রক্তমাংসের ছোট্ট পুঁটলিটা প্রথম বার কোলে নিতে সকলেই বলে ওঠে, এ তো গোলাপি আভা বেরোচ্ছে। ছেলের কচি গায়ে হাত বুলিয়েই গোলাপি রং দেখেছিলেন লিসা বন্দ্যোপাধ্যায়।
চোখের আলো না-থাকলেও, মনের চোখে দেখতে অসুবিধে হয়নি তাঁর। সেই ছেলে এখন দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। মায়ের পথের বাধা সরাতে সে সাহায্য করছে। লিসা বলছেন, ‘‘আগে ব্রেলে কবিতা লিখতাম। এখন কম্পিউটারে লিখি। ছেলে একটা সফ্টওয়্যার ডাউনলোড করে দিয়েছে। লিখতে এখন আরও সুবিধা।’’
আলিপুরদুয়ারের সঞ্জু বর্মাও রাতদিন নেটের সামনে বুঁদ হয়ে থাকেন। ইউটিউব খুলে মন দিয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আবৃত্তি শোনেন। ছোটবেলায় বাবা কবিতা পড়ে শোনাতেন। বাবার স্বর ছুঁয়েই শব্দের মায়াজালে আচ্ছন্ন হন সঞ্জু। বছর পঁচিশের দৃষ্টিহীন যুবকের সামনে এখন কবিতার ভাঁড়ার খুলে দিয়েছে নেটরাজ্যের আবৃত্তির সংগ্রহ। কলকাতার এক প্রকাশনী সংস্থাও নিয়মিত আবৃত্তির রেকর্ডিং পাঠায়। এ সবের মাধ্যমেই চলছে ২৫ বছরের যুবকের কবিতা-চর্চা। প্রযুক্তি ও বন্ধুদের সহৃদয়তাই তাঁর ভিতরের কবিকে জিইয়ে রেখেছে।
নিছক চোখের আলোই কবিতা লেখার জন্য যথেষ্ট নয়। অন্তরের আলোই কবিতার প্রেরণা, তা বলে গিয়েছেন অনেক কবিই। কিন্তু যাঁদের চোখের আলো নেই, তাঁদের জন্য প্রযুক্তিও বড় বন্ধু হয়ে উঠতে পারে। বিভিন্ন ব্লাইন্ড স্কুল ও দৃষ্টিহীনদের সাহিত্যচর্চায় সহায়ক কিছু সংস্থা সেই প্রযুক্তির হাল-হদিস তাঁদের সামনে তুলে ধরছে। বৃহস্পতিবার শহরে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমিতে দৃষ্টিহীনদের কবিতা পাঠের আসরেও ফাঁকে ফাঁকে উঠে এল এমন নানা প্রসঙ্গ।
ক্যালকাটা ব্লাইন্ড স্কুলের ছাত্রী থেকে শিক্ষক হয়েছেন লিসা। তিনি বলছিলেন, ‘‘দৃষ্টিহীনদের কবিতা-চর্চা আগের থেকে সহজ হয়েছে।’’ দৃষ্টিহীনদের কবিতার বইয়ের প্রকাশক এক সংস্থার কর্তা সত্যজিৎ মণ্ডল বলছিলেন, ‘‘দৃষ্টিহীন লেখকদের মধ্যে যোগসূত্র গড়ে তোলাটা খুব জরুরি। নিজেদের মধ্যে মেলামেশা থেকে পরস্পরের অসুবিধেটা বোঝা যায়। সাহায্যের রাস্তাও খুলে যায়।’’ লিজা-সঞ্জুদের মতেও, কবিতা পাঠের আসর এই দিক থেকেও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কসবার বীথিকা সরকার বললেন, জন মিল্টনের কথা। ছোটবেলায় কাকা শুনিয়েছিলেন, ‘প্যারাডাইজ লস্ট’-এর কিছু লাইন। যার মানে তখন ভাল বুঝতে পারেননি তিনি, কিন্তু কবি তাঁর মতো দৃষ্টিহীন শুনে চমকে উঠেছিলেন। বীথিকার কথায়, ‘‘দেখতে না পেয়েও কত কবি অবিস্মরণীয় সব সৃষ্টি রেখে গিয়েছেন। সুতরাং শুধু চোখে দেখতে না-পাওয়া সৃষ্টিশীলতার পথে বাধা বলে কেন ভাবব?’’
একেলে প্রযুক্তি এই কবিদের পাশে দাঁড়াতে বল-ভরসা হয়ে উঠেছে।