভাবে সামাল দেওয়া যাবে, হাসপাতাল কর্মীদের মধ্যে তারও স্পষ্ট ধারণা নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, আর জি করের লিফ্টের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তাদের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে কি? মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কি হয়েছে? উত্তর মেলে না।

আরুষের ভাঙা হাতের এখন ফিজ়িয়োথেরাপি চলছে। পরিবারের ছোটদের সঙ্গে খেলে সময় কাটলেও বাবাকে খুঁজতে থাকা একরত্তির প্রশ্ন দিশাহারা করে দিচ্ছে পরিবারের সকলকে। কাকা জয় বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, ‘‘একান্নবর্তী পরিবারের মতো করেই থাকি। আমার ছেলে আর আরুষ পিঠোপিঠি বড় হচ্ছে। জন্মদিনে কেক কাটা, খেলা দেখা, ভাল খাওয়াদাওয়া হয়। কিন্তু এ বার আরুষের মা কিছুই করতে চাইল না।’’

এখনও পুরসভার অস্থায়ী কর্মীর কাজে যোগ দিতে পারেননি সোনালি। বললেন, ‘‘কী থেকে কী হয়ে গেল, এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। ছেলেটার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। ওকে বলার সাহস হচ্ছে না, বাবা, আজই তোর জন্মদিন। ভয় করছে, শুনলেই তো বলবে, বাবা আজও এল না?’’ কান্নায় ভেঙে পড়া মহিলা কোনও মতে বললেন, ‘‘কী করে বোঝাব, ওর বাবা আর কোনও দিনও আসবে না!’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

RG Kar Case RG Kar Medical College and Hospital Incident RG Kar Medical College And Hospital

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy