×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৪ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

ফেসবুকে বন্ধুর ‘অশালীনতা’, আত্মঘাতী কিশোরী

নিজস্ব সংবাদদাতা
২৬ জুন ২০১৪ ০২:৩১

পঞ্জাবের পরে এ বার পর্ণশ্রী!

রাস্তায় বেরোলে কিশোরী বা তরুণীদের নিগ্রহের ঘটনা নতুন নয়। সেই নিগ্রহ বাড়ছে সাইবার জগতেও। ফেসবুকে দুই পুরুষ বন্ধুর ক্রমাগত অশালীন মন্তব্যের জেরে ২০১২ সালে হস্টেলে আত্মহত্যা করেছিলেন পঞ্জাবের জালন্ধরের এক পলিটেকনিক ছাত্রী। ফেসবুকে এক বন্ধুর ক্রমাগত অশালীন মন্তব্য ও কুরুচিকর তথ্য-ছবি দেওয়ার জেরে এ বার আত্মঘাতী হলেন বেহালা পর্ণশ্রীর সদ্য মাধ্যমিক পাশ করা এক কিশোরীও।

পুলিশ জানিয়েছে, মৃতার ঘর থেকে ইংরেজিতে লেখা পাঁচ পাতার একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়েছে। তাতে নিজের মৃত্যুর জন্য ফয়জল ইমাম খান নামে একটি ছেলেকে দায়ী করেছে ওই কিশোরী। অভিযুক্ত হিসেবে নাম রয়েছে ফয়জলের দুই বন্ধুরও। বুধবার ফয়জল এবং তার ওই দুই বন্ধু সতীশ সাউ ও দীপককুমার গুপ্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

Advertisement

সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফেসবুকে ঘনিষ্ঠতা এবং শত্রুতার জেরে এমন ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। একটি কম্পিউটার অ্যান্টিভাইরাস প্রস্তুতকারী সংস্থার সাম্প্রতিক সমীক্ষায় ধরা পড়েছে, এ দেশে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাবালক ছেলে-মেয়েরা অনলাইন অভব্যতার শিকার হচ্ছে। কখনও কখনও তার মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছচ্ছে যে, নিগৃহীতারা আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হচ্ছেন না।

কলকাতা ও লাগোয়া এলাকাতেও এমন সাইবার অশালীনতা বা হেনস্থার ঘটনা বিরল নয়। প্রায়ই এমন নানা অভিযোগ পান কলকাতা পুলিশের সাইবার থানার অফিসারেরা। বছর দুয়েক আগে ফেসবুকে বারাসতের এক তরুণীর ভুয়ো প্রোফাইল তৈরি করে নানা অশালীন ছবি-মন্তব্য ছড়িয়েছিল এক তরুণ। কিন্তু সাইবার হেনস্থার জেরে আত্মহত্যার ঘটনা এ শহরে এই প্রথম বলেই লালবাজার সূত্রের দাবি।

ঠিক কী হয়েছিল পর্ণশ্রীতে?

প্রাথমিক তদন্তের পরে পুলিশ জানিয়েছে, বেশ কিছু দিন আগে ফেসবুকেই ফয়জলের সঙ্গে আলাপ হয় পর্ণশ্রীর ওই কিশোরীর। বন্ধুত্বও তৈরি হয় দু’জনের মধ্যে। কিন্তু সম্প্রতি ফয়জল ফেসবুকে মেয়েটির ভুয়ো প্রোফাইল তৈরি করে তাতে অশালীন ও কুরুচিকর কথা লিখেছিল। মেয়েটির মোবাইল ফোন নম্বরও দিয়েছিল সে। পুলিশ সূত্রের খবর, সেই প্রোফাইল দেখে নানা উটকো লোক মেয়েটিকে ফোনে উত্ত্যক্ত করত বলে সুইসাইড নোটে অভিযোগ করেছে কিশোরী। মেয়েটির সঙ্গে ফয়জলের আলাপ করিয়ে দিয়েছিল সতীশ ও দীপক। তাদের বিরুদ্ধে পাড়ায় এসে ওই কিশোরীর সম্পর্কে নানা নোংরা কথা ছড়ানোরও অভিযোগ রয়েছে।

বুধবার ওই কিশোরীর প্রতিবেশীরা জানান, কলেজপড়ুয়া দিদি, মা-বাবার সঙ্গে মেয়েটি বছর চারেক ধরে ওই পাড়ায় একটি বাড়িতে ভাড়া থাকত। এলাকায় দুই বোনেরই ভদ্র ও শান্ত মেয়ে বলেই পরিচিতি রয়েছে। বাসিন্দারা জানান, মঙ্গলবার বিকেল চারটে নাগাদ ওই কিশোরীর মা ও দিদি বেরিয়েছিলেন। মেয়েটি বাড়িতে একাই ছিল। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ মা ও দিদি ফিরে দেখেন, ঘর ভিতর থেকে বন্ধ। ডাকাডাকি করেও সাড়া না মেলায় প্রতিবেশীদের ডেকে দরজা ভাঙেন তাঁরা। ভিতরে ঢুকে দেখা যায়, কড়িবরগা থেকে ওড়নার ফাঁস লাগিয়ে ঝুলছে ওই কিশোরী। পরে পুলিশ গিয়ে দেহটি উদ্ধার করে।

কিন্তু কেন এমন করল অভিযুক্তেরা? পুলিশ অবশ্য এ নিয়ে এখনই মুখ খুলতে নারাজ। তবে ঘটনাটিকে কড়া ভাবেই দেখছে লালবাজার। পুলিশ সূত্রের খবর, কিশোরীর আত্মহত্যার খবর পাওয়ার পরে এ দিন লালবাজারের সাইবার থানার একটি দল পর্ণশ্রী থানায় যায়॥

শুধু অল্পবয়সীরাই নয়, ছেলেমেয়েদের অনলাইনে নিগ্রহ হওয়া নিয়ে কার্যত তটস্থ মা-বাবাও। অভিভাবকদের একাংশের বক্তব্য, উঠতি বয়সে ইন্টারনেটে অনেকেই বন্ধুত্ব পাতায়। সেই বন্ধুত্বের ফাঁদে পড়ে কখন কী বিপদ ঘটবে, তা ছেলেমেয়েরা বুঝতে চায় না। বরং বকাঝকা করলে বিপত্তি বাড়বে, এই ভয়ে অনেকে কিছু বলতেও চান না। শহরেরই এক পরিবারে কিশোরী মেয়েকে নিয়ে তটস্থ এক মায়ের উক্তি, “মেয়ের বিপদ নিয়ে চিন্তায় আমাকেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল!’’

Advertisement