দমদম জংশন স্টেশন যা পারেনি, তা-ই করে দেখাল যাদবপুর স্টেশন। সেটা সম্ভব হল হকারদের পাশে দাঁড়িয়ে সব পক্ষের রাতভর আন্দোলন আর সম্মিলিত অবস্থানের জোরে। সেই জোরালো প্রতিবাদেই হকার উচ্ছেদ না করে সাময়িক ভাবে হলেও পুলিশকে বুলডোজ়ার নিয়ে ফিরতে হল। আপাতত যাদবপুর স্টেশন চত্বরের উচ্ছেদ আটকানো গেলেও স্টেশন চত্বরে ছড়িয়ে থাকা হকারদের আতঙ্ক যাচ্ছে না। কোনও পুর্নবাসনের ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ হলে কী হবে, সেই আতঙ্ক ঘুরছে হকার ও তাঁদের পরিবারে।
সপ্তাহ দুয়েক আগে যাদবপুর স্টেশন ফাঁকা করতে নোটিস পড়েছিল। স্টেশন চত্বর থেকে দশ দিনের মধ্যে বেআইনি হকারদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। চত্বর খালি করতে মঙ্গলবার রাত ১১টা নাগাদ যাদবপুর স্টেশনে আসে পুলিশ এবং জিআরপির বিশাল বাহিনী। নিয়ে আসা হয় বুলডোজ়ার। দমদম জংশন স্টেশন থেকে হকার উচ্ছেদের কায়দায় গোটা চত্বর ঘিরে ভাঙার তোড়জোড় শুরু হয়। সেই সময়েই বাধার মুখে পড়তে হয় পুলিশকে। সিপিএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে হকারেরা আন্দোলন শুরু করেন। আশপাশের বাঘা যতীন, বালিগঞ্জের স্টেশনের হকারদের একাংশ রাতেই যাদবপুর স্টেশনের পৌঁছে যান। বুলডোজ়ার আটকে দিয়ে উপস্থিত আধিকারিকদের সঙ্গে শুরু হয় আলোচনা।
১৯৮৮ সালে যাদবপুর স্টেশন চত্বরের উচ্ছেদ নিয়ে আদালতের নির্দেশ দেখানো হয় উপস্থিত আধিকারিকদের। দীর্ঘ আন্দোলনের চাপে কার্যত বাধ্য হয়ে রাত তিনটে নাগাদ পিছু হটেন রেলের আধিকারিকেরা। উচ্ছেদ না করে দু’সপ্তাহ সময় দিয়ে তাঁরা ফিরে যান। আদালতের নির্দেশ সম্পর্কিত যাবতীয় কাগজপত্র দ্রুত জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও খবর।
রাতভর আন্দোলনে আপাতত উচ্ছেদ আটকানো গেলেও এর কৃতিত্ব সাধারণ মানুষকেই দিচ্ছেন সিপিএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য। এ দিন তিনি বললেন, ‘‘সকলের প্রচেষ্টায় আপাতত সময় পাওয়া গিয়েছে। পরবর্তী সময়ে আইনি লড়াই ও আলাপ-আলোচনার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। এটা গরিব মানুষের রুটিরুজির প্রশ্ন। পুনর্বাসন ছাড়া কোনও ভাবেই হকার উচ্ছেদ করা যাবে না। এ জন্য প্রতিদিন যদি রাত জাগতে হয়, সকলকে নিয়ে জাগব।’’
১৯৮৮ সালে যাদবপুর স্টেশন চত্বরে উচ্ছেদের নোটিসের পরিপ্রেক্ষিতে মামলা হয়েছিল। সেই বছরে মণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়ার মামলায় কলকাতা হাই কোর্টের তৎকালীন বিচারপতি কে এম ইউসুফ রায় দিয়েছিলেন, মামলাকারী ব্যবসায়ীরা রেলের জমি দখল করেননি। বরং, ১৯৫০-’৫১ সাল থেকে বাণিজ্যিক জমিতে নিয়মমাফিক ব্যবসা করছিলেন। এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ নোটিস দিয়ে মামলাকারীদের জীবিকার ক্ষতি করা চলবে না। বরং তাঁদের সরাতে হলে বিকল্প জায়গার বন্দোবস্ত করতে হবে। মামলাকারীরা জানিয়েছিলেন, ১৯৮১ সালে রেল ওই বাণিজ্যিক জায়গা নিজেদের প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের জন্য নিতে চেয়েছিল। তার বদলে মামলাকারীদের নতুন বাণিজ্যিক প্লট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত এবং বাণিজ্যিক প্লটের নকশাও মামলাকারীরা কোর্টে জমা দিয়েছিলেন।
বুধবার যাদবপুর স্টেশনে গিয়ে দেখা গেল, দুপুর পেরিয়ে গেলেও এক এবং দু’নম্বর
প্ল্যাটফর্মের অধিকাংশ দোকান বন্ধ। হাতে গোনা কয়েকটি দোকান শুধু খোলা। সেই সব দোকানেও অবশ্য জিনিসপত্র বিশেষ নেই। ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে দোকান রয়েছে স্বপন ঘোষের। রাতভর আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলেন এক জুতো বিক্রেতা। তিনি বলেন, ‘‘প্রায় ৫০ বছর বয়স আমার। ২৫ বছরের বেশি দোকান চালাচ্ছি। এখন বলছে উঠে যেতে। পরিবার নিয়ে পথে বসা ছাড়া উপায় নেই।’’ রেল স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন বস্তিতে দুই মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন যতীন দাস। স্টেশনেই জামা-কাপড়ের দোকান রয়েছে যতীনের। বেড়ার ঘরে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘‘স্টেশনের দোকান থেকে যা আয় হয়, তাতেও ঠিক করে সংসার চলে না। কোনও মতে মেয়ে দুটোকে বড় করছি। এই বয়সে এসে বিকল্প কাজ খোঁজা কি আদৌ সম্ভব?’’
বুধবার রাতে উচ্ছেদ আপাতত ঠেকানো গিয়েছে। কিন্তু আদৌ কত দিন তা আটকে রাখা সম্ভব, সেই প্রশ্ন ঘুরছে ব্যবসায়ীদের মনে। এক ব্যবসায়ীর কথায়, ‘‘রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে অসম লড়াই কত দিন চালিয়ে যেতে পারব জানি না।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)