কুকুর হইতে সাবধান!
এই সাবধানবাণী যাঁর দেওয়ার কথা, সেই কুকুর-মালিকের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার জেরেই প্রাণ গেল ১৮ বছরের গৌরব পুরকাইতের। অজানা-অচেনা হোক বা পরম আত্মীয়, পোষ্য কুকুর থেকে সাবধান করার জন্য কুকুরের মালিকেরাই সতর্কবাণী ঝুলিয়ে রাখেন দরজায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সাবধান করা তো দূর অস্ত্, পোষ্যকে নিয়ন্ত্রণ না করায় মৃত্যু হল এক তরুণের।
‘‘ভয় পাচ্ছি, প্লিজ কুকুরটাকে ছেড়ে দেবেন না। একটুক্ষণ নিজের কাছে রাখুন না।’’— বারবার বলেছিলেন গৌরব। উল্টো দিক থেকে হাসতে হাসতে উত্তর আসছিল, ‘‘আরে ও তো আমার পোষা! ট্রেনিং দেওয়া। কোনও ভয় নেই, কিছু করবে না।’’ ভয় আর আশ্বাসের মাঝের কয়েক মিনিটেই ঘটে যায় চরম দুর্ঘটনা। ধেয়ে আসা কুকুরের ভয়ে টাল সামলাতে না পেরে ছ’তলার ছাদ থেকে সটান নীচে পড়ে মারা যান গৌরব পুরকাইত।
কেন একটি ছেলেকে ভয় পেতে দেখেও কুকুরগুলোকে ও ভাবে ছেড়ে দিলেন কুকুরের মালিক সুমিত ভট্টাচার্য? কেন গৌরবকে প্রচণ্ড ভয় পেতে দেখেও পোষা অ্যালসেশিয়ানগুলোকে নিজের কাছে ডেকে নিলেন না তিনি? তা হলে হয়তো এমন অতর্কিতে মৃত্যু এড়ানো গেলেও যেতে পারত। পোষ্য কুকুরকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় কুকুরের মালিককেও যেতে হয় নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে। তার উপরেই নির্ভর করে মালিকের কোন কথায় পোষ্য কুকুর কী ভাবে আচরণ করবে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত গৌরবের কাকা তরুণ পুরকাইত জানিয়েছেন, গৌরবকে ভয় পেতে দেখেও হাসছিলেন সুমিতবাবু। কুকুরকে নিয়ন্ত্রণ তো দূর, গৌরবের ভয়ের সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল তার হাসি। অজানা কাউকে দেখে কুকুরের এগিয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা রোখার কি কোনও প্রশিক্ষণ নেই?
আছে, বলছেন শহরেরই একাধিক কুকুর প্রশিক্ষণকারী। পোষ্য কুকুরকে প্রাথমিক ভাবেই শেখানো হয় ‘ইয়েস’ এবং ‘নো’ এর ব্যবধান। কোথায় তাকে যেতে নির্দেশ দিচ্ছেন মালিক, কোথায়ই বা তাকে থামতে হবে, তা একান্তই নির্ভর করে মালিকের নির্দেশের উপরে। কুকুরের প্রশিক্ষণকারী হাবু বিশ্বাস বলেন, ‘‘নিজের কাছ থেকে ১০ বা ১৫ ফুটের বেশি দূরে চলে গেলেই কুকুরকে ‘স্টে’ অথবা ‘স্টপ’ বললেই সে থেমে যায়। ‘কাম’ বললে ফের মালিকের কাছে ফিরে আসে। পোষ্যের উপরে এই নিয়ন্ত্রণ রাখা মালিককেই শেখানো হয়।’’ হাবুবাবুর মতে, অজানা কাউকে দেখলে কুকুর যদি এমন আচরণ করে, তবে তাকে শান্ত করে ফেরানোর দায় কিন্তু মালিকেরই। এ ক্ষেত্রে যা করেননি সুমিতবাবু।
অন্য এক প্রশিক্ষক রবার্ট স্মিথ বলেন, ‘‘এই ঘটনায় সম্পূর্ণ দোষ মালিকেরই। পোষ্য মানে সে বাড়িরই এক জন। কেউ যদি ভয় পায়, তবে সেই মুহূর্তের জন্য কুকুরকে প্রবল ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত মালিকের।’’ তিনি আরও জানান, যখন পোষ্যটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, মালিক সেই সময়ে যত কুকুরের কাছে থাকবেন, ততই পোষ্যটি তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কুকুর-বিশেষজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, অ্যালসেশিয়ান জাতের কুকুর স্বভাবে সাধারণত বাধ্য হয়। অন্য অনেক জাতের কুকুর আগন্তুকের সঙ্গে সহজে মিশে গেলেও অ্যালসেশিয়ান অজানা মানুষের সঙ্গে সহজ ভাবে মিশতে পারে না। তবে বিদেশে এমন উদাহরণ ভূরি ভূরি, যেখানে প্রশিক্ষণের জেরে বাসে, মেট্রোয় পোষ্য সহজেই চলাফেরা করে। যাত্রীর সিটের তলায় সে এমন ভাবে উল্টো দিকে মুখ করে বসে থাকে, যাতে সহযাত্রীদের কোনও রকম সমস্যা না হয়।
সুতরাং গৌরবের দিকে অ্যালসেশিয়ান দু’টির ধেয়ে যাওয়ার পরেও তাদের শান্ত করে ফিরিয়ে আনার উপায় হয়তো ছিল। কিন্তু তা না করে সুমিতবাবু শুধুই ট্রেনিংয়ের দোহাই দিয়ে আশ্বাস দিয়ে গিয়েছেন।
অন্যকে ভয় পেতে দেখেও এমন আচরণের কারণ কী? মনোবিদ প্রশান্ত রায়ের মতে, এই ঘটনা বিরলের মধ্যে বিরলতম। তিনি জানাচ্ছেন, মজা করার মধ্যেই রয়েছে অন্যকে হেনস্থা করার প্রবৃত্তি। কাউকে ভয় পেতে দেখে, বিপাকে পড়তে দেখেই সাধারণত অন্যেরা মজা খুঁজে পান। এ ক্ষেত্রেও অনেকটা তেমনই। ‘‘কুকুরের মালিক হয়তো ভেবেছেন কুকুর কাছে গেলেই ছেলেটির ভয় কেটে যাবে। কিন্তু পরিণতি যে মারাত্মকও হতে পারে, তা তাঁর মাথায় আসেনি।’’—বললেন প্রশান্তবাবু।
এই ঘটনাকে বিবেচনাহীন আচরণ হিসেবেই দেখছেন মনোবিজ্ঞানী জয়রঞ্জন রাম। তিনি বলেন, ‘‘কুকুরপ্রেমীরা সাধারণত মনে করেন সকলেই কুকুরকে ভালবাসবে। তাই কুকুর দেখে যাঁরা ভয় পান, তাঁদের কুকুরপ্রেমীরা অনেক সময়ে নিচুবর্গের বলে মনে করেন। এই আচরণ একেবারেই কাম্য নয়।’’
সুমিতবাবুর আবাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, তিনি দু’টি কুকুরকে নিয়ে একাই থাকতেন ওই ফ্ল্যাটে। স্কুলে পড়ানোর কারণে দিনের বড় একটা সময়ই বাড়িতে থাকতেন না তিনি। তাই পোষ্যের উপর আদৌ তাঁর কোনও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে কি না প্রশ্ন উঠছে তা নিয়েও।