E-Paper

পাতে ভাত পড়বে তো? গ্যাস সমস্যায় প্রশ্ন ‘মা ক্যান্টিন’ নিয়েও

১০ টাকার বিনিময়ে দুটো প্লাস্টিকের থালা নিয়ে কিছুটা আড়ালে সরে এসে মাটিতে প্লাস্টিক পেতে বসল পরিবার। স্বামী দায়িত্ব নিলেন ভাত মাখার। স্ত্রী সেদ্ধ ডিমের খোসা ছাড়ানোর। এক-এক দলা মুখে উঠল তিন জনেরই।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২৬ ১০:০৫

—প্রতীকী চিত্র।

নাগাড়ে কেঁদে চলেছে কোলের সন্তান। এমনিতেই মেঘলা, গুমোট আবহাওয়া। তার মধ্যে প্রবল আর্দ্রতায় মেয়েকে শান্ত করতে ঘেমে হিমশিম খাচ্ছেন মা। মহিলা বলে চলেছেন, ‘‘ওই তো ভাত, মা! আর কান্না নয়।’’ হাতে ধরা কাগজপত্রের ফাইল নেড়ে মেয়েকে হাওয়া করে শান্ত করার চেষ্টা করে চলেছেন লাইনেই পিছনে দাঁড়ানো বাবা।

এসএসকেএম হাসপাতালের মা ক্যান্টিনের টেবিলে তখন পর পর প্লাস্টিকের থালায় ভাত দেওয়া হচ্ছে। দু’জন পর পর সেই ভাতের উপরেই ঢেলে চলেছেন আনাজ মেশানো ডাল। এক জন ভাতের মধ্যে ঠেসে বসিয়ে দিচ্ছেন একটি করে সেদ্ধ ডিম। পাঁচ টাকায় দুপুরের খাওয়া সারতে সেখানে দাঁড়ানো মানুষের লম্বা লাইন চলে গিয়েছে হাসপাতালের গেটের বাইরে। ১০ টাকার বিনিময়ে দুটো প্লাস্টিকের থালা নিয়ে কিছুটা আড়ালে সরে এসে মাটিতে প্লাস্টিক পেতে বসল ওই পরিবার। স্বামী দায়িত্ব নিলেন ভাত মাখার। স্ত্রী সেদ্ধ ডিমের খোসা ছাড়ানোর। এক-এক দলা মুখে উঠল তিন জনেরই।

শহরের সরকারি হাসপাতাল-সহ বিভিন্ন এলাকায় যৎসামান্য মূল্যে দুপুরের খাওয়া সারার এই সুবিধায় কি ধাক্কা দিতে চলেছে যুদ্ধ পরিস্থিতি? রান্নার গ্যাসের সরবরাহে ঘাটতির আশঙ্কায় এমনই প্রশ্ন ঘুরছে। বর্ধমান থেকে আসা এই দম্পতিই যেমন জানালেন, তাঁদের দেড় বছরের মেয়ের জ্বর ছাড়ছেই না। প্রায় প্রতিদিনই তাঁদের হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। বললেন, ‘‘দিনমজুরির আয়ে শহরে এসে বেশি কিছু করা যায় না। মা ক্যান্টিনের এই খাবারই ভরসা। কিন্তু রান্নার গ্যাসের ঝামেলায় ক’দিন খাবার পাব, কে জানে!’’ একই রকম বক্তব্য হাওড়ার গ্রামীণ এলাকা আমতা থেকে এসএসকেএমে আসা বৃদ্ধ সুকুমার হাইতের। কাঁপা কাঁপা হাতে ভাতের থালা নিয়ে এক কোণে বসে নুন-ডাল দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে বললেন, ‘‘সংক্রমণ হয়ে চোখ নষ্ট হতে বসেছে। সপ্তাহে দু’দিন করে আসতে হয়। পাঁচ টাকার এই খাওয়াই ভরসা। কিন্তু যুদ্ধ চলতে থাকলে ক’দিন দেবে, কে জানে।’’

উত্তর জানা নেই মা ক্যান্টিনে কাজে যুক্ত খোকন গায়েন, দেবব্রত দেবনাথদেরও। খোকন বললেন, ‘‘শুধু এসএসকেএমেই প্রতিদিন তিন হাজার মতো লোকের খাবার আসে। গ্যাস না পেলে রান্না হবে কী করে?’’ এই হাসপাতাল যে ওয়ার্ডের অন্তর্গত, সেই ৭১ নম্বরের পুরপ্রতিনিধি পাপিয়া সিংহও আশ্বস্ত করতে পারলেন না। তাঁর স্বামী বাবলু সিংহ বললেন, ‘‘কমিউনিটি রান্নাঘর চালানো স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলি কাজ চালাতেপারবে না বলে দিচ্ছে। উনুনে রান্না করে যাতে খাওয়ানো যায়, দেখা হবে।’’ বিভ্রান্ত বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার লোকজনও। শহরের একাধিক সরকারি হাসপাতাল চত্বরে লোকজনকে দু’বেলা খাওয়ানো একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রধান সুরেশ সোনকরের মন্তব্য, ‘‘বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডার তো পাওয়াই যাচ্ছে না। দশ বছরে এক দিনও খাওয়ানো বন্ধ করিনি। এ বার পারব তো?’’

চেতলা এলাকার শ্যাম বসু রোডের একটি কমিউনিটি রান্নাঘর থেকে দক্ষিণ কলকাতার ২৪টি স্কুল ও ১৫টি ওয়ার্ড-ভিত্তিক জায়গায় মা ক্যান্টিনের খাবার যায়। কমিউনিটি রান্নাঘরটি যে স্বনির্ভর গোষ্ঠী চালায়, সেটির প্রধান শাশ্বতী সাহি বললেন, ‘‘প্রতিদিন ১৩টি করে গ্যাস সিলিন্ডার লাগে। ঘুঘনি বাদ দিয়ে ডালে মটর মিশিয়ে স্কুলে পাঠিয়েছি। আনাজ ডালে মিশিয়ে মা ক্যান্টিন সামাল দিয়েছি। কিন্তু কত দিন?’’

কলকাতা পুরসভার সমাজকল্যাণ বিভাগের মেয়র পারিষদ মিতালি বন্দ্যোপাধ্যায় যদিও বললেন, ‘‘ডিলারদের ফোন করে করে কথা বলেছি। হাজার হাজার মানুষ মা ক্যান্টিনে খান, স্কুলে বাচ্চারা খায়। ডিলারেরাও দেখছেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।’’ তবু দুপুরের ভাত নিয়ে অনিশ্চয়তা আপাতত কাটছে না।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

canteen Fuel

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy