E-Paper

যত্রতত্র পার্কিংয়ে নাভিশ্বাস শহরের, সাত দিনে রেকর্ড মামলা পুলিশের

শীতের এই সময়ে উৎসব যাপনের জন্য ভিড় হয়, কলকাতার পরিচিত এমন জায়গাগুলির আশপাশে বড় রাস্তা থেকে অলিগলির মধ্যে এ ভাবেই বেআইনি পার্কিংয়ের রমরমা চলছে বলে অভিযোগ। বাদ যাচ্ছে না ব্যস্ত সময়ের অফিসপাড়া থেকে বাজার এলাকাও।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৬:১৪

— প্রতীকী চিত্র।

শীতের সকালে চিড়িয়াখানার সামনে পৌঁছতেই হাত দেখিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন এক যুবক। সঙ্গে থাকা যুবকের মন্তব্য, ‘‘চিড়িয়াখানায় যাবেন তো? পার্কিং করিয়ে দেবে আমাদের ছেলেরা। আপনার সঙ্গেই যাচ্ছে।’’ আলিপুর রোড হয়ে ধনধান্য প্রেক্ষাগৃহের পাশের রাস্তা দিয়ে এর পরে নিয়ে চললেন ওই যুবক। বেশ কিছুটা দূরে যেখানে নিয়ে যাওয়া হল, সেটি একটি পাড়া। সেখানেই রাস্তার ধারে গাড়ি রেখে দিতে বলা হল। সেখানকার পরিস্থিতি এমনই যে, গাড়ি রাখলে অন্য গাড়ির পথ করে এগোনো মুশকিল। এখানে কেন? যুবকের উত্তর, ‘‘এটাই তো পার্কিং! যত ক্ষণ খুশি রাখুন, ২০০ টাকা!’’

শীতের এই সময়ে উৎসব যাপনের জন্য ভিড় হয়, কলকাতার পরিচিত এমন জায়গাগুলির আশপাশে বড় রাস্তা থেকে অলিগলির মধ্যে এ ভাবেই বেআইনি পার্কিংয়ের রমরমা চলছে বলে অভিযোগ। বাদ যাচ্ছে না ব্যস্ত সময়ের অফিসপাড়া থেকে বাজার এলাকাও। সব মিলিয়ে শহর জুড়েই নাভিশ্বাস ওঠার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী নাগরিকদের। তাঁদের অনেকেরই দাবি, বেআইনি পার্কিংয়ের জন্য বাস বা অন্যান্য গাড়ি চলার পথ পাচ্ছে না। যে দূরত্ব যেতে মিনিট পাঁচেক সময় লাগে, সেই পথ পেরোতেই লেগে যাচ্ছে এক ঘণ্টার কাছাকাছি। বিষয়টি নিয়ে কলকাতা পুলিশের অন্দরেও আলোচনা চলছে। কারণ, দেখা যাচ্ছে, নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে সব চেয়ে বেশি ট্র্যাফিক বিধিভঙ্গের মামলা হয়েছে বেআইনি পার্কিং নিয়ে।

সূত্রের খবর, কলকাতা পুলিশ এলাকায় গত সাত দিনে চারশোটির বেশি মামলা হয়েছে বেআইনি পার্কিং নিয়ে। মোটর ভেহিক্‌ল আইন, ১৯৮৮ এবং পশ্চিমবঙ্গ মোটর ভেহিক্‌ল রুল, ১৯৮৯-এর বিভিন্ন ধারায় মামলাগুলি করা হয়েছে। মূল যে ধারাগুলি প্রয়োগ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে মোটর ভেহিক্‌ল আইনের ১২২/১৭৭ (নো-পার্কিং জ়োন-এ গাড়ি রাখা), মোটর ভেহিক্‌ল আইনের ১২৭, পশ্চিমবঙ্গ মোটর ভেহিক্‌ল রুলের ২৮৬ (যানবাহন বা মানুষের যাতায়াতে বাধা সৃষ্টি), মোটর ভেহিক্‌ল আইনের ১২২ (বিপজ্জনক ভাবে গাড়ি রাখা) এবং মোটর ভেহিক্‌ল আইনের ১৭৭ (ফুটপাতে পার্কিং করা)।

পুলিশের এক কর্তার মন্তব্য, ‘‘আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এ ব্যাপারে আরও কড়া পদক্ষেপ করা হবে। বৈধ পার্কিংয়ে নির্ধারিত সংখ্যার বাইরে বাড়তি গাড়ি রাখার ব্যাপারে পুরসভাকে নজর দিতে বলা হয়েছে। বেশ কিছুহাসপাতালের পার্কিংয়েও বাইরের গাড়ি রেখে বেআইনি ভাবে টাকা তোলা হচ্ছে। এর জেরে সব মিলিয়ে কলকাতার স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।’’

পুরসভা যদিও বেআইনি পার্কিংয়ের ব্যাপারে পুলিশকেই আরও সক্রিয় হতে হবে বলে দাবি করেছে। কারণ, পুরকর্তাদের যুক্তি, শহরের রাস্তায় রাতের পার্কিং শুধু তাদের অধীনে পড়ে। সারা দিনের পার্কিংয়ের বিষয়টি পুলিশেরই দেখার কথা। তবে, পুরসভার অন্দরেও পার্কিং নিয়ে তির্যক মন্তব্য শোনা যায় প্রায়ই। দিনভর তো বটেই, রাতের পার্কিংয়ের বহু টাকাও পুরসভা পায় না। নেতা-দাদাদের হাত ধরে হওয়া সেই পার্কিং থেকে পুরসভার কোনও আয় হয় না।

পুরসভা সপ্তাহে দু’দিন রাতে অভিযানে বেরোনোর কথা বললেও এমন সমস্ত এলাকায় নজরদারি চালানোর মতো পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মী পুরসভার নেই বলে মন্তব্য করেছেন পুরকর্তাদের একাংশ। এমনকি, রাতে এই ধরনের অভিযানে বেরিয়ে পুরকর্মীদের মার খেতে হচ্ছে বলেও শোনা যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে শহর সাফ রাখতে বাধা পাওয়ায় সম্প্রতি কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম সকাল ৭টা থেকে ৯টা সমস্ত রাস্তা থেকে গাড়ি সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। নগরপালের সঙ্গেও এ ব্যাপারে তাঁর কথা হয়েছিল। কিন্তু এর পরেও শহরের রাস্তা থেকে সকালের ওই সময়ের পার্কিং সরেনি। মেয়র এ ব্যাপারে বলেন, ‘‘পুলিশকে ফোন করে বলার পরেও কাজ হয়নি। কেন হয়নি, বলতে পারব না। শহর অপরিচ্ছন্ন থাকলে তার দায় কে নেবে?’’

পুলিশকে পার্কিংয়ের ব্যাপারে সতর্ক করেছে কলকাতা হাই কোর্টও। এ ব্যাপারে কলকাতা পুলিশের এক শীর্ষ কর্তার মন্তব্য, ‘‘ব্যাপক ধরপাকড় চালানো হচ্ছে। রেকর্ড সংখ্যক মামলা সেই কারণেই হয়েছে। আগামী কয়েক দিন শহর জুড়ে যত্রতত্র পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Parking Zone Parking Fees Illegal Parking Illegal Parking Business

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy