Advertisement
E-Paper

পায়রা তাড়িয়ে বাঁচতে চান বাসিন্দারা

প্রেমিকার বাবাকে খুশি করতে তাঁর মতোই ভোরে উঠে পায়রাদের দানা খাওয়াত রাজ। আবার ভালবাসা নিবেদন করে লেখা প্রেমের চিঠি সুমনকে পৌঁছে দিয়েছিল পায়রাই।

মেহবুব কাদের চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০১৬ ০১:০২
বহুতলের সেই ফ্ল্যাটে পায়রার ঝাঁক। (ইনসেটে) নিজের বারান্দায় লোপামুদ্রা ঘোষ। শনিবার। — নিজস্ব চিত্র

বহুতলের সেই ফ্ল্যাটে পায়রার ঝাঁক। (ইনসেটে) নিজের বারান্দায় লোপামুদ্রা ঘোষ। শনিবার। — নিজস্ব চিত্র

প্রেমিকার বাবাকে খুশি করতে তাঁর মতোই ভোরে উঠে পায়রাদের দানা খাওয়াত রাজ। আবার ভালবাসা নিবেদন করে লেখা প্রেমের চিঠি সুমনকে পৌঁছে দিয়েছিল পায়রাই।

এ সব সেলুলয়েডের পর্দার গল্প। আর বাস্তবে, খাস কলকাতার অভিজাত তল্লাট গড়িয়াহাটের এক বহুতলের বাসিন্দারা পায়রা তাড়াতে চাইছেন যেনতেন প্রকারে। দু’-একটা নয়, একদলও নয়, শ’য়ে-শ’য়ে পায়রা। তাদের দূর করতে
ওই বহুতলের বাসিন্দাদের একটি কমিটির পক্ষ থেকে পুরসভা ও পুলিশে রীতিমতো অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

বাসিন্দারা জানান, দশতলা ওই বাড়ির একেবারে উপরের তলার একটি ফ্ল্যাটে ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রা। ওখানে তাদের খাবার দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত। বাসিন্দাদের অভিযোগ, দশতলার ওই ফ্ল্যাট কার্যত পায়রাদের বাসগৃহে পরিণত হওয়ায় দূষণ ছড়াচ্ছে। এতটাই যে, পায়রার পালক ও মল থেকে শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে কয়েক জন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে বাসিন্দাদের দাবি।

কিন্তু কীসের টানে এত পায়রার ভিড় ১৮/৩ গড়িয়াহাট রোডের ওই বহুতলে?

ওই বহুতলের ১০সি/১ ফ্ল্যাটের বাসিন্দা লোপামুদ্রা ঘোষ দশ বছর ধরে পায়রাদের ডেকে খেতে দেন। স্টক ট্রেডিং বা শেয়ার কেনাবেচা করা ৩১ বছরের ওই তরুণী নিজেকে পক্ষীপ্রেমী বলে মনে করেন। ফ্ল্যাটটি তাঁর কাকার। কাকার মৃত্যুর পরে কাকিমার সঙ্গে থাকেন লোপামুদ্রা। তাঁর কথায়, ‘‘কারও পাখিকে না খাওয়ানোর অধিকার যদি থাকে, তা হলে আমারও পাখিকে খাওয়ানোর অধিকার রয়েছে।’’ তিনি পাখিদের খাবার দেন। পায়রা ছাড়াও কাক, শালিক আসে। তবে পায়রার সংখ্যা অন্য পাখিদের চেয়ে বেশি।

ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখা গেল, কয়েক বস্তা গমের দানা এক কোণে রাখা। ওই গমের দানা পায়রার খাবার। বারান্দায় গমের দানা ছড়ানো। মাঝেমধ্যেই পায়রার ঝাঁক এসে সেই খাবার খেয়ে উড়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে পাখির নতুন নতুন ঝাঁক ঢুকছে।

কিন্তু কী থেকে এই পক্ষীপ্রেম ওই তরুণীর?

লোপামুদ্রা নিজেই জানাচ্ছেন, ২০০০ সালে রাস্তায় পড়ে থাকা একটি পাখি ফ্ল্যাটে নিয়ে এসে তার শুশ্রূষা করেছিলেন। হঠাৎ একদিন সেই পাখিটা উড়ে গেল। ‘‘পাখিটার আশায় আমি পথ চেয়ে থাকতাম। রোজ বারান্দায় খাবার, জল রেখে দিতাম। ওই পাখিটা ফিরে আসেনি। তবে আজ বারান্দায় প্রচুর পায়রা, শালিক, কাক আসে। পায়রা আমার শোয়ার ঘরেও থাকে,’’ বলছেন লোপামুদ্রা।

তবে এই পক্ষীপ্রেমের ঠেলায় যে বহুতলের কোনও কোনও বাসিন্দাকে শ্বাসকষ্টে পর্যন্ত ভুগতে হচ্ছে।

দশতলায় লোপামুদ্রাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন চিকিৎসক সঞ্জয় দাশগুপ্ত। গত বছর ফেব্রুয়ারি ও অক্টোবর মাসে, দু’দফায় তিনি অসুস্থ হন। প্রথম বার নিউমোনিয়া, দ্বিতীয় বার ‘রেসপিরেটরি ফেলিওর’। অক্টোবরে তাঁকে ভেন্টিলেশনে পর্যন্ত রাখতে হয়েছিল।

সঞ্জয়বাবুর কথায়, ‘‘আমার উইন্ডো এসি-র ‘আউটার ক্যাবিনেট’-এর উপরে পায়রার বাসা। মলমূত্র ত্যাগ করছে। এসি চালালেই ভিতরে দূষিত বাতাস ঢুকে শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ফ্ল্যাটে বাস করাই এখন আতঙ্কের।’’ দশতলার আর এক বাসিন্দা শান্তি ভৌমিক। তাঁর কথায়, ‘‘জানালা খোলা রাখলেই পায়রার পালক, মলের দুর্গন্ধে টিঁকতে পারছি না। মাঝেমধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়ছি।’’ ফ্ল্যাটের বহু বয়স্ক নাগরিকের বক্তব্য, তিন-চার বছর ধরে তাঁরা শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তার কারণও ওই পায়রা।’’

লোপামুদ্রা ঘোষের অবশ্য দাবি, ‘‘পায়রার জন্য কারও শরীর খারাপ হচ্ছে, এটা আমি বিশ্বাস করি না। এমনটা হতেই পারে না।’’

রাজ্য প্রাণী ও মৎস্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুনীত মুখোপাধ্যায় অবশ্য বলেন, ‘‘একটি বাড়িতে শতাধিক পায়রা মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল নয়। পায়রার মলে অ্যামোনিয়া গ্যাস থাকে। যা থেকে অ্যালার্জি, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।’’ পশু চিকিৎসক স্বপন ঘোষের কথায়, ‘‘কোনও আবাসনের এক জায়গায় কয়েকশো পায়রার বাস স্বাস্থ্যকর নয়। পায়রার মল থেকে শ্বাসকষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।’’

তা হলে এর থেকে মুক্তির কী উপায়?

কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগ ২০১০-এ ওই বহুতল থেকে সমস্ত পায়রা বার করার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশে কোনও আমলই দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। তাঁরা বলছেন, ২০১০-এ যত পায়রা ছিল, তা দ্বিগুণ হয়েছে।

পাখির অত্যাচারে অতিষ্ঠ বাসিন্দারা গত বছর অগস্ট ও নভেম্বর, দু’বার গড়িয়াহাট থানায় লিখিত অভিযোগ জানান। কিন্তু কোনও মামলা রুজু করা হয়নি। এক পুলিশ আধিকারিকের বক্তব্য, ‘‘লোপামুদ্রা ঘোষ পায়রাকে খেতে দেন। তাই, ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রা আসে। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো আইন নেই। ওই মহিলাকে একাধিক বার বোঝানো হয়েছে।’’

লোপামুদ্রার যুক্তি, ‘‘আমি তো কোনও পাখিকে খাঁচায় আটকে রাখি না। কেবল খাবার দিই।’’

স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলর সুদর্শনা মুখোপাধ্যায়ও বলেন, ‘‘খাঁচার মধ্যে পাখি বন্দি করে রাখলে লোপামুদ্রা ঘোষের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেত। কিন্তু ওই মহিলা কেবল পাখিকে খাবার দেন। পশু, পখিদের খাওয়ানো বন্ধ করা কোনও আইনে বলা নেই।’’ তাঁর কথায়, ‘‘আবাসিকদের সমস্যার কথা ভেবে বহু বার লোপামুদ্রাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কোনও লাভ হয়নি। ওই বহুতলের কো-অপারেটিভ সোসাইটিকে বলেছি, তারা নিজেরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিক।’’

কলকাতা পুরসভার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক মণিরুল মোল্লাও বলছেন, ‘‘অভিযোগ পেয়ে সম্প্রতি আমরা ওই ফ্ল্যাট পরিদর্শন করেছি। ওই মহিলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো আইন কিন্তু পুরসভার নেই।’’

ওই বহুতলের কো-অপারেটিভ সোসাইটির চেয়ারম্যান দিলীপকুমার রায় বলেন, ‘‘এই ভাবে চলতে পারে না। বিষয়টি নিয়ে শীঘ্রই জাতীয় পরিবেশ আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছি।’’

সেখানকার প্রায় সকল বাসিন্দার একই চাহিদা, ‘কবুতর যা যা যা, কবুতর যা যা।’ এবং চিরতরে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy