ঔপনিবেশিক কলকাতা শুধুই এক বাণিজ্যকেন্দ্রই ছিল না, ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর। সেই আভিজাত্য বজায় রাখতেই বিলেতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শহরে বসানো হত নানা ‘স্ট্রিট ফার্নিচার’ বা রাস্তার আসবাব। কলকাতার মোড়ে মোড়ে বসানো, ভিক্টোরীয় যুগের সৌন্দর্যবোধের ছাপ-মাখা, ঢালাই লোহার তৈরি এই সব সামগ্রী মনে করাত লন্ডন বা গ্লাসগো শহরের কথা। প্রথম দিকে সবই আসত বিলেত থেকে। পরে বেশ কিছু জিনিস তৈরি হতে শুরু করে হাওড়ার নানা কারখানায়।
ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে সন্ধ্যার ঝাপসা আলোয় শহরের বড় রাস্তার ধারে চোখে পড়ত গ্যাসের বাতির স্তম্ভ। ঢালাই কারখানা থেকে জাহাজে করে আসা, কারুকার্যময় এই লোহার স্তম্ভগুলো ছিল দেখার মতো। আলো জ্বালানোর কাজে নিযুক্ত কর্মী এক বাতি থেকে পরের বাতিস্তম্ভে ছুটতেন মই কাঁধে। কলকাতার মায়াবী সন্ধ্যায় ছড়িয়ে পড়ত আলোর আভা। কিছু বাতি বসানো ছিল ব্র্যাকেটের আকারেও (মাঝের ছবি)।
গড়ের মাঠের আনাচে-কানাচে ছিল সুদৃশ্য বেঞ্চ। লোহার মজবুত ফ্রেম আর কাঠের পাটাতনে তৈরি এই বেঞ্চগুলো এমন ভাবে বানানো, বাংলার বর্ষাতেও তাদের কিচ্ছুটি হওয়ার নয়। রাজকীয় আভিজাত্যে মোড়া বেঞ্চগুলি দেখে মনে হত, বিলেতের পার্কের একটা টুকরো বুঝি এসে পড়েছে কলকাতায় (উপরে, মাঝের ছবি)।
রাস্তার মোড়ে দেখা যেত লাল রঙের লেটার বক্স বা পিলার বক্স। বাক্সের নীচে খোদাই করা রাজকীয় প্রতীকটি মনে করিয়ে দিত, বাক্সের মধ্যে ফেলা চিঠি সাগর পেরিয়ে সরাসরি পৌঁছে যাবে লন্ডনে। সেই আমলের কয়েকটি ‘পেনফোল্ড’ পিলার বক্স আজও নিযুক্ত, এখনকার ডাক-পরিষেবায় (উপরে, ডান দিকের ছবি)। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল আভিজাত্য আর প্রকৌশলের মিশেলে তৈরি সিংহমুখো জলের কলগুলো (উপরে বাঁ দিকে)। সাম্রাজ্যের ক্ষমতার প্রতীক যেন তারা, নীচে খোদাই করা থাকত: ‘অপচয় কোরো না, অভাব হবে না’।
ঔপনিবেশিকতা আজ অতীত হলেও, এই শিল্পিত সামগ্রীগুলি অবহেলা সয়েও শহরের আনাচে-কানাচে টিকে রয়েছে, ঠাহর করলে তাদের দেখা মেলে। জঞ্জালের পাশে হেলে পড়া একটি পোস্টবক্সের লাল রং চটে গিয়ে মরচে বেরিয়ে এলেও, আজও সে চিঠি গিলে নিচ্ছে। কোনও ভাঙাচোরা লোহার বেঞ্চ আজও ক্লান্ত মানুষের ভার সইছে, কোনও সিংহমুখো কল দিয়ে আজও জল বয়ে চলেছে। আজ ১৮ এপ্রিল, বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস— শহরের বদলে যাওয়া ইতিহাসের এই সব সাক্ষীর গুরুত্ব ফিরে দেখার এই তো সুযোগ! প্রাসাদ-স্থাপত্যের জাঁকজমক নিয়ে আমাদের উৎসাহের বাইরে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে টিকে থাকা এই লড়াকু ‘স্ট্রিট ফার্নিচার’দের মধ্যে যদি প্রাচীন শহর কলকাতার ঐতিহ্যের প্রাণভোমরা পুনরাবিষ্কার করতে না পারি, তবে তা নিতান্ত দুর্ভাগ্যের হবে।
বেঁচে থাকার গল্প
স্রেফ একটা বাংলা দিনপঞ্জি নয়, এক জীবনদুয়ার। যা খুলে গেলে দেখা মেলে সুন্দরবনের মানুষের বেঁচে থাকার গল্প। বাদাবনের মানুষের রোজকার সংগ্রামে জড়িয়ে সহাবস্থানও: জঙ্গল নদী জোয়ার-ভাটা বনবিবি দক্ষিণরায় মনসামঙ্গলের পাঁচালির, প্রজন্মান্তরে ধরে রাখা আচার বিশ্বাস গল্পের উত্তরাধিকারের। দুর্যোগ, প্রকৃতির নির্দয়তায় চেনা ছন্দ নড়ে যায়, তার মাঝেও টিকে থাকে স্বপ্ন। নতুন বছর যেন সেই আশা, প্রতিশ্রুতি। দিনপঞ্জির প্রতি পাতায় সুস্মিতা দত্তের তুলিকলমে ফুটে উঠেছে এই জীবন। এক গৃহবধূর ভাবনা ও তুলির শিল্পিত অনুভব: বাদাবনের ধারে ঘর বেঁধে থাকা মানুষ, নদীতে ভেসে চলা মাঝিমাল্লা, গ্রামজীবনের সহজ গভীর সত্য। পাতায় পাতায় চিত্রকৃতিগুলি (ছবি) বলে সুন্দরবনের চেনা-অচেনা গল্প। ‘বনের ধারে ঘর: বঙ্গাব্দ ১৪৩৩’ নামের মিঠে ছবির দিনপঞ্জিটি বেরোল পয়লা বৈশাখে, আর্টসি: কফি অ্যান্ড কালচার ক্যাফে-তে প্রাসঙ্গিক আলোচনা করলেন জয়ন্ত কুমার পাল, শিল্পী নিজেও।
নেপথ্যনায়ক
ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের শেষ রেকর্ডিংয়ে তবলা সঙ্গত করেছিলেন, তখন সতেরোর কিশোর। এইচএমভি-তে এম এস শুভলক্ষ্মীর ভজনে ওঁর সঙ্গত শুনে জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ সযত্নে তবলা বেঁধে দিয়ে পাশে বসে পড়েন হারমোনিয়াম নিয়ে। স্টুডিয়োয় নজরুলগীতির রেকর্ড চলাকালীন বার বার ওঁর বাজনার তারিফ করেছেন আশা ভোঁসলে। মঞ্চে বাল্মীকিবেশী অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীবন্দনার সঙ্গে নেপথ্যে বীরবিক্রমে ঢাক বাজিয়েছেন পণ্ডিত বিপ্লব মণ্ডল। রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নৃত্যনাট্য যাঁর বাদনশৈলীতে রম্য, বহু সুরস্মৃতির সেই নেপথ্যনায়কের ষাট বছরের শিল্পীজীবন উদ্যাপন করছে ‘এখন ভাবনা’। শিল্পীসমাগমে, আগামী ১৯ এপ্রিল রবীন্দ্রসদনে বিকেল ৫টায়।
বঙ্গজয়গাথা
কলকাতার অদূরে প্রাচীন জনপদ বালি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধিভূমি। ২০১০ থেকে এখানে হয়ে আসছে বালি উৎসব। ষোড়শ বছরের উৎসব হয়ে গেল সম্প্রতি: বালি উৎসব সমিতি, বালি পৌরসভা ও কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের উদ্যোগে। উৎসবের অচ্ছেদ্য অংশ পত্রিকা উৎসব কথা এবং... নজর কাড়ছে তার বিষয়ভাবনায়— ‘বাঙালি, বাংলা ভাষা ও বঙ্গ সংস্কৃতি’। সম্প্রতি প্রয়াত গুণিজনের, সেই সঙ্গে ঐতিহাসিক ঘটনাবলিরও স্মরণ; বরেণ্যদের জন্ম ও প্রয়াণের শতবর্ষ, ১২৫ বছর ও সার্ধশতবর্ষে শ্রদ্ধার্ঘ্য, আবার উৎসবের রাগ রং শহর ফুল গান নিয়েও লেখালিখি; সর্বোপরি রাজনীতি বাণিজ্য শিল্পকলা সঙ্গীত চলচ্চিত্র নাট্য খেলা বিজ্ঞান চিকিৎসায় বাঙালির কীর্তিগাথা। নববর্ষে বড় প্রাপ্তি।
নব অবতার
বিশ্বব্যাপী ‘নব্য শাইলক’দের দাপট এখন, এ কি অত্যুক্তি? শেক্সপিয়রের শাইলক অর্থের বিকল্পে মানুষের মাংস কেটে নিতে চেয়েছিল, এ যুগের শাইলকরা বিপন্ন মানুষের সর্বস্ব লুটেও তৃপ্ত নয়, মানুষের ইতিহাস ঐতিহ্য থেকে শুরু করে তার সমগ্র সত্তা পণ্যায়িত করে বিকিয়ে দিতে ব্যগ্র। সাধারণ মানুষকে নানা প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে, শোষণ ও বঞ্চনার যূপকাষ্ঠে তাঁদের পীড়নের মর্মন্তুদ জীবনসত্যই উঠে এসেছিল শাহ্যাদ ফিরদাউসের উপন্যাসে। সেটিকে আশ্রয় করেই ‘বারাসত স্পন্দন’ নাট্যগোষ্ঠী মঞ্চে নিয়ে এসেছে নাটক শাইলকের বাণিজ্য বিস্তার, পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের পরিকল্পনা ও প্রয়োগে। নববর্ষের পরদিন হয়ে গেল গিরিশ মঞ্চে, আগামী ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রবীন্দ্রসদনে পরবর্তী অভিনয়।
সিনে-বন্ধন
শেষ এমন হয়েছিল দশ বছর আগে। মানে, কলকাতার চাইনিজ় কনসুলেট জেনারেল-এর আয়োজনে চিনা ছবির উৎসব। গতকাল থেকে নন্দন প্রেক্ষাগৃহে চলছে ‘কলকাতা-চায়না ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’, এ বার উৎসবসঙ্গী পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র কেন্দ্রও। চিনে ভারতীয়, বিশেষত হিন্দি মূলধারার ছবি, যেমন দেবদাস থ্রি ইডিয়টস দঙ্গল বজরঙ্গি ভাইজান ইত্যাদি খুব জনপ্রিয়, কলকাতার সিনেপ্রেমীরাও ঝাং ইমু, ওয়াং কার ওয়াই, অ্যাং লি থেকে জিয়া ঝাংকে-র মতো পরিচালকের ছবির সঙ্গে বিলক্ষণ পরিচিত। এই সিনে-বন্ধন দৃঢ় করতেই ছবি উৎসবের প্রত্যাবর্তন। গতকাল সন্ধেয় শুরু হল; আজ ও কাল দুপুর ১টা, সাড়ে ৩টে ও সন্ধে সাড়ে ৬টায় তিনটি করে চিনা ছবি: লাইক আ রোলিং স্টোন, নেভার সে নেভার, লাভ নেভার এন্ডস ইত্যাদি।
একে দুই
দেবভাষা বই ও শিল্পের আবাস নয় পূর্ণ করল পয়লা বৈশাখে। ছবি ও বইয়ের বাড়ি: প্রবাদপ্রতিম শিল্পীদের সান্নিধ্যে ধন্য, সমকালীন শিল্পী-স্বরে মুখর, শিল্প গল্প কবিতা উপন্যাস স্মৃতিকথার বই ও পত্রিকা প্রকাশে তৎপর। দশম বর্ষের যাত্রা-সূচনায় তাদের নতুন প্রদর্শনী ‘নাইনথ সিম্ফনি’: যামিনী রায় সোমনাথ হোর কে জি সুব্রহ্মণ্যন সনৎ কর রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় (ছবিতে ডান দিকে) গণেশ হালুই যোগেন চৌধুরী কৃষ্ণেন্দু চাকী মৈনাক চক্রবর্তীর চিত্রকৃতি নিয়ে; ১৮-৩০ এপ্রিল, রবিবার ও ছুটির দিন বাদে রোজ ২টো-৮টা। আবার এখানেই, একই তারিখ ও সময় মেনে ‘চিত্রলেখা চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’-এর নিবেদনে চলছে সর্বানী করের (১৯৩৯-২০১৯) শিল্পকৃতির প্রদর্শনী। পঞ্চাশের দশকে সরকারি আর্ট কলেজে পটারি ও বাটিকের পাঠ তাঁর, ক্রমে শিল্পী সনৎ করের সঙ্গে বন্ধুত্ব, পরে বিবাহ। কারুশিল্পই ছিল জীবনের ধ্রুবপথ, তাঁর সেরামিক বাটিক ট্যাপেস্ট্রি (বাঁ দিকের ছবি), কাঁথার কাজ: সবই অনুপম। প্রদর্শনীটি— শিল্পীর পুত্র সায়ণ করের সহায়তায়।
মাটির কন্যারা
পৃথিবীর আদিমতম শিল্প-উপাদান মাটি, সভ্যতার আদিলগ্ন থেকেই মানুষের সৃজনসঙ্গী। দেশের মাটি, ভাগের মাটি, ক্ষুন্নিবৃত্তির মাটি, প্রতিরোধের মাটি, এহেন বিবিধ চরিত্রে ও রূপে মাটির সঙ্গে সম্পর্ক আমাদের। রূপদক্ষ ভাস্কর অলকানন্দা সেনগুপ্তের শিল্পনির্মাণের প্রধান হাতিয়ারও মাটি। তাঁর অধিকাংশ মূর্তি পোড়ামাটির। মাটির নমনীয়তা বস্তুনির্মাণের সহায়ক; আগুনে পুড়িয়ে নেই নমনীয় ভঙ্গি যখন দৃঢ় হয়, তখনই সে হয়ে যায় প্রতিবাদের রূপক। মাটিতে একটি স্পর্শও বৃথা যায় না। অলকানন্দা কোমল মাটিকে গড়ে, খনিজ রঙে রঙিন করে, আগুনে পুড়িয়ে গড়েছেন বিপন্ন বিস্ময়। নববর্ষে তাঁর কাজের সাম্প্রতিক সম্ভার (ছবি) সাজিয়েছে ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’, তাদের ১২৭ যোধপুর পার্কের ঠিকানায় প্রদর্শনী ‘দ্য স্কাল্পটেড শি’। ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত, কাজের দিনে ১১টা-৮টা, রবিবার ১২টা-৮টা।
ভ্রমি বিস্ময়ে
জ্যোতির্বিজ্ঞানকে আমরা অঙ্ক ও টেলিস্কোপের সীমানায় বেঁধে রাখি, কিন্তু তলিয়ে ভাবলে তা মানব অস্তিত্ব ও মহাজগৎ নিয়ে অবাক বিস্ময়েরও উৎস; মানুষের কল্পনা ও সৃষ্টিশীলতায় তার প্রভাবও গভীর। কল্পবিজ্ঞান তো রয়েছেই, সাহিত্যের অন্য ধারা আর সিনেমাতেও তার ছাপ। দান্তে থেকে রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দের রচনায় মহাকাশ, নক্ষত্রপুঞ্জ মানুষের সত্তা, প্রেম, মহাজাগতিক চেতনার রূপক হয়ে ধরা দেয়। জ্যোতির্বিজ্ঞান হয়ে ওঠে মানবাত্মার প্রসারিত রূপ। পয়লা বৈশাখের বিকেলে ‘খোলামন’ ও এম পি বিড়লা তারামণ্ডলের যৌথ উদ্যোগে তারামণ্ডলে হয়ে গেল ব্যতিক্রমী আলোচনা, ‘জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে গড়ে ওঠা সাহিত্য ও সিনেমার সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’। বিজ্ঞান ও শিল্প-সংস্কৃতি জগতের গুণিজন আলো ফেললেন নানা দিক থেকে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)