প্রথম দেখায় একেবারেই মনে ধরেনি এ পাড়াটা। দশ বছর আগে যখন এখানে এসেছিলাম তখন মনে হত যেন কলকাতা থেকে অনেক দূরে কোথাও রয়েছি। তখন নাকতলা অঞ্চলটা আরও পাড়া পাড়া ছিল। আশপাশে ছিল আরও গাছপালা, পুকুর এবং মাঠ। আগে থাকতাম দেশপ্রিয় পার্কের কাছে বিপিন পাল রোডে। সে পাড়াটা ছিল অনেক জমজমাট, অভিজাত। সে তুলনায় প্রথম দিকে এ পাড়াটাকে মনে হত বড্ড সাদামাঠা।
আর আজ, বেশি দিন এ পাড়া ছেড়ে দূরে থাকলে মন কেমন করে সেই পাড়া পাড়া পরিবেশ আর চেনা মুখগুলোর জন্য। হয়তো একেই বলে টান। নিজের অজান্তেই কখন যেন আপন হয়ে গিয়েছে মানুষগুলো, বাড়িগুলো আর চারপাশের গাছপালা।
নাকতলা অঞ্চলটা অনেকটাই বড়। তার মধ্যে আমার পাড়াটাকে অনেকে নাকতলা উদয়ন সঙ্ঘের পাড়া বলে থাকেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু রোডের ধারে নাকতলা পোস্ট অফিসের পাশের রাস্তাটাই আমার পাড়া। এ অঞ্চলে মূলত বসবাস পূর্ববঙ্গ থেকে আসা ভিটে-মাটি হারা মানুষের। দেশভাগের স্মৃতি বুকে চেপে রেখে তাঁরা এখানে বসতি গড়ে তুলেছেন। এখানে আগে ছিল মূলত মধ্যবিত্ত মানুষের বসবাস। এখন এসেছেন উচ্চমধ্যবিত্তেরাও।
দশ বছর আগেও এ পাড়ায় বাড়ির সংখ্যাই ছিল বেশি। সময়ের সঙ্গে একটা একটা করে বাড়ি ভেঙে তৈরি হচ্ছে বহুতল। এসেছেন কত নতুন মানুষ। ফলে গত কয়েক বছরে বেড়েছে এলাকার জনসংখ্যাও।
বরাবরই এ পাড়ার মানুষ মিশুকে। নিজে থেকে এসে আলাপ করা, দেখা হলে দু’দণ্ড দাঁড়িয়ে কথা বলা বা কোনও সমস্যার কথা জানতে পারলে যথাসাধ্য সাহায্য করা এখানকার বৈশিষ্ট্য। একটা ঘটনা বলি। এক বার আমার এক ছাত্রী আমারই বাড়ির দোতলায় অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়েছিল। ঘরটি ভিতর থেকে বন্ধ থাকায় দরজা খোলা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন পাড়ারই কিছু ছেলে পাইপ বেয়ে উঠে বারান্দা দিয়ে ঢুকে দরজা খুলে সেই ছাত্রীকে উদ্ধার করে।
ভাবতে ভাল লাগে এ পাড়ায় লোকবলের অভাবে কাউকে অসহায় বোধ করতে হয় না। আজকের কর্মব্যস্ত যুগেও কেউ না কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। খুব জানতে ইচ্ছে করে অন্য পাড়াতেও কি এমনটা হয়?
বাড়ির কাছেই নাকতলা উদয়ন সঙ্ঘ ক্লাব। তাদের উদ্যোগে বছরভর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড হয়। তাদের উদ্যোগে দুর্গাপুজো শহরের নামকরা পুজোগুলির অন্যতম। এ ছাড়াও
আছে অরবিন্দ সঙ্ঘ, বহ্নি ক্লাব-সহ বহু ক্লাব।
এখানে এখনও অনেক গাছপালা রয়েছে। বাড়ির সামনে ওই যে কদমগাছটা, ওটা দেখেই বাড়িটা পছন্দ করেছিলাম। সব চেয়ে বড় ব্যাপার শহর জুড়ে যেখানে এত দূষণ বাড়ছে সেখানে এ পাড়ায় এখনও প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। সেই কাকভোরে পূব-আকাশ ফিকে হতেই শোনা যায় পাখির কিচিরমিচির। তাতেই ঘুম ভাঙে। বেলা বাড়ার সঙ্গে তা মিলিয়ে যায় হরেক ফেরিওয়ালার ডাক আর যানবাহনের হর্নের তীব্র আওয়াজে।
আগে পানীয় জলে ‘আয়রন’ বেশি থাকায় খুব সমস্যা হত। ছবিটা এখন বদলেছে। কাছেই বুস্টার পাম্পিং স্টেশন তৈরি হওয়ায় জলের সমস্যা মিটেছে। সময়ের সঙ্গে এ পাড়াতেও উন্নতি চোখে পড়ে। জোরালো আলো বসানোয় পাড়াটা এখন রাতেও ঝলমলে। সময়ে সময়ে রাস্তাঘাটও মেরামতি করা হয়। প্রতি দিন নিয়মমাফিক জঞ্জাল সাফাই হলেও পরিষ্কার হওয়ার পরের মুহূর্ত থেকেই জানলা দিয়ে রাস্তায় আছ়ড়ে প়ড়ে আবর্জনা। এক দিকে যখন স্বচ্ছ ভারত গড়তে দেশ জুড়ে এত উদ্যোগ সেখানেই কিছু মানুষের নাগরিক সচেতনতার অভাবে আমাদের পাড়ার যেখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে আবর্জনা। বিশেষ করে আমার বাড়ির ঠিক সামনে এটা পরিচিত দৃশ্য। কাছেই একটা পুকুর আছে, তার ধারটা আবর্জনায় ভরা থাকে।
আছে আরও কিছু সমস্যা যেমন, মশার উপদ্রব। রাস্তায় মাঝে মাঝে ব্লিচিং আর মশার তেল ছড়ানো হলেও মশার সমস্যা বছরের পর বছর অপরিবর্তিত থাকে। এখন বৃষ্টিতে জল জমলেও আগের তুলনায় তা তাড়াতাড়ি নেমে যায়। এ পাড়ায় পার্কিং সমস্যা খুব একটা নেই। এ অঞ্চলে তৈরি হয়েছে বহু নতুন দোকান। অনেক রাত পর্যন্ত দোকানপাট খোলা থাকে। দরকারে রাত বারোটাতেও ওষুধের দোকান খোলা পাই।
এ পাড়ার সব চেয়ে ভাল ব্যাপার কেউ কারও ব্যাপারে নাক গলান না, বিরক্ত করেন না। যেমন আমার বাড়িতে সারা দিনই চলে নাচের মহড়া, কত ছাত্র-ছাত্রী এবং গুণিজন আসেন। প্রতিবেশীরা কখনও তাতে বিরক্তি প্রকাশ করেন না। পাড়াটা খুবই নিরাপদ। বহু রাতে ছাত্রীরা ক্লাস সেরে বাড়ি ফেরে, কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
কাছেই থাকতেন ফুটবলার কৃশানু দে। এখানে আসার পরে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল সাংবাদিক অমিতাভ চৌধুরী, বসন্ত চৌধুরীর সঙ্গে। সময়ের সঙ্গে কমছে আড্ডা দেওয়ার মতো মানুষের সংখ্যা। এ পাড়ায় এসে রকের আড্ডা দেখিনি ঠিকই, তবে আড্ডা আজও আছে চায়ের দোকানে বা মুদির দোকানে। মাঠের মাঝে বা গলির মুখে চেয়ার পেতে চলে অল্পবয়সী থেকে প্রবীণদের আড্ডাটা। অবশ্য ছুটির দিনে আড্ডার ছবিটা বেড়ে যায়।
এখানে আজও খেলাধুলোর চল দেখা যায়। ছোট থেকে বড় খেলাধুলোয় আগ্রহের কোনও কমতি নেই। কাছাকাছির মধ্যে রয়েছে তিনটি বড় মাঠ। সেখানেই বছরভর হয় অনেক টুর্নামেন্ট। বিকেল হলেই কিছু ছেলে গ্রীষ্ম হোক বা বর্ষা মাঠে ছোটে।
এ পাড়ায় পেয়েছি মানুষের ভালবাসা, আন্তরিকতা। সেটাই হয়তো আমায় আটকে রেখেছে এ পাড়ায়। এ পাড়া ছাড়ার কথা ভাবলেই মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে যায়। ওই যে টানটা আছে ওটা বোধ হয়
তারই প্রভাবে।
লেখক বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী
ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য