E-Paper

‘রেহাই কবে?’ কান্নায় ভেঙে পড়ে পুলিশকে প্রশ্ন দেবরাজের

তদন্তকারীদের দাবি, ৭০-৮০টি ফোন নম্বর জোগাড় করে দেবরাজের নাগাল পাওয়া গিয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ থেকে শুরু করে বাড়ির পরিচারিকা, জল দেওয়ার লোক— সকলের ফোন নম্বর জোগাড় করেছিল পুলিশ।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৬:১৯
দেবরাজ চক্রবর্তী।

দেবরাজ চক্রবর্তী। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

ছেলের অন্নপ্রাশন করার পরিকল্পনা ছিল ধুমধাম করে। কিন্তু তার আগেই রাজ্যে পালাবদল। একের পর এক মামলায় জড়িয়ে তাই হাই কোর্টের কাছে রক্ষাকবচ চেয়েছিলেন। সন্তানের কারণে স্ত্রী রক্ষাকবচ পেলেও রেহাই পাননি তিনি। তাই অন্নপ্রাশনের ৪৮ ঘণ্টা আগেই গা-ঢাকা দেন, যাতে ওই দিনটি জেলে কাটাতে না হয়। ‘ফেরার’ থেকে ওই দিন গ্রেফতারি এড়ালেও অন্নপ্রাশনে থাকা হয়নি। পুলিশ সূত্রের খবর, জেরার মুখে কান্নায় ভেঙে পড়ে তদন্তকারীদের এমনটাই জানিয়েছেন দেবরাজ চক্রবর্তী।

স্ত্রী অদিতি মুন্সি রাজারহাট-গোপালপুর কেন্দ্রের বিধায়ক হলেও ওই এলাকা আদতে দেবরাজের অঙ্গুলিহেলনেই চলত। পালাবদলের পরে স্থানীয়েরা প্রকাশ্যেই বলছেন সে কথা। বিধাননগর পুলিশ সূত্রের খবর, বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন মেয়র পারিষদ দেবরাজ বাগুইআটি থানার লক-আপে সাধারণ অভিযুক্তের মতোই রয়েছেন। সেই সূত্রেরই দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে দেবরাজ জানিয়েছেন, তাঁর পরিকল্পনা ছিল আত্মসমর্পণ করার। কিন্তু ছেলের অন্নপ্রাশনের দিন জেলে থাকতে চাননি। কাঁদতে কাঁদতে দেবরাজ এমনও জানতে চেয়েছেন যে, তাঁর কত দিনে মুক্তি হতে পারে?

তদন্তকারীদের দাবি, ৭০-৮০টি ফোন নম্বর জোগাড় করে দেবরাজের নাগাল পাওয়া গিয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ থেকে শুরু করে বাড়ির পরিচারিকা, জল দেওয়ার লোক— সকলের ফোন নম্বর জোগাড় করেছিল পুলিশ। গত বুধবার বাগুইআটি থানার পুলিশ ও বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) যৌথ ভাবে পুরুলিয়া থেকে দেবরাজকে গ্রেফতার করে। তোলাবাজি ও হুমকির যে সব অভিযোগ দেবরাজের বিরুদ্ধে উঠেছে, তাতে অনেকে জড়িত বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।

তাই দেবরাজের ঘনিষ্ঠদের সেই বৃত্তে নজর দিয়েছে পুলিশ। প্রয়োজন হলে তাঁদের তলব করা হতে পারে। বিধাননগর ছাড়াও দক্ষিণ দমদম পুরসভার একাধিক পুরপ্রতিনিধিও সেই বৃত্তে রয়েছেন বলে প্রাথমিক সূত্র এসেছে পুলিশের কাছে। রাজনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে তোলাবাজি সিন্ডিকেটের ক্ষেত্রেও তাঁদের ভূমিকা নজরে রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রের খবর।

পুলিশ সূত্রের খবর, ২০১৫ সালে ডি সি গ্লোবাল নামের একটি নির্মাণ সংস্থা খোলা হয়েছিল। যেটির অফিস দেবরাজের বাড়ি থেকেই চলত। সেই অফিস নিয়ে দেবরাজকে জিজ্ঞাসাবাদে জোর দিতে চায় পুলিশ। যদিও সেখানে ব্যবসা সংক্রান্ত কোনও পরিকাঠামো বা ব্যবসায়িক কাজ হতে দেখেননি বলে স্থানীয়দের দাবি। পুলিশের দাবি, সেই সংস্থার মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বেশ কিছু সূত্র মিলেছে। এখনও পর্যন্ত সংস্থার সম্পত্তির পরিমাণ যা জানা যাচ্ছে, তা যাচাই করা হচ্ছে। কী ভাবে সেই সম্পত্তি করা হল, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি, কয়েকটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সন্ধান পেয়েছেন তদন্তকারীরা। তাতে এখন উল্লেখযোগ্য কিছু পাওয়া না গেলেও বিধানসভা ভোটের আগে বিপুল পরিমাণ টাকার লেনদেন হয়েছিল বলে জেনেছে পুলিশ। একাধিক সম্পত্তি সংক্রান্ত সূত্র মিলেছে, যেগুলির সঙ্গে তোলাবাজির অর্থের যোগ থাকতে পারে বলেও অনুমান পুলিশের। এর পাশাপাশি, তোলাবাজির অর্থ কোথায় কোথায় কী ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সে সম্পর্কে জানার চেষ্টা চালাচ্ছেন তদন্তকারীরা। সেই অর্থ কোথাও বিনিয়োগ করা হয়েছিল কিনা, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রের খবর। এ নিয়ে শুক্রবার রাতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে দেবরাজকে। তাঁর কাছ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে, প্রশাসনিক পদে বদলিতে তাঁর ভূমিকার কথাও। কারণ, বদলি নিয়ে কথা বলতে সরকারি আধিকারিকেরা দেবরাজের কাছে যেতেন।

জুন মাসে বিধাননগরের এক প্রাক্তন পুরপ্রতিনিধির গুদামে গিয়ে একাধিক নথি-সহ বিভিন্ন সামগ্রী থাকার কথা জানিয়েছিলেন বিজেপি কর্মীরা। সেখান থেকে উদ্ধার হয়েছিল একাধিক জমির নথি, ডায়েরি। তোলাবাজি, সম্পত্তি কেনা, অর্থের লেনদেনের সঙ্গে ওই সব নথির যোগ রয়েছে কিনা, তা-ও খতিয়ে দেখতে চান সিটের আধিকারিকেরা।

এ দিকে, পুলিশকর্মীদের দেবরাজ ও তাঁর দলবলের হুকুম তামিল করতে বাধ্য করা হত বলে অভিযোগ উঠেছে পুলিশমহলে। যার জেরে বাগুইআটি থানার ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। দেবরাজের গ্রেফতারির পরে ওই পুলিশকর্মীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে বলে সূত্রের খবর।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Debraj Chakraborty TMC

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy