Advertisement
E-Paper

স্বস্তি নেই ভাঙা পায়ে বাঁচার রোজনামচায়

পার্ক স্ট্রিট থেকে হাজরা, হুইলচেয়ারে এই লম্বা রাস্তা পেরিয়ে মিছিল করছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা থেকে গোটা রাজ্যে ভোট প্রচারের মঞ্চে উঠছেন র্যাম্প দিয়ে।

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ১৬ মার্চ ২০২১ ০৬:৫৮
অমিল: শিয়ালদহ স্টেশনের প্রবেশপথে র‌্যাম্প থাকলেও শহরের বেশির ভাগ জায়গাতেই নেই এই সুবিধা।

অমিল: শিয়ালদহ স্টেশনের প্রবেশপথে র‌্যাম্প থাকলেও শহরের বেশির ভাগ জায়গাতেই নেই এই সুবিধা। ছবি: সুদীপ্ত ভৌমিক

পার্ক স্ট্রিট থেকে হাজরা, হুইলচেয়ারে এই লম্বা রাস্তা পেরিয়ে মিছিল করছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা থেকে গোটা রাজ্যে ভোট প্রচারের মঞ্চে উঠছেন র‌্যাম্প দিয়ে। প্লাস্টার-বন্দি ভাঙা পায়ের ছবি ভোটে তাঁর দলের শৌর্যের প্রতীক। টিভিতে মুখ্যমন্ত্রীর ভোট প্রচার দেখতে দেখতে দিল্লি বা বেঙ্গালুরুর কথা বলছিলেন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের শিক্ষিকা প্রিয়াঙ্কা দে।

‘‘শারীরিক প্রতিবন্ধীদের উপযোগী রেস্ট রুম (শৌচাগার) আমি দিল্লিতেই প্রথম দেখেছি। আর হুইলচেয়ারে বসে যাতায়াতের গাড়ি বা অ্যাপ-ক্যাব বেঙ্গালুরুতে আছে বলে জানতে পারি! ওখানেও সমস্যা আছে, তবে এখানকার পাবলিক স্পেসে (জনপরিসর) আমাদের মতো মানুষেরা এখনও প্রায় ব্রাত্য।’’— বলছিলেন ৮০ শতাংশ প্রতিবন্ধকতাযুক্ত সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত ওই তরুণী। প্রিয়াঙ্কার কথায়, ‘‘ভোট প্রচারের মঞ্চে র‌্যাম্প-ট্যাম্প দেখতে ভালই লাগে। তা বলে আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতাটা পাল্টে যাবে সেটা বিশ্বাস হয় না।’’

কর্মসূত্রে বেহালা থেকে কলেজ স্ট্রিট যাতায়াতের জন্য সাধারণ যানবাহন বা মেট্রোয় চড়ার সুযোগ হুইলচেয়ার-নির্ভর প্রিয়াঙ্কার জন্য নেই বললেই চলে। কারও সাহায্য নিয়ে অ্যাপ-ক্যাবে উঠে হুইলচেয়ারটা মুড়ে নিয়ে বসেন তিনি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ বছরের ছাত্রী-জীবন বা ২০১৩ থেকে প্রেসিডেন্সিতে শিক্ষকতা-পর্বও তাঁর জন্য মোটে সহজ হয়নি।

Advertisement

দিল্লিতে সমাজকর্মী মিনু অরোরা মণির জীবনটা তুলনায় মসৃণ। দিল্লির রাজপথে একা হুইলচেয়ারে বসে ঘোরাঘুরি কঠিন। কিন্তু রাজধানীর মেট্রো বিশেষ ভাবে সক্ষমদের জন্য উপযোগী। কলকাতায় ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো এই বিষয়টি মাথা রেখেছে। কিন্তু মাটির নীচের স্টেশনগুলিতে বা সাবেক পাতালরেলে হুইলচেয়ারে যাতায়াত অসম্ভব।

প্রিয়াঙ্কার কথায়, ‘‘বাংলা বা কলকাতায় হাতে গোনা র‌্যাম্প। কোথাও তা থাকলেও অনেক সময়ে জঞ্জালে ভর্তি বা বন্ধ থাকে। কিছু হাসপাতালে খাঁজ-কাটা র‌্যাম্পে হুইলচেয়ার আটকে যায়। হাত এবং পা ব্যবহারে আমার সমস্যা আছে। উপযুক্ত শৌচাগার পাই না। এ জন্য যাদবপুরের পাঁচটা বছর খুব কষ্ট পেয়েছি। প্রেসিডেন্সিতে কয়েক বছর হল এই সমস্যার সুরাহা হয়েছে।’’ রাজ্যের সমাজকল্যাণ বিভাগের এক কর্তার কথায়, ‘‘বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্ব তাদের ভবনে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মেনে র‌্যাম্প ঠিক করা।’’ ‘ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম ফর রাইটস অব ডিজ়েব্‌ল্‌ড’ মঞ্চের যুগ্ম-সম্পাদক শম্পা সেনগুপ্তের কথায়, ‘‘২০১৬-র প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষের অধিকার আইনে রেলস্টেশন, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে জনসাধারণের ব্যবহারের জায়গায় বিশেষ ভাবে সক্ষমদের সহায়তার পরিকাঠামো থাকার কথা। না-থাকলে মোটা টাকা জরিমানা হতে পারে। বাস্তবে কিন্তু এই নিয়ে হেলদোল নামমাত্র।’’ ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব আর্বান অ্যাফেয়ার্স’-এর সঙ্গে সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর করে ‘সবার জন্য নিরাপদ ও অবাধ যাতায়াতের নাগরিক পরিসর’ গড়ার প্রকল্পে শামিল হয়েছে আইআইটি খড়্গপুর। তাদের স্থাপত্যবিদ্যা এবং রিজিয়োনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপিকা হৈমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায় বলছিলেন, ‘‘বয়স্ক এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষেরা পথেঘাটে নানা বৈষম্যের শিকার। বিষয়টা মাথায় রেখে আমরা একটি নির্দেশিকা তৈরি করছি। আরও কয়েক মাস লাগবে।’’

প্রিয়াঙ্কার অভিজ্ঞতায়— ‘‘কলকাতায় সিনেমা হল, রেস্তরাঁয় অবাধে যাতায়াতের সুযোগ নেই বলেই চলে। কয়েকটি রেস্তরাঁয় র‌্যাম্পের দাবি জানিয়েও তেমন সাড়া মেলেনি। তুলনায় দিল্লির পরিবেশ অনেক ভাল মনে হয়।’’ বাংলার ভোট-আবহে আজ, সোমবার ‘নমো দিব্যাঙ্গ’ ডাক দিয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধকতাযুক্তদের মধ্যে বিজেপি-র হয়ে প্রচার করছে একটি মঞ্চ। বামেদের ইস্তাহারে ২০১৬-র আইন কার্যকর করার আশ্বাস। আর তৃণমূলের স্লোগানেও শোনা যাচ্ছে, ‘ভাঙা পায়েই খেলা হবে’! কিন্তু ভুক্তভোগীদের অবস্থার পরিবর্তন নেই।

ভোট প্রচারে হুইলচেয়ারের জয়গানে হাসবেন না কাঁদবেন, তা ভেবে তাই বেশির ভাগই কূলকিনারা পাচ্ছেন না।

Kolkata
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy