গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত এক ব্যক্তি রাস্তার ধারে পড়ে রয়েছেন। রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে সারা শরীর। কিন্তু তখনও তিনি বেঁচে। আশপাশের উৎসাহী জনগণ সে সব দেখছেনও। কিন্তু কেউই আহতকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার বা পুলিশে খবর দেওয়ার চেষ্টাই করছেন না। কেন? প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ‘‘পুলিশে খবর দিলে বা হাসপাতালে নিয়ে গেলে হাজার হ্যাপা। পুলিশের জেরা তো বটেই, তার পরেও বারবার হাজিরা দিতে হবে আদালতে। এত ঝামেলা পোহানোর থেকে দূরে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি দেখাই ভাল।’’
পুলিশের হ্যাপার ভয়ে এখন আর ‘গুড সামারিটান’ বা ‘ভাল মানুষ’দের এ ভাবে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের নয়া আইন অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় আহতকে যিনি হাসপাতালে নিয়ে যাবেন বা নিয়ে যাওয়ার জন্য পুলিশে খবর দেবেন, তাঁদের আর হ্যাপা পোহাতে হবে না। পড়তে হবে না হাজারো জেরার মুখে। দুর্ঘটনাগ্রস্তদের পাশে যাঁরা দাঁড়াতে চাইছেন, তাঁদের কেন্দ্র বলছে ‘গুড সামারিটান’। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গত জানুয়ারি মাসে ‘গুড সামারিটান’দের জন্য ওই আইন প্রণয়ন করেছে কেন্দ্র। রাজ্যগুলিকেও তা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রের নির্দেশের পরে এ রাজ্যেও পরিবহণ দফতরের তরফে জেলাগুলিকে ওই আইন কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে সে ভাবে প্রচার করা হয়নি। সম্প্রতি হাওড়ায় প্রশাসনিক বৈঠকে রাজ্যের পথ-নিরাপত্তার হাল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তার পরে রাজ্য জুড়ে পথ নিরাপত্তায় সচেতনতা প্রচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য প্রশাসন। পাশাপাশি, দুর্ঘটনায় জখম ব্যক্তিদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে ‘ভাল মানুষ’ নীতিও আরও ভাল ভাবে প্রণয়ন করতে চায় পরিবহণ দফতর। সে কারণে অবিলম্বে এ ব্যাপারে জেলাগুলিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। নির্দেশে বলা হবে— জেলায় হাসপাতাল, থানা, ব্যস্ত মোড় এবং বড় বড় রাজপথের ধারে হোর্ডিংয়ে ‘গুড সামারিটান’ নিয়ে প্রচার করতে হবে। দুর্ঘটনাগ্রস্তদের যাঁরা হাসপাতালে পৌঁছে দেবেন, প্রশাসনের তরফে তাঁদের যথেষ্ট সম্মান দেওয়ার বিষয়টিও প্রচারে নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
‘গুড সামারিটান’দের ক্ষেত্রে কী নিয়ম তৈরি করেছে কেন্দ্র?
রাজ্য পরিবহণ দফতর সূত্রের খবর, ওই নীতিতে বলা হয়েছে— ১. জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ নির্বিশেষে ‘গুড সামারিটান’দের সম্মান দিতে হবে। ২. কেউ ফোন করে পুলিশকে কোনও দুর্ঘটনার খবর দিলে তাঁর নাম-ধাম জানতে চাওয়া যাবে না। ৩. ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর পরে পুলিশ অফিসারেরা ‘গুড সামারিটান’দের নাম-ধাম বলার জন্য চাপ দিতে পারবেন না, সে সব লগ রেজিস্টারে নথিভুক্তও করতে পারবেন না। ৪. ‘ভালমানুষ’দের দুর্ঘটনার সাক্ষী হওয়ার জন্য চাপ দিতে পারবে না পুলিশ। তবে তিনি স্বেচ্ছায় ঘটনার সাক্ষী হতে চাইতে পারেন। ৫. কোনও এক বা একাধিক ব্যক্তি দুর্ঘটনায় জখম কাউকে নিয়ে হাসপাতালে বা থানায় এলে কোনও কিছু জেরা না করে তাঁদের ছেড়ে দেবে পুলিশ বা হাসপাতাল। ৬. ‘গুড সামারিটান’ নীতি ঠিক মতো মানা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিতে হবে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার বা কোনও ডিএসপি-কে।
দুর্ঘটনাগ্রস্তকে সাহায্যকারী কোনও ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় মামলার সাক্ষী হতে চান, সে ক্ষেত্রেও পুলিশের জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশিকা জারি করেছে কেন্দ্র। তাতে বলা হয়েছে, গুড সামারিটানেরা যেখানে চাইবেন, তাঁকে সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ করতে যেতে হবে পুলিশকে। তাঁরা চাইলে পুলিশকে ওই ব্যক্তির কাছে উর্দি না পরেই যেতে হবে। থানায় সাক্ষ্য দিতে এলে ওই ব্যক্তিকে বসিয়ে না রেখে যথাযথ সম্মান দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বয়ান রেকর্ড করতে হবে।