সব মিলিয়ে ১৫০০ কেজির বেশি ভার হওয়ার কথা নয়। এর মধ্যে গাড়ির ওজনই প্রায় ৭০০ কিলোগ্রাম। অর্থাৎ, খুব বেশি হলে আরও ৭৫০ কেজি ভার চাপানো সম্ভব গাড়িটিতে। কিন্তু অভিযোগ, বিধিবদ্ধ এই নিয়ম উড়িয়েই শহরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ছোট মালবাহী লরি। ব্যস্ত সময়েও তেমন ভাবে পুলিশি নজরদারি থাকছে না। ফলে, কোথাও এমন লরি অতিরিক্ত ভার বহন করতে গিয়ে উল্টে যাচ্ছে, কোথাও মাত্রাতিরিক্ত ওজন বইতে গিয়ে সামনের চাকা প্রায় শূন্যে উঠে যাওয়ার পরিস্থিতি হচ্ছে।
কলকাতার নগরপাল সুপ্রতিম সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরেই পথ-বিধি মানতে বাধ্য করা এবং রাস্তায় নিরাপত্তা জোরদার করার উপরে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। পথে যাতে পর্যাপ্ত পুলিশকর্মী চোখে পড়ে, তা নিশ্চিত করার নির্দেশও দিয়েছেন বাহিনীকে। সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থায় না চলে পরিস্থিতি বুঝে পদক্ষেপের কথা বলেছেন ট্র্যাফিক পুলিশের কর্মীদের। অথচ, এরই মধ্যে পথে-ঘাটে নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে বেপরোয়া মালবাহী লরির যাতায়াত। পুলিশেরই একাংশের মতে, এমন লরি কখনও বেপরোয়া গতিতে ফুটপাতে উঠে পিষে দিয়েছে পথচারীদের, কখনও সিগন্যাল ভেঙে ধাক্কা মেরেছে উল্টো দিক থেকে আসা গাড়িতে। কখনও আবার সরাসরি ঢুকে গিয়েছে রাস্তার ধারের ঘরের দেওয়াল ভেঙে। কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের ধাক্কা মেরে পালানোর ঘটনাও ঘটেছে অনেক বার। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, পুলিশের কি নজরে পড়ে না এমন মাত্রাতিরিক্ত ভার বহনকারী লরি?
পরিবহণ দফতরের ইনস্পেক্টর এবং পুলিশ অফিসারেরা জানাচ্ছেন, এই মুহূর্তে বড় লরির চেয়েও বিপজ্জনক ছোট মালবাহী লরিগুলি। এমন লরির বিরুদ্ধেই মামলা হচ্ছে সব চেয়ে বেশি। এক পুলিশকর্তা জানান, ২০১৮ সালের জুলাইয়ে কেন্দ্র নিয়ম বদল করে জানায়, একটি ট্রাক ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত ওজন নিতে পারবে। একে বলা হয় ‘সেফ অ্যাক্সেল লোড’। কিন্তু সর্বভারতীয় ওই বিধি প্রথমে পশ্চিমবঙ্গে মানা হচ্ছিল না। রাজ্যের নিয়ম ছিল, ট্রাক তার বহন ক্ষমতা অনুযায়ী পণ্য তুলবে, অতিরিক্ত ভার নিতে পারবে না।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছিল, তিন-চার গুণ বেশি ওজন নিয়ে সব ধরনের লরি শহরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকারও কেন্দ্রের নিয়ম চালু করে। জানিয়ে দেওয়া হয়, মাত্রাতিরিক্ত ভার বহন করলে প্রথম বার ২০ হাজার টাকা জরিমানা এবং প্রতি টন অতিরিক্ত ওজনের জন্য দু’হাজার টাকা করে জরিমানা নেওয়া হবে। দ্বিতীয় বার একই অপরাধ করলে জরিমানার অঙ্ক দ্বিগুণ হবে, তৃতীয় বার অপরাধের ক্ষেত্রে পারমিট বাতিলের যে সংস্থান কেন্দ্রের আইনে রয়েছে, সেই পথে হাঁটা হবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ ও পরিবহণ দফতরের আধিকারিকেরা ১৯৮৮ সালের মোটর ভেহিক্ল আইনের ১৯৪ (১) এবং ১৯৪ (১এ) ধারায় মামলা করতে পারেন।
‘ফেডারেশন অব ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রাক অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সম্পাদক সজল ঘোষের দাবি, ‘‘ছ’চাকার লরি ১২ টন, ১০ চাকার লরি ১৮ টন, ১২ চাকার লরি ৩৫ টন, ১৪ চাকার লরি ৪২ টন এবং ১৬ চাকার লরি ৪৯ টন পণ্য বহন করতে পারে। ছোট মালবাহী লরির ক্ষেত্রে তিন টন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যায়।’’ কিন্তু পরিবহণ দফতরের এক কর্তার মন্তব্য, ‘‘মালিক ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের দাপটেই সব চলতে থাকে। পুলিশকেই আরও কড়া হতে হবে।’’
যার পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতা পুলিশের ট্র্যাফিক বিভাগের এক পদস্থ কর্তা বলেন, ‘‘অনেক সময়ে চোখে পড়বে না ভেবেই বড় লরির বদলে ছোট মালবাহী গাড়িতে সামগ্রী নিয়ে যাওয়া হয়। বড় লরির ক্ষেত্রে সময়ের যে বিধিনিষেধ আছে, সেটাও এতে এড়ানো যায়। কিন্তু এমন বেআইনি কাজ নিয়ে আলাদা কিছু পরিকল্পনা করা হয়েছে। নির্বাচনের আগেই সব রুখে দেওয়া হবে।’’ কিন্তু এত দিন কেন পদক্ষেপ করা হয়নি? তার অবশ্য স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)