Advertisement
E-Paper

প্রকাশ্যে চুমুর ‘অধিকার’, সাক্ষী অবাক মহানগর

“চুমু চুমু চুমু চাই, চুমু খেয়ে বাঁচতে চাই।” তখন অন্ধকার নেমেছে। যাদবপুর থানার সামনে জ্বলে গিয়েছে রাস্তার আলো। চার দিকে দাঁড়ানো গাড়ির সারি। উত্‌সুক মুখগুলো উঁকি মারছে। পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পুলিশ। চার রাস্তার মোড়ে পরস্পরকে জাপটে ধরে চুমু খাচ্ছেন একপাল তরুণ-তরুণী। মুখে স্লোগান— আমার শরীর আমার মন, দূর হটো রাজশাসন।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০১৪ ০০:৪২
ভরা নদীতে আসে বান... ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ব্যারিকেড...। বুধবার, যাদবপুর থানার সামনে।  —নিজস্ব চিত্র।

ভরা নদীতে আসে বান... ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ব্যারিকেড...। বুধবার, যাদবপুর থানার সামনে। —নিজস্ব চিত্র।

“চুমু চুমু চুমু চাই, চুমু খেয়ে বাঁচতে চাই।”

তখন অন্ধকার নেমেছে। যাদবপুর থানার সামনে জ্বলে গিয়েছে রাস্তার আলো। চার দিকে দাঁড়ানো গাড়ির সারি। উত্‌সুক মুখগুলো উঁকি মারছে। পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পুলিশ। চার রাস্তার মোড়ে পরস্পরকে জাপটে ধরে চুমু খাচ্ছেন একপাল তরুণ-তরুণী। মুখে স্লোগান— আমার শরীর আমার মন, দূর হটো রাজশাসন।

নীতি পুলিশের বিরুদ্ধে, সম্প্রতি কোচিতে এক তরুণ-তরুণীর প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার প্রতিবাদে একটি রাজনৈতিক দলের ‘দাদাগিরি’র বিরুদ্ধে, খাস কলকাতার স্টার থিয়েটারে ছোট পোশাক পরিহিত তরুণীকে ঢুকতে বাধা দেওয়ার বিরুদ্ধে এবং এমন নানা ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই বুধবার ‘চুমু আন্দোলনে’ সামিল হয়েছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছাত্রছাত্রী। উপাচার্যের বিরুদ্ধে তাঁদের সাম্প্রতিক আন্দোলন ‘হোক কলরব’-এর সঙ্গে মিল রেখে যাকে ‘হোক চুম্বন’-ও বলা হচ্ছে। কেবল যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরাই নন, বাইরে থেকেও অনেকে যোগ দেন এ দিনের আন্দোলনে। ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকাও।

নিজের জীবনটা নিজের মতো করে বাঁচার অধিকারের দাবিতে তাঁরা যে এ দিন ‘কিস অব লাভ’ নাম দিয়ে ওই আন্দোলন করবেন, সে কথা আগেই জানিয়েছিলেন যাদবপুরের একদল পড়ুয়া। বিকেল পাঁচটা নাগাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেট থেকে মিছিল শুরু করেন তাঁরা। হাতে পোস্টার ‘অজন্তার গুহা থেকে যাদবপুর থানা, ধার্মিক গোঁড়ামির দুর্গে হানা’। মিছিল শেষ হয় যাদবপুর থানার সামনে। সেখানে মানবশৃঙ্খল করেন তাঁরা। শুরু হয় চুমু খাওয়া, জড়িয়ে ধরা। এর পরে পড়ুয়ারা ফিরে যান এইট বি-র মোড়ে।

কী চান তাঁরা? স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী তিস্তা রায়বর্মণের জবাব, “প্রকাশ্যে কাউকে মারধর করলে সেটা তো আমাদের সমাজে আপত্তিকর বলে মনে হয় না! কিন্তু কারও প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করলে খুব আপত্তি, গেল গেল রব! কেন? আমার মন, আমার শরীর নিয়ে আমি কী করব, তা নিয়ে কারও নীতিপুলিশির জায়গা নেই। সেটাই আমরা জানাতে চাই।” সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পাশাপাশি এই আন্দোলন গত ২৮ অগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেলে এক ছাত্রীর নিগ্রহের ঘটনারও প্রতিবাদ বলে জানান ওই ছাত্রী।

দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত ওই মোড়ে এমন দৃশ্য দেখে খানিকটা হতভম্ব হয়ে পড়েন পথচলতি মানুষ। কেউ হাঁ করে দেখতে থাকেন, কেউ মাথা নেড়ে ঘাড় নিচু করে চলে যান। কারও বা মুখে ছিল ফিচেল হাসি। এক বৃদ্ধের প্রতিক্রিয়া— “ইশ! ছি ছি, এ সব কী!” আন্দোলনকারীদের অবশ্য ও সবে কান নেই। তাঁরা এক বন্ধুকে ছেড়ে অন্য বন্ধুকে জাপট ধরছেন, চলছে লম্বা লম্বা চুমু। দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যম ক্যামেরাবন্দি করছে সেই দৃশ্য।

কী ভাবে দেখছেন একে? সমাজতাত্ত্বিক অভিজিত্‌ মিত্রের কথায়, “আমাদের দেশে প্রকাশ্যে থুতু ফেললে, প্রস্রাব করলে, মলত্যাগ করলে কারও আপত্তি নেই। অথচ প্রকাশ্যে চুমুতে আপত্তি! দোষ কী চুম্বনে? প্রিয়জনকে দেখলে আমার মন তো চাইবেই তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে। নতুন প্রজন্ম সমাজে এই পরিবর্তন আনছে দেখে আমি উচ্ছ্বসিত!” রাজ্যের মন্ত্রী তথা নাট্যব্যক্তিত্ব ব্রাত্য বসু প্রশ্ন তুলেছেন, আধুনিকতার সীমা কতদূর, তা নিয়ে। লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্য অবশ্য এতে খারাপ কিছু দেখছেন না। তিনি বলেন, “প্রজন্ম এগিয়ে চলেছে। প্রতিবাদ তার নিজস্ব ভাষা খুঁজে নেয়। তাদের প্রতিবাদের ভাষা আমাদের মতো বুড়োদের ভাল না-ই লাগতে পারে। তারা যা করেছে ঠিক করেছে।”

তবে এখনও রাস্তায় হাত ধরে হাঁটলেও আড় চোখে বাঁকা দৃষ্টি দিতে অভ্যস্ত সমাজের একাংশ। অনেকেরই প্রশ্ন, পার্কে বা লেকের ধারে বসে প্রেমিক-প্রেমিকা একটু খুনসুটি করলেও তো উর্দিধারী আইনরক্ষকেরা এসে চোখ রাঙান, তা হলে এত বড় একটা ঘটনায় তারা কেন নীরব দর্শকের ভূমিকায়! বিশেষজ্ঞেরা অবশ্য জানাচ্ছেন, প্রকাশ্যে চুমু খেলে পুলিশকে লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে যেতে হবে, এমন কোনও ধারা দেশের আইনে নেই। পুলিশ অনেক সময়েই যা করে, সেটাকে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ই বলছেন তাঁরা।

প্রাক্তন বিচারপতি ভগবতীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৪ ধারায় বলা আছে, কোনও ব্যক্তি যদি রাস্তায় অশালীন আচরণ করেন, তাতে অন্যদের বিরক্তির উদ্রেক হলে বা মানসিক আঘাত লাগলে মামলা হতে পারে। তবে প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার ক্ষেত্রে সেই অশালীনতার ধারা প্রয়োগ হবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট বিচারপতির উপরে। ভগবতীবাবুর কথায়, “প্রকাশ্যে অশ্লীল গান করলে বা গালিগালাজ করলেও ওই ধারা প্রয়োগ করা যাবে।”

প্রাক্তন পুলিশকর্তা সমীর গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায়, “অশালীনতা কে মাপবে? কেউ স্বেচ্ছায় চুমু খেলে কারও বিরক্তিই বা হবে কেন, কেনই বা মানসিক আঘাত লাগবে?” তা হলে পুলিশ পার্কে বসা তরুণ-তরুণীদের ধরে কেন? সমীরবাবুর কথায়, “পুলিশ ক্ষমতার অপব্যবহার করে। পুলিশের দ্বারা হেনস্থা হওয়ার পরে কেউ আদালতের দ্বারস্থ হলে পুলিশকেই মুশকিলে পড়তে হবে!”

আইনকানুন না জানলেও একগাদা ছেলেমেয়েকে রাস্তায় চুমু খেতে দেখে স্কুলফিরতি এক ছাত্রী হয়তো সেই জন্যই সঙ্গে থাকা অভিভাবককে বলে ফেলে— “অ্যায়সা করনে মে বহুত মজা আতা হ্যায়। হ্যায় না?”

kiss kissing publicly jadavpur kolkata news online kolkata news publicly kiss protest kolkata different protest boy girl kissing
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy