সংক্রমিত হওয়া থেকে মৃত্যু— নানা ভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে বার বার অভিযোগ করছেন করোনায় আক্রান্তের পরিজনেরা। এ বার খোদ প্রশাসনের অভ্যন্তরেই কর্তব্য নিয়ে দায় ঠেলাঠেলির জেরে করোনায় মৃতদের ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ পেতে চরম ভোগান্তি হচ্ছে বলে অভিযোগ। অভিযোগ উঠছে, সার্টিফিকেটে নাম, বয়স, ঠিকানার ভুলের পাশাপাশি কখনও কখনও মৃত্যুর তারিখ পর্যন্ত এক বছর আগের! অনেক পরিজনের দাবি, দু’-তিন মাস ঘুরেও শুনতে হচ্ছে, ‘‘পরে আসুন। ঝড়ের জন্য এখনও সার্টিফিকেটের ভুল শুধরে আসেনি। তাড়া থাকলে পেন দিয়ে ঠিক করে দেওয়া হবে।’’
ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার দায়িত্বে থাকা পুর প্রশাসকমণ্ডলীর সদস্য তথা পুরসভার স্বাস্থ্য দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতীন ঘোষ রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের দিকেই কার্যত আঙুল তুলে বলেন, ‘‘হাসপাতালগুলি এত ভুল তথ্য দিলে আমরা কী করব! এ দায় পুরসভার নয়।’’ পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগের এক আধিকারিক জানান, রোগীর মৃত্যুর পরে হাসপাতাল থেকে যে কাগজ দেওয়া হয় তাকে ‘এমসিসিডি স্লিপ’ (মেডিক্যাল সার্টিফিকেট অব দ্য কজ় অব ডেথ) বলা হয়। সেটি দেখেই পুরসভা ‘ডেথ রিপোর্ট বুক’-এ তথ্য তোলে এবং সার্টিফিকেট দেয়। ওই স্লিপে ভুল থাকলে সার্টিফিকেটেও ভুল হয়। হাসপাতালের দায় মেনে নিয়ে রাজ্য স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগমের আশ্বাস, ‘‘কোনও হয়রানিই বাঞ্ছিত নয়। মৃতের পরিবারের দেওয়া তথ্য যথাযথ ভাবে নথিভুক্ত করতে হাসপাতালগুলিকে দ্রুত নির্দেশ দিচ্ছি। গাফিলতি বরদাস্ত হবে না।’’
ভোগান্তির শিকার হওয়া অনেকেরই প্রশ্ন, পুরসভার নজরে গাফিলতি আগে ধরা পড়ে থাকলে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরকে তারা জানাল না কেন? পুরসভা এবং স্বাস্থ্য দফতরের প্রশাসনিক বোঝাপড়ার অভাবই কি এ জন্য দায়ী?
গত ১৫ দিনে পাঁচ বার ঘুরে বুধবারই সংশোধিত সার্টিফিকেট পেয়েছে উত্তর কলকাতার গোয়াবাগানের বাসিন্দা করোনায় এক মৃতের পরিবার। জ্বর, শ্বাসকষ্টে ভোগা ওই ব্যক্তিকে গত মাসে ১৫ দিন ধরে ঘোরানোর অভিযোগ উঠেছিল হাসপাতালের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, ভর্তির পরেও হাসপাতাল ভুল তথ্য দিয়ে জানিয়েছিল, রোগী পালিয়েছেন। রাতে বয়ান বদলে হাসপাতাল জানায়, রোগীর করোনায় মৃত্যু হয়েছে! মৃতের পুত্র এ দিন বলেন, ‘‘এখন ডেথ সার্টিফিকেট পেতেও হয়রানি চলছে।’’
করোনায় মৃতদের সৎকারের কাজ চলছে ধাপায়। কলকাতা পুরসভা সূত্রের খবর, ধাপার ওই এলাকা সাত নম্বর বরোর অন্তর্গত তপসিয়ার হিন্দু কবরস্থানের সাব রেজিস্ট্রার অফিসের অধীন। সাব রেজিস্ট্রার অফিস থেকেই করোনায় মৃতদের ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে। এ দিন ওই অফিসে গিয়ে দেখা গেল, দুপুরেও হাজির কয়েকটি পরিবার। বেলেঘাটার এক বাসিন্দা বলেন, ‘‘স্বামীর ৫২ বছর বয়স হয়েছিল। প্রথম দিন থেকে হয়রানির শুরু। অ্যাম্বুল্যান্স পেতে, সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাতে, এমনকি স্বামীর মৃত্যুর খবর জানতেও নাজেহাল হলাম। এখন ডেথ সার্টিফিকেট পেতে এই অবস্থা।’’ অফিস ঘরের দিকে দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘‘কখনও এঁরা বলেন, আমপানে সার্ভার উড়ে গিয়েছে, সার্টিফিকেট হবে না। কখনও সার্টিফিকেট দিলেও দেখি, স্বামীর নামের জায়গায় মৃত শ্বশুরের নাম লেখা। কখনও ৫২ বছরের লোককে লিখছেন ২৫ বছর!’’
কিছু দূরে দাঁড়ানো শোভাবাজার কানারাজাবাগান এলাকার বাসিন্দা আবার শঙ্কিত, করোনার সার্টিফিকেট নিতে এসেছেন জানলে পাড়ার লোক হয়তো বাড়িতে ঢুকতেই দেবেন না। তাঁর কথায়, ‘‘পাড়ার কল থেকে এখনও জল নিতে দেয় না। এখানে আসতেও ভয় হয়! এপ্রিল থেকে তবু ঘুরছি।’’
আরও পড়ুন: সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই খুলছে গণ শৌচালয়