Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

বাড়ির জঙ্গলে হাঁসফাঁস করবে মহানগর

আলো নেই, হাওয়া নেই। গরমে গুমোট, শীতে রোদ অমিল। গায়ে গায়ে লাগানো চারতলা, পাঁচতলা সব বাড়ি। এক বাড়ির জানলা দিয়ে হাত বাড়ালে পাশের বাড়ির জিনিস তু

নিজস্ব সংবাদদাতা
০৬ অগস্ট ২০১৪ ০৩:১৮
Save
Something isn't right! Please refresh.
Popup Close

আলো নেই, হাওয়া নেই। গরমে গুমোট, শীতে রোদ অমিল। গায়ে গায়ে লাগানো চারতলা, পাঁচতলা সব বাড়ি। এক বাড়ির জানলা দিয়ে হাত বাড়ালে পাশের বাড়ির জিনিস তুলে নেওয়া যায়।

এটাই পূর্ব কলকাতার তিলজলা-তপসিয়া এলাকার বর্তমান চেহারা।

মঙ্গলবার রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে শহরাঞ্চলে বাড়ি তৈরির জন্য যে নতুন নগর-নীতি ঘোষণা করেছে সরকার, তা কার্যকর হলে তিলজলা-তপসিয়াকে আলাদা করা কঠিন হবে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা। এ বার গোটা মহানগরের চেহারাই পূর্ব কলকাতার ওই এলাকার মতো হয়ে উঠতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন স্থপতি ও পরিবেশবিজ্ঞানীদের বড় অংশ।

Advertisement

পুরনো বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি করার ক্ষেত্রে ১০০% বাড়তি এফএআর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের অনেকেরই আশঙ্কা, এর ফলে উত্তর, মধ্য ও পূর্ব কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকা এবং দক্ষিণ কলকাতার কিছু অংশে ব্যাঙের ছাতার মতো বহুতল গড়ে উঠবে। সরু ঘিঞ্জি, আলোবাতাসহীন গলিঘুঁজির মধ্যে অবাধে বহুতল তৈরি হলে শহরের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের উপরে ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে বলে তাঁদের মত। এমনিতেই প্রোমোটার-রাজের ধাক্কায় নগর-পরিকল্পনার সঠিক পন্থা না মেনে বাড়ি তৈরির প্রবণতা এ রাজ্যে যথেষ্ট প্রবল। এ বার আইনি সিলমোহর সঙ্গে নিয়ে তা আরও জাঁকিয়ে বসতে পারে বলে অনেকেরই আশঙ্কা।

বিশেষজ্ঞদের মতে কোনও এলাকায় বাড়ি তৈরির আগে সেখানকার মাটির চরিত্র, গাছপালার সংখ্যা, আলো-হাওয়ার পরিমাণ, উপযুক্ত নিকাশি ব্যবস্থা ইত্যাদি মাথায় রাখা প্রয়োজন। একটি এলাকায় জনঘনত্বের কী অনুপাত থাকা উচিত, তা এলাকার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ-সুবিধার নিরিখেই নির্ধারিত হওয়ার কথা। কলকাতার মতো অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে ওঠা শহরে জনঘনত্বের এই ভারসাম্য বহু ক্ষেত্রেই ধরে রাখা যায়নি। রাজ্য সরকারের নয়া নীতি সেই ভারসাম্য আরও খানিকটা নষ্ট করে দিতে পারে। কলকাতা পুরসভার টাউন প্ল্যানিং বিভাগের প্রাক্তন ডিজি দীপঙ্কর সিংহ স্পষ্ট বলছেন, শহরের জন্য মাস্টার প্ল্যান না করে এফএআর (ফ্লোর এরিয়া রেশিও) বাড়ানো ঠিক নয়। ঘিঞ্জি এলাকায় কোনও দোতলা বাড়ি ভেঙে ওই একই পরিসরে চারতলা বাড়ি তুলে দেওয়ার জন্য আগাম পরিকল্পনা প্রয়োজন। নইলে শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে। নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য শিকেয় উঠবে। যার ফল মারাত্মক হতে পারে।

কী রকম?

ছোট, সরু গলিতে পুরনো একতলা-দোতলা বাড়ির জায়গায় ঢালাও বহুতল উঠতে শুরু করলে সেই এলাকার জনসংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাবে। তাতে চাপ পড়বে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও পরিষেবার উপরে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ প্রযুক্তিবিজ্ঞানের শিক্ষক অমিত দত্ত যেমন বলছেন, ঘিঞ্জি জায়গায় যে কোনও সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়। বেশি মানুষ বাস করলে বেশি পরিমাণে বর্জ্য তৈরি হবে। সেই বর্জ্য থেকে দূষণ ছড়ানোর আশঙ্কাও বাড়বে। কলকাতার আবহাওয়া এমনিতেই আর্দ্র। তায় আলো-হাওয়া খেলার জায়গা না থাকলে নোনা ধরার প্রবণতা বাড়বে। রোগ-জীবাণুর পোয়াবারো হবে। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গি, আন্ত্রিকের শহরে এটা খুবই চিন্তার বিষয় বলে মনে করছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। অমিতবাবু মনে করাচ্ছেন, মহানগরীর মাটির তলার নিকাশি ব্যবস্থা এত চাপ আদৌ নিতে পারবে কি না, সেটাও মাথায় রাখা প্রয়োজন। চাপ পড়তে পারে পানীয় জলের সরবরাহতেও। বিশেষত যে সব এলাকায় ভূগর্ভস্থ জলের উপরে নির্ভর করতে হয়, সেখানে এই সিদ্ধান্তে সঙ্কট হতে পারে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ওয়াটার রিসোর্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান আশিস মজুমদারের বক্তব্য, “কলকাতার যেখানে নদীর জল শোধন করে সরবরাহ করা হয়, সেখানে সমস্যা কম। পরিকাঠামোর উন্নয়ন ঘটালেই শুধু চলবে।” কিন্তু দক্ষিণ শহরতলির প্রায় পুরোটাই আর্সেনিক-প্রবণ। এখনও গঙ্গার পরিশোধিত জল পৌঁছয়নি। গভীর নলকূপই ভরসা। ভূগর্ভের জলস্তর এমনিতেই নামছে। এই অবস্থায় জনসংখ্যার চাপ বাড়লে আর্সেনিক সমস্যা গুরুতর আকার নিতে পারে বলে আশিসবাবুর আশঙ্কা।

টান পড়বে অক্সিজেনেও। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, রাজ্য সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এলাকাভিত্তিক অক্সিজেনের চাহিদা বাড়বে। কংক্রিটের জঙ্গল ঘন হবে, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গাছ বাড়বে কি? না হলে বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড জমে থাকার আশঙ্কা বাড়বে, কমবে অক্সিজেনের পরিমাণও। স্থপতি দুলাল মুখোপাধ্যায়ের কথায়, “উত্তর কলকাতায় যে ভাবে গায়ে গায়ে লাগানো বাড়ি রয়েছে, সেখানে এখনই হাওয়া খেলে না। এ বার সেই বাড়ি যদি আকাশের দিকে আরও উঠে যায়, তা হলে সমস্যা বাড়বে।”

আবার কেএমডিএ-র পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের প্রাক্তন ডিজি তুষার মিত্রের আশঙ্কা, “এমনিতেই শহরের রাস্তার প্রায় ৫০% দখল করে রেখেছে বড়-ছোট গাড়ি। এফএআর বাড়লে গাড়ির সংখ্যা আরও বাড়বে।” তাই ‘অন স্ট্রিট’ পার্কিং কমিয়ে ‘অফ স্ট্রিট’ করা দরকার। নইলে এফএআরের সুযোগ দিতে গিয়ে শহরের পথ-সমস্যা বাড়ানো হবে। কিন্তু ‘অফ স্ট্রিট’ পার্কিং আদৌ কতটা সম্ভব হবে, রয়েছে সে প্রশ্নও। কারণ পুরনো বাড়ি-সংলগ্ন বহু এঁদো গলিতেই গাড়ি ঢোকা দূরস্থান, পাশাপাশি দু’জন হাঁটাই দায়।

তবে নতুন নীতির ফলে বহু জরাজীর্ণ বাড়ির সংস্কারের পথ প্রশস্ত হবে, সেটা ফেলনা নয় বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। আইআইইএসটি (সাবেক বেসু)-র স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক অরূপ সরকার যেমন বলছেন, বহু বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। বহু জায়গায় ভাড়াটেরা ভাড়া দেন না। কোথাও অত্যন্ত অল্প ভাড়ায় থাকেন। “পুরনো বাড়ি ভেঙে শহরের নতুন রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টাটা ভাল।” কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর সতর্কবাণী, “দোতলা বাড়ি ভেঙে চারতলা করার সময়ে দু’পাশে ও পিছনের দিকে যথেষ্ট জায়গা ছেড়ে উপর দিকে বাড়ানো হলে তবেই এই পরিকল্পনার সুফল মিলবে।” নিউটাউন নগর পরিকল্পনার প্রাক্তন উপদেষ্টা সুনীল রায় মেট্রো করিডরের দু’পাশে বিল্ডিংয়ে এফএআর বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, “এটা ভাল, পেশাদারি সিদ্ধান্ত।”

কিন্তু পেশাদারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সচেতনতার একটা মেলবন্ধন প্রয়োজন বলে মনে করছেন বহু বিশেষজ্ঞই। তার জন্য চিকিৎসক, স্থপতি, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে একটি কমিটি গড়ে তাঁদের মতামতের ভিত্তিতে এগোনো উচিত ছিল বলে তাঁদের মত। রাজ্য সরকার সে পথে হাঁটেনি।


সবিস্তার দেখতে ক্লিক করুন



(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement