দু’দিন ধরে বৃষ্টির পরে রোদ উঠেছে সকাল থেকেই। শুকোতে শুরু করেছে পথঘাট। কিন্তু অন্য ছবি দেখাল শহরের বিভিন্ন প্রান্তের নির্মীয়মাণ উড়ালপুলগুলি। কাজ চলছে পুরোদমে। তার পাশেই এখানে-ওখানে জমে রয়েছে জল। পতঙ্গবিশারদেরা বলছেন, এ ভাবে জমা জলই বিভিন্ন মারণরোগের জীবাণু বহনকারী মশাদের আঁতুরঘর হয়ে উঠছে।
এমনিতেই সারা শহরে নির্মাণকাজের আধিক্য নিয়ে যন্ত্রণার শেষ নেই শহরবাসীর। এর পরে এই বর্ষায় জল জমার সমস্যা আরও উস্কে দিয়েছে বিতর্ক। অল্প বৃষ্টিতেই এখানে-ওখানে জমছে জল। আর সেই জল পরিষ্কার করার ব্যাপারে নেই কোনও সরকারি উদ্যোগ। এই ঘটনা ডেঙ্গি-ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগগুলির বাড়বাড়ন্তের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
বেশ কয়েক বছর শহরের একটা দীর্ঘ অংশ ঢেকেছে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পের নির্মীয়মাণ উড়ালপুলে। তার বিভিন্ন জায়গাতেও একই চিত্র। মানিকতলা মেন রোডের পাশ দিয়ে মেট্রোর নির্মীয়মাণ উড়ালপুলের উপরে উঠতেই দেখা গেল, ঢালাইয়ের কাজ চলছে। তার ঠিক নীচেই জমজমাট কর্মকাণ্ডের ফাঁকফোকরে জমে রয়েছে জল। ছড়ানো আবর্জনা ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। কোথাও কোথাও এত দিন ধরে জল জমে আছে যে, পড়ে গিয়েছে শ্যাওলা।
কাদাপাড়ার কাছে তৈরি হচ্ছে এই মেট্রো রুটেরই একটি স্টেশন। প্ল্যাটফর্ম ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখনও ছাউনি পড়েনি। প্রস্তুতি চলছে লাইন পাতার। তবে কারও নজর নেই চত্বরের এ দিক-ও দিক জমে থাকা জলের দিকে। প্ল্যাটফর্ম চত্বরের উপরে আর নীচে তো বটেই, জল জমেছে লাইন পাতার জায়গাতেও। কোথাও কোথাও প্রায় ছ’ইঞ্চি থেকে এক ফুট গভীরতার গর্ত। টানা বৃষ্টির পরে সেগুলিই মশাদের ডিম পাড়ার আদর্শ জায়গা হয়ে উঠতে চলেছে নিশ্চিত ভাবে।
হাইল্যান্ড পার্কের কাছেও একই দৃশ্য। কর্মীদের পাশাপাশি সেখানে হাজির পদস্থ ইঞ্জিনিয়ারেরাও। কিন্তু পরিচ্ছন্নতার চিত্র যে-কে-সেই। উড়ালপুল জুড়ে জায়গায় জায়গায় জমে জল। উড়ালপুলের স্তম্ভগুলি চারপাশেও ভাঙাচোরা গর্ত। জল জমার এবং মশার ডিম পাড়ার আদর্শ অবস্থা তৈরি হচ্ছে
এ ভাবেই।
জোকা-বি বা দী বাগ মেট্রো রুটের জন্য নির্মীয়মাণ উড়ালপুলে দুর্বিষহ অবস্থা ডায়মন্ড হারবার রোড জুড়ে। বড়িশার কাছে উড়ালপুলে উঠতে গিয়ে দেখা গেল, ঢালাও জায়গা জুড়ে জমে রয়েছে জল। কোথাও বেশি, কোথাও কম। কোথাও আবার এমন ভাবে ইট পড়ে যে, তৈরি হয়ে গিয়েছে ছোটখাটো চৌবাচ্চা। সেই জলে হাত পড়ে না কারও। স্থির ভাবে জমে থাকা ওই জলই মশাদের আঁতুরঘর হয়ে উঠতে সময় নেবে না।
প্রযুক্তিবিদেরা জানাচ্ছেন, যে কোনও নির্মাণকাজেই খুব গুরুত্বপূর্ণ হয় ঢালের হিসেব। কোথায় কতটা ঢাল হবে, সেই মাপে গণ্ডগোল হয়ে গেলেই জায়গায় জায়গায় গর্ত তৈরি হবে। আর তাতেই সমস্যা হবে জল জমার। এই উড়ালপুলগুলির ক্ষেত্রেও তেমনটাই হয়েছে বলে জানালেন তাঁরা। তাই পরিচ্ছন্নতার সচেতনতার পাশাপাশি প্রশ্ন উঠে গেল উড়ালপুলগুলির প্রযুক্তিগত খুঁটিনাটি নিয়েও।
মেট্রো রেলের পিআরও ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য জানালেন, জল জমা ও ডেঙ্গি নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক মেট্রো কর্তৃপক্ষ। তাঁর কথায়, প্রতি দশ দিন অন্তর স্বাস্থ্য কর্তাদের একটি বিশেষ দল নির্মীয়মাণ উড়ালপুলগুলিতে গিয়ে কীটনাশক ছড়িয়ে আসে। ‘‘জমা জল পরিষ্কার করা সম্ভব হয় না, কিন্তু তাতে যাতে মশা ডিম না পাড়ে, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা হয়,’’ দাবি ইন্দ্রাণীর।