Advertisement
E-Paper

বৌমার হাতে ছেলে ‘খুন’, শাশুড়ির মতে পাপের শাস্তি

‘‘আমার ছেলে যে পাপ করেছে, তার শাস্তি এটাই ছিল’’— বিড়বিড় করে বলছিলেন বৃদ্ধা। বুধবার রাতে বৌমার হাতেই খুন হয়েছে তাঁর ছেলে। কিন্তু বৃদ্ধা এখন শুধু চাইছেন, বৌমা ও নাতির যেন কোনও ক্ষতি না হয়। ওরা যেন সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকতে পারে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০১৬ ০০:২৩

‘‘আমার ছেলে যে পাপ করেছে, তার শাস্তি এটাই ছিল’’— বিড়বিড় করে বলছিলেন বৃদ্ধা।

বুধবার রাতে বৌমার হাতেই খুন হয়েছে তাঁর ছেলে। কিন্তু বৃদ্ধা এখন শুধু চাইছেন, বৌমা ও নাতির যেন কোনও ক্ষতি না হয়। ওরা যেন সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকতে পারে।

পুলিশ জানিয়েছে, নিয়মিত নেশা করা নিয়ে দাম্পত্য কলহের জেরেই স্ত্রীর হাতে খুন হন গরফার নস্করপাড়ার বাসিন্দা শান্তনু চক্রবর্তী (৪৫)। খুনের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁর স্ত্রী শ্রেয়া চক্রবর্তীকে। বৃহস্পতিবার দুপুরে তাঁকে আলিপুর আদালতে তোলা হয়।

Advertisement

শান্তনুবাবুর মা বছর সত্তরের গৌরী চক্রবর্তী বলেন, ‘‘রোজ রাতেই ছেলে মত্ত অবস্থায় ফিরে বৌমা, নাতি এবং আমাকে মারধর করত। বুধবার রাতেও একই কাণ্ড হয়। রাত একটা নাগাদ আমি ঘরে চলে আসি। এর পরেও অনেক রাত পর্যন্ত ঝগড়ার আওয়াজ শুনতে পাই, তবে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পর দিন সকাল সাড়ে ছ’টা নাগাদ ছেলের ঘরে গিয়ে দেখি সে রক্তাক্ত অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছে। বৌমা ও নাতি সোফায় বসে তার এক আত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলছে। এর পরে পুলিশ এসে ছেলের দেহ নিয়ে যায়। ওদের ঘরে তালা দিয়ে দেয়। বৌমা ও নাতিকেও থানায় নিয়ে যায়।’’

কলকাতা পুলিসের ডিসি এসএসডি সন্তোষ পাণ্ডে বলেন, ‘‘খুনের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে শ্রেয়াদেবীকে। তার ঘর থেকে একটি ঘাস কাটার ছুরি এবং শিলনোড়া উদ্ধার করা হয়েছে।’’ প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, ওই শিলনোড়া দিয়েই শ্রেয়াদেবী শান্তনুবাবুকে আঘাত করেন। তদন্তকারীরা জানান, ঘরের ভিতরে শান্তনুবাবুর সঙ্গে শ্রেয়াদেবীর ধস্তাধস্তিরও প্রমাণ মিলেছে। সেই সব নমুনার উপরে ভিত্তি করে তদন্তকারীদের আরও অনুমান, ওই ঘাস কাটার ছুরি নিয়ে শ্রেয়াদেবী এবং ছেলের উপরে চড়াও হয়েছিলেন শান্তনুবাবু।

স্থানীয় সূত্রে খবর, বছর দুয়েক ধরে কোনও কাজ ছিল না শান্তনুবাবুর। এক সময়ে তিনি একটি বেসরকারি দুগ্ধ উৎপাদন সংস্থায় কাজ করতেন। শ্রেয়াদেবীই টিউশনি করে সংসার চালাচ্ছিলেন। শান্তনুবাবু ছিলেন শান্ত ও নিরীহ স্বভাবের। গাছ খুব ভালোবাসতেন তিনি। এক পড়শি রাহুল চক্রবর্তী বলেন, ‘‘দিনে ওঁনার মতো ভদ্র লোক খুব কম মেলে। কিন্তু রাতে মদ খাওয়ার পরেই পুরো বদলে যেতেন। মাসিমা, বৌদিকে মারধর করতেন। মারধর করতেন ছেলেকেও। অনেক বুঝিয়েও লাভ হয়নি।’’ পড়শিরা জানান, শান্তনুবাবুর একমাত্র ছেলে শহরের এক সরকারি কলেজে বিএসসি পড়ুয়া।

শান্তনুবাবুর পরিবার সূত্রে খবর, আসক্তি ছাড়াতে শান্তনুবাবুকে দু’বার রিহ্যাব সেন্টারে পাঠানো হয়েছিল। দ্বিতীয় বার সেখান থেকে ফেরার পরেই তার চাকরি চলে যায়। কিছু দিন নেশা করা বন্ধ থাকলেও এর পরেই তাঁর মধ্যে ‘উইথড্রয়্যাল সিনড্রোম’ দেখা দেয়। তখন পরিবারের লোকজনই তাঁকে সপ্তাহে তিন দিন করে নেশা করার অনুমতি দিয়েছিল বলে জানান মা গৌরীদেবী। তাঁর বক্তব্য, ‘‘তিন দিনের বদলে ছেলে ফের রোজ রাতে মদ খেয়ে অশান্তি শুরু করে।’’

ঘটনা প্রসঙ্গে একটি রিহ্যাব সেন্টারের ডিরেক্টর বিদিশা ঘোষ বিশ্বাস এ দিন জানান, রিহ্যাব থেকে বা়ড়ি ফেরার পরে মদ ছুঁয়েও দেখা যাবে না। অল্প মাত্রায় মাঝেমধ্যে খাওয়ার অনুমতি দেওয়ার কথা যাঁরা ভাবেন, তাঁরা সম্পূর্ণ ভুল ভাবেন। আসলে পরিবারের মানুষ এঁদের সম্পর্কে বেশির ভাগ সময়েই বীতশ্রদ্ধ থাকেন। মনে করেন, এঁরা যা করছেন সবটাই জেনেবুঝে অন্যকে বিরক্ত করার জন্যই। পরিবারের সহমর্মিতা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি ওষুধ। তা হলে রিহ্যাবে আসার কোনও প্রয়োজনই নেই।

বিদিশা জানান, রিহ্যাব সেন্টারে যাওয়ার পরে নেশা ছাড়ানোর প্রক্রিয়ার পাশাপাশি নানা ভাবে শৃঙ্খলায় ফেরানোর চেষ্টা করা হয়। যেমন নিজের কাজ নিজে করা, নিজের জিনিস নিজের হেফাজতে রাখা ইত্যাদি। দফায় দফায় কাউন্সেলিং শুরু হয়, যাতে পরিবারে ফিরে এঁরা নতুন করে কোনও সমস্যা না তৈরি করেন। কিন্তু সবচেয়ে সমস্যা হয় বাড়ি গিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পরে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে। যাঁরা চাকরি বা পড়াশোনা করেন, তাঁদের ওই দিনটা একাকিত্ব মারাত্মক ভাবে গ্রাস করে। ওই সময়ে রিহ্যাবের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখাটা খুব জরুরি।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy