বাবা, ভাইদের সঙ্গে বিহারের মুঙ্গের থেকে কলকাতায় কাজের খোঁজে এসেছিলেন মানিকচাঁদ কুমার। সকলে মিলে একসঙ্গে একই ঠিকাদারের অধীনে কাজ করছিলেন। দৈনিক বা মাসিক মজুরি না-মিললেও রোজ খাবার জুটত। মজুরি হাতে না-পেলেও জমা থাকত ঠিকাদারের কাছে। বুধবারের দুর্ঘটনা সবকিছু বদলে দিল মানিকচাঁদের। পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। বেঁচে আছেন তিন জন। তবে বুধবারের দুর্ঘটনার অভিঘাত এখনও টাটকা।
তারতলার নির্মীয়মাণ গুদামে কাজ করছিলেন মানিকচাঁদেরা। উপার্জনের আশায় বাবা রাজেন্দ্র রামের সঙ্গে মুঙ্গের থেকে কলকাতায় এসেছিলেন তাঁরা। সঙ্গে ছিলেন তাঁদের খুড়তুতো ভাই শিরচন কুমারও। বুধবারও ওই নির্মীয়মাণ গুদামে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করছিলেন মানিকেরা। ঢালাইয়ের কাজ ছাড়াও ওই স্থানে নানা কাজে যুক্ত ছিলেন তাঁরা। আচমকা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ। ধ্বংসস্তূপের তলায় চাপা পড়ে যান তাঁরা।
তারতলার দুর্ঘটনায় মানিক হারিয়েছেন দুই ভাই মন্নু এবং ঘি কুমারকে। পরে এসএসকেএমের মর্গে গিয়ে দেখেন তাঁর কাকার ১৮ বছর বয়সি ছেলে শিরচনের দেহও পড়ে রয়েছে। মুহূর্তের দুর্ঘটনা কী ভাবে তাঁর জীবন বদলে দিল, তা এখনও ভেবেই উঠতে পারছেন না মানিক। প্রাণে বাঁচলেও ভাইদের হারিয়ে অসহায়তা গ্রাস করেছে তাঁকে। দুর্ঘটনায় জখম হয়েছিলেন মানিক। তিনি জানান, এখনও চিকিৎসা চলবে তাঁর। বাবা রাজেন্দ্রের মুখের চোয়ালের একটা জায়গায় আঘাত লাগে। চিকিৎসার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
দুর্ঘটনার পর পরই কী ঘটেছিল, তা চোখ বন্ধ করলে ভেসে উঠছে মানিকের স্মৃতিতে। আর কেঁপে কেঁপে উঠছেন তিনি। জানান, দুর্ঘটনা ঘটার কয়েক ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপের তলা থেকে প্রথমে বার হতে পেরেছিলেন তিনি এবং তাঁর ভাই শহিদ কুমার। তার পরই উদ্ভ্রান্তের মতো এ দিক, ও দিক পরিবারের বাকি সদস্যদের খোঁজ শুরু করেন তাঁরা। শরীর দিয়ে তাঁদের রক্ত ঝরছে, তবে বাবা এবং বাকি ভাইয়েরা কোথায়, আদৌ বেঁচে আছেন কি না, সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিল মানিকদের মনে। জানালেন, পরে একে একে বাবা-সহ পরিবারের বাকি সদস্যদের বার করে আনা হয়। শেষে বার করা হয় শিরচনকে।
আরও পড়ুন:
মানিক জানান, পেটের টানে যেখানে একটু বেশি মজুরির কাজ পাওয়া যায়, সেখানেই ছোটা। সেই সন্ধানেই বিহার থেকে কলকাতা আসা তাঁদের। মানিকের কথায়, ‘‘পাম্প, ঢালাইয়ের মিশ্রণ ইত্যাদি উপরে নিয়ে যাওয়ার যে যন্ত্র ছিল তাতেই একটা কম্পন অনুভূত হচ্ছিল।’’ তবে তখনও তাঁরা কেউ বোঝেননি এত বড় দুর্ঘটনা ঘটতে চলেছে। মানিক মনে করেন, উপরের ঢালাই আগে করে ফেলা বোকামি ছিল। কিন্তু তা বুঝতে পেরেও কিছু বলার উপায় ছিল না তাঁদের।
তিন ভাইয়ের মৃত্যুর সঙ্গে অর্থের চিন্তায় ঘুম উড়েছে মানিকদের। তিনি জানান, ঠিকাদার সপ্তাহে শুধু খাবারের টাকা দিতেন। পরিবারের সবাই মিলে কাজ করে দু’লক্ষের বেশি টাকা মজুরি বাকি রয়েছে। যিনি ওই কাজের ঠিকাদার ছিলেন, তাঁরও মৃত্যু হয়েছে। এখন মজুরির টাকা কোথায় পাবেন, সেই চিন্তা গ্রাস করেছে মানিকদের। আশায় সরকারি সাহায্যের। মানিকের কথায়, ‘‘সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেই টাকা হাতে পেলে হয়তো কিছু দিন সংসার চলবে। আবার কবে কাজ পাব, বাকি মজুরি পাব জানি না।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- বুধবার দুপুরে তারাতলার ওই নির্মীয়মাণ গুদাম আচমকাই ভেঙে পড়ে। সেই গুদাম তৈরির কাজ করছিলেন বেশ কয়েক জন শ্রমিক।
- দুর্ঘটনার কারণে ভেঙে পড়া গুদামের ধ্বংসস্তূপের তলায় আটকে পড়েন তাঁরা।
- তারাতলা বিপর্যয়ে গুদামের মালিক শম্ভুনাথ বেহরাকে পাকড়াও করেছে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে খবর, বুধবার মধ্যরাতে তারাতলা এলাকারই একটি আবাসন থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
-
ফিরহাদের গ্রেফতারি চেয়ে সুর চড়াচ্ছে কালীঘাট-তৃণমূল, বাম, কংগ্রেসও! ‘নিরাপত্তার’ প্রশ্নে কি বিপাকে ঋতব্রতের শিবির?
-
ফিরহাদকে গ্রেফতার করে জেরা করা হোক!’ তারাতলার ঘটনায় শুভেন্দুর আক্রমণের পরে কুণালেরও নিশানায় কলকাতার প্রাক্তন মেয়র
-
তারাতলা বিপর্যয়ে ফিরহাদের সেই ‘ডান হাত’কে ধরল পুলিশ, শুভেন্দুর নিশানার পর গ্রেফতার কালীচরণ, চলছে জিজ্ঞাসাবাদ
-
‘তিনি না বললে পুরসভায় প্ল্যান পাশ হয় না’, তারাতলা-কাণ্ডে মুখ্যমন্ত্রীর নিশানায় কোন ‘কালী’
-
তিনি না-বললে প্ল্যান পাশ হয় না পুরসভায়! তারাতলা বিপর্যয়ে মুখ্যমন্ত্রীর নিশানায় ফিরহাদের ডান হাত, কে এই কালীচরণ?