এ যেন অনেকটা সর্ষের মধ্যেই ভূত!
মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলিতে ওষুধ সংস্থার টাকায় জুনিয়র ডাক্তারদের বেড়াতে যাওয়া নিয়ে একাধিক বার অভিযোগ উঠেছে। প্রতি বারই কর্তৃপক্ষ ‘যথাযথ’ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। কিন্তু এ বার খোদ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তার বিরুদ্ধে ওষুধ সংস্থার
নাম উল্লেখ করে তাদের টাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে পড়ুয়া এবং অন্য ডাক্তারদের আসার আমন্ত্রণ জানানোর অভিযোগ উঠল। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই তোলপাড় শুরু হয়েছে স্বাস্থ্য ভবনে। যদিও ওই অধিকর্তার দাবি, ‘এটা নেহাৎই সৌজন্য।’ ওষুধ সংস্থাকে তুলে ধরার কোনও উদ্দেশ্যই তাঁর
ছিল না।
গত বুধবার দুপুরে একটি ‘সায়েন্টিফিক প্রোগ্রাম’ ছিল রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অব অপথ্যালমোলজি (আরআইও)-তে। সাড়ে তিনটে থেকে অনুষ্ঠান শুরু হয়। চিকিৎসকদের দুপুর আড়াইটের মধ্যে আসতে বলা হয়েছিল। কারণ তখন মধ্যাহ্ন ভোজনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অধিকর্তার হোয়াটসঅ্যাপ থেকে এই বার্তা পৌঁছে গিয়েছিল প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকদের কাছে। সেই বার্তায় ডাক্তারদের নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি একটি বহুজাতিক ওষুধ সংস্থার নাম করে জানানো হয়েছিল, ওই সংস্থাই গোটা অনুষ্ঠানটি ‘স্পনসর’ করছে।
এতেই বিস্মিত হয়েছেন চিকিৎসকদের একটা বড় অংশ। তাঁদের বক্তব্য, সরকারি হাসপাতালের একটি অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে অধিকর্তার তরফ থেকে। সেখানে ওষুধ সংস্থার নাম আসে কী ভাবে?
বুধবারের ওই অনুষ্ঠানে ওষুধ সংস্থার প্রতিনিধিরা রীতিমতো উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় ছিলেন। যা দেখে বহু জুনিয়র ডাক্তারই মন্তব্য করেছেন, ‘‘স্যারেরাই যদি এমন করেন, তা হলে আর আমাদের দোষটা কোথায়?’’
আরআইও-র সিনিয়র চিকিৎসকদের একাংশ এর পর বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য ভবনে অভিযোগ জানান। তাঁদের বক্তব্য, ওষুধ সংস্থার সঙ্গে ডাক্তারদের একাংশের আঁতাত
ভাঙতে সরকার মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করেছে। তাঁরা আর যখন-তখন হাসপাতালের ভিতরে ঢুকতে পারেন না। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে তাঁদের আসতে হয়। নিয়ম ভেঙে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের সঙ্গে দেখা করলে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর। সেই পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের প্রধান এ রকম বার্তা পাঠালেন কী ভাবে?
এর উত্তরে প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তা অসীম চক্রবর্তী প্রথমে বলেন, ‘‘ওটা তো ব্যক্তিগত স্তরে কয়েকজন বন্ধুকে পাঠিয়েছিলাম।’’ তাঁকে বলা হয়, বার্তাটি তো তাঁর তরফে সমস্ত ডাক্তারদের কাছেই গেছে। শুনে তিনি প্রথমে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকেন। তার পর বলেন, ‘‘ওটা নেহাৎই সৌজন্য ছিল।’’ কার প্রতি সৌজন্য? ওষুধ সংস্থার প্রতি? তাদের এ ভাবে হাসপাতালের নিজস্ব অনুষ্ঠানে অন্তর্ভূক্ত করাটাই তো বেআইনি? অসীমবাবু এই প্রশ্নের কোনও উত্তর দেননি।
ওষুধ সংস্থার সঙ্গে ডাক্তারদের যোগাযোগ নিয়ে এর আগে একাধিক বার নানা নির্দেশ জারি করেছে মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (এমসিআই)। এমনকী ওষুধ সংস্থার থেকে মূল্যবান উপহার নেওয়া বা বাইরে বেড়াতে যাওয়ার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের রেজিস্ট্রেশন সাময়িকভাবে বাতিলের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। বস্তুত, ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কাউন্সিল (প্রফেশনাল কনডাক্ট, এটিকেট অ্যান্ড এথিকস) অ্যাক্ট –এর সংশোধনীতে সম্প্রতি এই বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু তার পরেও যে পরিস্থিতি বদলায়নি মাঝেমধ্যেই তার প্রমাণ মেলে।
চক্ষু বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত স্বাস্থ্য অধিকর্তা সিদ্ধার্থ নিয়োগী আপাতত ছুটিতে রয়েছেন। কিন্তু বিষয়টি জেনে তিনি অবাক। তাঁর কথায়, ‘‘এ ভাবে ওষুধ সংস্থার নাম উল্লেখ করে কোনও ভাবেই সরকারি হাসপাতালের অনুষ্ঠানে কাউকে ডাকা যায় না। ঠিক কেন উনি এটা করলেন সে ব্যাপারে ওঁর সঙ্গে কথা বলব। তার পর পরবর্তী পদক্ষেপ স্থির হবে।’’