বৃষ্টি হচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই, অথচ গরম কমছে না! দমবন্ধ পরিস্থিতিতে ঘেমেনেয়ে অস্বস্তির মধ্যে কাটাতে হচ্ছে। এই অস্বস্তিই প্রবল আতঙ্কে বদলে যাচ্ছে বৃষ্টির সঙ্গে মুহুর্মুহু বজ্রপাত শুরু হলে। গত কয়েক দিনে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের পরিস্থিতি এমনই। আতঙ্ক বাড়িয়ে একটি নির্দিষ্ট এলাকার কয়েক বর্গকিলোমিটারের মধ্যেই পর পর বাজ পড়ে চলেছে। গত সোমবার যেমন দক্ষিণ কলকাতার কসবা এবং আলিপুর সংলগ্ন এলাকায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ২০০টি বাজ পড়েছে বলে আবহাওয়া দফতর সূত্রের খবর। তার আগের সপ্তাহে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় এমন বাজ পড়ার সংখ্যা প্রায় ৬০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল!
ফলে প্রশ্ন উঠছে, বজ্রপাতে মৃত্যু এড়াতে কি যথেষ্ট প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন, সে সম্পর্কে কি যথেষ্ট প্রচার হয়েছে? চিন্তা বাড়িয়ে গত কয়েক বছরের মতো এ বছরেও বিভিন্ন জেলা থেকে বজ্রাঘাতে মৃত্যুর খবর আসতে শুরু করেছে।
আবহবিদেরা জানাচ্ছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বজ্রপাতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। হিমবাহ গলার ফলে বাতাসে জলীয় বাষ্প বাড়ছে। আর একটি কারণ তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত দূষণ। দূষণের মাত্রা যত বাড়ছে, গড় তাপমাত্রাও তত বাড়ছে। ফলে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হওয়ার আদর্শ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গেই একটি নির্দিষ্ট এলাকায় দ্রুত কিউমুলোনিম্বাস মেঘের সৃষ্টি হচ্ছে। অতি দ্রুত তৈরি হওয়া ওই মেঘের স্তম্ভের সান্নিধ্য পেয়ে বাতাসে ভাসমান কণা প্রবল বজ্রপাতের পরিস্থিতিতে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে।
আবহাওয়াবিদদের দাবি, বন্যা, ঝড়, ভূমিকম্প, অতিরিক্ত গরম বা শীত প্রভৃতি প্রাকৃতিক কারণের তুলনায় বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হয়। তাই এ ক্ষেত্রে ভয় আরও বেশি। ২০১৬ সালের বর্ষায় মাত্র এক দিনে বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও ঝাড়খণ্ডে প্রায় ৮০ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। অপরাধ ও অপমৃত্যু সম্পর্কিত সরকারি পরিসংখ্যান ‘ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস বুরো’ বা এনসিআরবি-র রিপোর্ট বলছে, ভারতে প্রতি বছর অন্তত দেড় হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বজ্রপাতে। ২০২০-’২১ সালের পরিসংখ্যান বলছে, ওই বছর গোটা দেশে বজ্রপাতে যত জন মারা গিয়েছিলেন, সেই সংখ্যা ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ধস, হিট স্ট্রোক বা ঠান্ডায় মৃত্যুর সংখ্যার চেয়ে ঢের বেশি। সর্বশেষ প্রকাশিত এনসিআরবি-র রিপোর্ট অনুযায়ী, এ দেশের সবচেয়ে ঘাতক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসাবে উঠে এসেছে বজ্রপাত। প্রতি বছর বজ্রপাতে ২,৮০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে যত মৃত্যু ঘটছে, তার ৩৬ শতাংশই হচ্ছে বজ্রাঘাতের ফলে।
নাগরিকদের একাংশের দাবি, বহু ক্ষেত্রেই বজ্র এক জন, অথবা মাত্র কয়েক জন ব্যক্তিকেই একটি নির্দিষ্ট দিনে আঘাত করে। তাই বন্যা, ভূমিকম্পের মতো তা যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। বজ্রপাতে মৃত্যু এড়ানো যে সম্ভব, সেই ধারণাই হয়তো অনেকের নেই। প্রশ্ন উঠছে, আধুনিক পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে কোনও অঞ্চলকে কেন আগাম ‘বিপদসঙ্কুল এলাকা’ বলে সতর্ক করা হবে না? কিন্তু সরকার এই পরিস্থিতিতেও শুধুই সতর্ক হওয়ার বার্তা দিয়ে কাজ সারছে বলে অভিযোগ।
চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, বজ্রাঘাতে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) হয়ে যেতে পারে। দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই বজ্রাঘাতের শিকার কাউকে ছুঁয়ে না দেখার কথা শোনা যায়। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, বজ্রাঘাতে আহতকে ছুঁলেই বিপদ ঘটবে, এমনটা নয়। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার থেকে এটা একেবারেই আলাদা। সেই সঙ্গে জানানো হচ্ছে, বজ্রগর্ভ মেঘের সঙ্গে বৃষ্টিপাত যখন হবে, তখন যতটা সম্ভব ফাঁকা জায়গা এড়িয়ে চলতে হবে। কোনও উঁচু বাড়ি বা গাছের পাশ থেকেও সরে আসা উচিত। জমিতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের দ্রুত পাকা ছাউনির নীচে সরে আসতে হবে। না পারলে হাঁটু মুড়ে বসতে হবে জমিতেই। যাতে আশপাশের কিছুর থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উচ্চতা বেশি না হয়। কিন্তু কখনওই শুয়ে পড়া চলবে না। বাড়িতে থাকলে ওই সময়ে ধাতব জিনিসের ব্যবহার এড়াতে হবে। বেসিনের কলের মাধ্যমেও বিদ্যুৎ পরিবাহিত হয়ে বিপদ ঘটতে পারে। কাঠ যে হেতু কুপরিবাহী, তাই কাঠের খাটে থাকা যেতে পারে। কিন্তু কোনও ব্যক্তির নিজের নেওয়া এই সমস্ত সতর্কতামূলক পদক্ষেপের পাশাপাশি, প্রয়োজনীয় সরকারি পদক্ষেপ দেখা যাবে কবে? প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)