রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই গ্রেফতার হচ্ছেন তৃণমূলের একের পর এক নেতা-নেত্রী। আর্থিক দুর্নীতি, সরকারি অর্থ নয়ছয়, হিসাব-বহির্ভূত আয়, সাধারণ মানুষকে হুমকি ও মারধর— এমন অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। ধৃতদের মধ্যে অনেকেই ভোটের আগে এবং পরে বিভিন্ন হিংসার ঘটনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ। গত ২২ মে থেকে ৩ জুনের মধ্যে কলকাতা পুরসভার চার জন পুরপ্রতিনিধি গ্রেফতার হয়েছেন। ২২ মে গ্রেফতার হন ১২৩ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি সুদীপ পোল্লে, ২ জুন গ্রেফতার হয়েছেন ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি শচীন সিংহ এবং ১০৬ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি অরিজিৎ দাসঠাকুর। এর পরে বুধবার রাতে তোলাবাজি, হুমকি দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন ৪২ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি মহেশকুমার শর্মা। তাঁকে গ্রেফতার করে বড়বাজার থানার পুলিশ। ধৃতের বাড়ি পোস্তা থানার কটন স্ট্রিটে।
বুধবার সরকারি আইনজীবী সৌরীন ঘোষাল আদালতে বলেন, ‘‘তোলাবাজি এবং প্রতারণার জন্য অরিজিতের একটি নিজস্ব বাহিনী ছিল। দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে। তাই ওঁকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া প্রয়োজন।’’ অরিজিতের আইনজীবীদের তরফে জামিনের আবেদন জানানো হয়। সরকারি আইনজীবী বলেন, ‘‘অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ উঠে এসেছে। তিনি দুর্গাপুজোর চাঁদা বাবদ অনলাইনে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়েছেন। এই বিষয়েও তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।’’ বিচারক ১২ জুন পর্যন্ত অভিযুক্তের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।
২০২১ সালের ভোট-পরবর্তী হিংসা, তোলাবাজি এবং প্রতারণার অভিযোগে গত মঙ্গলবার সকালে ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি শচীন সিংহ গ্রেফতার হন। সে দিনই গভীর রাতে গ্রেফতার হন অরিজিৎ। গত ১ ও ২ জানুয়ারি অরিজিতের বিরুদ্ধে দু’টি নির্মাণ সংস্থার তরফে গরফা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। একটি সংস্থা তাদের অভিযোগে জানিয়েছে, পুরসভা থেকে নির্মাণের অনুমতি নেওয়া সত্ত্বেও অরিজিৎ ও তাঁর সঙ্গীরা ওই সংস্থার প্রতিনিধিদের হুমকি দিয়ে চার লক্ষ টাকা আদায় করেন। আবার শঙ্কর দাস নামে এক প্রোমোটার গরফা থানায় লিখিত অভিযোগে জানান, তিনি একটি তেতলা বাড়ি তৈরির জন্য পুরসভা থেকে যাবতীয় নকশা অনুমোদন করানো সত্ত্বেও অরিজিৎ ও তাঁর দলবল তাঁকে খুনের হুমকি দিয়ে প্রথমে ১০ লক্ষ টাকা দাবি করেন।
তাঁকে বলা হয়, টাকা না দিলে নির্মাণকাজ হবে না। শঙ্করের থেকে অরিজিৎ সাড়ে ছ’লক্ষ টাকা আদায় করেন বলে অভিযোগ।
পুলিশ অভিযোগ পেয়ে মঙ্গলবার রাতেই অরিজিৎকে গ্রেফতার করে। এ দিন তাঁকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুলিশের গাড়িতে তোলার সময়ে স্থানীয়েরা ‘চোর চোর’ স্লোগান দিয়ে ডিম ছোড়েন বলে অভিযোগ। অরিজিতের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, ফুটপাতে অবৈধ নির্মাণেও মদত দিতেন তিনি। যা নিয়ে আগেই পুলিশে অভিযোগ দায়ের হয়েছিল।
কলকাতার ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৩৮টি ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধিই তৃণমূলের প্রতীকে জিতে এসেছেন। রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ডামাডোল শুরু হয় পুরসভার অন্দরে। ইতিমধ্যেই দু’জন বরো চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেছেন। মঙ্গলবার মেয়র পারিষদের পদ থেকে সরে গিয়েছেন তারক সিংহ। পুরপ্রতিনিধিদের গ্রেফতারি শুরু হতেই বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাসিন্দারা তাঁদের বিরুদ্ধে নানাবিধ অভিযোগ উগরে দিচ্ছেন।
প্রসঙ্গত, এক ব্যবসায়ী বেহালার ১২৩ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি সুদীপ পোল্লের বিরুদ্ধে পুলিশে তোলাবাজির অভিযোগ করেন। ওই ব্যবসায়ীর দাবি, তাঁর কাছ থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা চাওয়া হয়। টাকা না-দিলে তাঁর দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ। তাঁর দায়ের করা সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার নির্দিষ্ট ধারায় এফআইআর দায়ের করে ঠাকুরপুকুর থানার পুলিশ। সুদীপকে ২২ মে রাতে গ্রেফতার করা হয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)