Advertisement
E-Paper

অনেক ঐতিহ্য ফিকে হলেও রয়ে গিয়েছে আড্ডাটা

আমি গ্রামের ছেলে। তাই শহরে এসেও খুঁজে বেড়াতাম পাড়ার সেই শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। ওই যে বলে, ‘খ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশপাথর’, ব্যাপারটা অনেকটা তেমনই। সেই সত্তরের দশকে যখন ঢাকুরিয়ার মহারাজা ঠাকুর রোডে জমি কিনে, বাড়ি করে এলাম তখন এখানে ছিল মফস্সলের পাড়ার পরিবেশ।

পূর্ণচন্দ্র দাস

শেষ আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০১:২৩

আমি গ্রামের ছেলে। তাই শহরে এসেও খুঁজে বেড়াতাম পাড়ার সেই শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। ওই যে বলে, ‘খ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশপাথর’, ব্যাপারটা অনেকটা তেমনই। সেই সত্তরের দশকে যখন ঢাকুরিয়ার মহারাজা ঠাকুর রোডে জমি কিনে, বাড়ি করে এলাম তখন এখানে ছিল মফস্সলের পাড়ার পরিবেশ। তাই হয়তো পাড়াটাকে ভাল লেগে গিয়েছিল। আগে থাকতাম গোলপার্কে, তারও আগে বালিগঞ্জে। তবু এ পাড়ার সহজ সরল জীবনযাত্রা আর ‘পাড়া পাড়া’ সেই গন্ধটা আমায় আকৃষ্ট করত।

তখন ঢাকুরিয়ায় দেশভাগের রক্তক্ষয়ী অভিজ্ঞতায় ভিটেমাটি হারা মানুষের বসতি, দু’ধারে বড় বড় নর্দমা, পাড়ার প্রান্তে ছুটে যাওয়া রেললাইন আর সন্ধ্যার পরে আলোকস্তম্ভের টিমটিমে মৃদু আলো। পাশেই বাবুবাগান লেন, স্টেশন রোড, কাছেই সেলিমপুর। একটা অদ্ভুত জিনিস দেখেছিলাম এখানে— সেটা হল, পাড়া-পড়শির মধ্যে এক আন্তরিকতার বন্ধন। উচ্চ-নীচ ধনী-দরিদ্রে ভেদাভেদ নয়, ছিল সহমর্মিতার উদার পরিবেশ। মানুষে মানুষে আত্মিক সম্পর্কটাই ছিল পাড়ার আকর্ষণ। কারও কোনও সমস্যা হলে, কোনও অভাব থাকলে পড়শিরা সেটা পূরণ করার চেষ্টা করতেন। কারও বাড়ি তেল বা চিনি ফুরোলে, দোকানে যাওয়ার সময় না থাকলে বিনা সঙ্কোচে প্রতিবেশীর কাছে চেয়ে নিতে কেউ সঙ্কোচ বোধ করতেন না। কেউ বিরক্তও হতেন না।

তখন পাড়ায় কোনও উঁচু বাড়ি ছিল না। সব একতলা বা দোতলা বাড়ি। গাড়িও ছিল তুলনায় অনেক কম। সেই পাড়াটায় আজ ক’টা বাড়ি আছে তা গুণে বলে দেওয়া যায়। একে একে পুরনো বাড়ি ভেঙে তৈরি হচ্ছে বহতল। আসছেন অপরিচিত মানুষেরা। আগে পাড়ায় নতুন কেউ এলে পড়শিরা গিয়ে আলাপ করতেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। আজ ছবিটা ভিন্ন।

Advertisement

সে সময় বাড়ি বাড়ি টেলিফোন ছিল না। পাড়ায় দু’য়েকটি বাড়িতে ফোন থাকায় পাড়ার মানুষ তাঁদের উপরে নির্ভরশীল ছিলেন। কারও কোনও প্রয়োজনে ফোন এলে সেই সব বাড়ির সদস্যরা পড়শিদের হাসিমুখে ডেকে দিতেন, দূরে খবরও দিতেন। কখনও বিরক্ত হতেন না। তেমনই আজকের মতো বাড়িতে বাড়িতে একাধিক টিভিও ছিল না। আশির দশকের গোড়ার দিকে পাড়ায় যাঁদের বাড়িতে টিভি ছিল, সেখানে সন্ধ্যায় বা রাতে ‘হামলোগ’ কিংবা ‘বুনিয়াদ’-এর মতো জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল দেখতে ভিড় করতেন পাড়ার মানুষ।

এই প্রসঙ্গেই মনে পড়ছে আমাদের মধ্যবিত্ত পাড়ার আড্ডার কথা। পাড়ার কিছু রকে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত চলত জমাটি আড্ডা। সেই আড্ডাটাই ধরে রেখেছিল পাড়া-পড়শির যোগসূত্র, সদ্ভাব। এ ছাড়াও রামবিলাসের পানের দোকান, অর্জুনের চায়ের দোকানে বসত জমাটি আড্ডা। এখন পাড়ার যুব সম্প্রদায় আড্ডা দিতে যান রাস্তা পেরিয়ে দক্ষিণাপণে কিংবা মধুসূদন মঞ্চের সামনে। তবে বিক্ষিপ্ত ভাবে পাড়ার কয়েক জন প্রবীণ আড্ডা দেন দু’য়েকটি দোকানের সামনে কিংবা পাড়ার মোড়ে।

আড্ডার পাশাপাশি, পাড়া-পড়শির সুখ-দুঃখের খবর নেওয়া আর যে কোনও সমস্যায় তাঁদের সাহায্য করাটা ছিল এ পাড়ার ঐতিহ্য। এখন কর্মব্যস্ত জীবনে কারও সময় নেই একে অপরের খবর নেওয়ার। তবে রাস্তায় দেখা হলে ক্ষণিকের সৌজন্য বিনিময়টুকু টিকে আছে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে কিছু প্রতিবেশীর কথা। এক সময় অনুষ্ঠান সূত্রে মাসের পর মাস সস্ত্রীক বিদেশে গিয়ে থাকতে হত। আমার ছেলেরা কিন্তু এ পাড়াতেই থাকত প্রতিবেশীদের ভরসায়। পাশের বাড়ির ‘কাকিমা-জেঠিমা’রা সজাগ থাকতেন ছেলেরা ঠিক মতো খাওয়াদাওয়া করল কি না কিংবা পড়তে বসলো কি না। তেমনই আমার স্ত্রীর অসুস্থতার সময়ে প্রতিবেশীরা যে ভাবে সাহায্য করেছিলেন সেটা কখনই ভুলতে পারব না। সেই সব প্রতিবেশীর অভাবটা আজও অনুভব করি। নতুন যাঁরা এসেছেন তাঁদের সঙ্গে সেই আত্মিক সম্পর্কটাই আর তৈরি হল না।

সময়ের সঙ্গে পাড়াটার অনেক উন্নতি হয়েছে। রাস্তা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, আলোকস্তম্ভে জোরালো আলো, আর উন্নত নাগরিক পরিষেবা এলাকাটিকে সমৃদ্ধ করেছে। কাউন্সিলর মধুছন্দা দেব এ ব্যাপারে সচেষ্ট। কিছু সমস্যাও আছে। মহারাজা ঠাকুর রোড রাস্তাটি বেশি চওড়া না হওয়ায় সেখানে গাড়ি পার্কিং করা যায় না। তবে গলিতে গলিতে গাড়ির পার্কিং বিব্রত করে তোলে। তেমনই পাড়ায় ঢোকার মুখে রিকশা দাঁড়িয়ে থাকায় গাড়ি ঢুকতে বেরোতে সমস্যা হয়।

এক সময় এ পাড়ায় খেলাধুলোর ভাল পরিবেশ ছিল। আগে ছোটরা পোদ্দার পার্ক, বাবুবাগান এবং তালপুকুর মাঠে খেলতে যেত। এখন আছে শুধু বাবুবাগানের মাঠটা। এখন সময়ের অভাবেই হোক বা পড়াশোনার চাপে খেলাধুলোর সময়টা কমেছে। আগে এ পাড়ায় ছিল বেশ কিছু বাগান, কচিকাঁচারা মাঝে মাঝে গাছে উঠত, ফল পাড়ত। এখন সেই সব বাগানও নেই, আর নেই ছোটদের সময়ও। এখন যেখানে দক্ষিণাপণ আর তার পাশেই ইন্ডিয়ান অয়েলের অফিস, অতীতে সেটাই ছিল তালপুকুরের মাঠ।

কাছেই রয়েছে বেশ কয়েকটি বাজার। ঢাকুরিয়া স্টেশনের কাছেই সকালে বসে একটি বাজার। সন্ধ্যায় বসে দাসপাড়ার বাজারটি। আর রাস্তা পেরোলে যোধপুর পার্ক বাজার আর একটু দূরে গড়িয়াহাট বাজার। এক সময় ঢাকুরিয়া অঞ্চলটা ছিল কসবা থানার অন্তর্গত, পরে যাদবপুর থানা আর এখন লেক
থানার অন্তর্গত। সেই সত্তরের দশকে যখন আমরা এ পাড়ায় এসেছিলাম তখন সন্ধ্যা হতেই বোমাবাজির আওয়াজ শোনা যেত। সেটা ছিল নকশাল আমল। তবে এখন পাড়াটা শান্তিপূর্ণ।

পাড়ার আশপাশেই থাকতেন কিছু বিখ্যাত মানুষ। যেমন, ব্যানার্জিপাড়ায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, কাছেই থাকতেন শঙ্কু মহারাজ, চুনী গোস্বামী, কাবেরী বোস, প্রবীর মজুমদার, ভারতী দেবী, সুপ্রীতি ঘোষ, অধ্যাপক বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, গণেশ ঘোষ প্রমুখ।

আগে শীতের সকালে এ পাড়ায় মিলত খেজুরের রস। সকালটা শুরু হত পাখির ডাকে। এখন শুরু হয় গাড়ি ও রিকশার আওয়াজে। তবে এখনও শোনা যায় ফেরিওয়ালার ডাক। সময়ের সঙ্গে সব কিছুই বদলায়। যেমন বদলেছে এ পাড়ার মানুষের মানসিকতা, রুচি আর চিন্তাধারা। তবু পাড়াটা পাড়াই আছে। এ পাড়ায় থাকার পরম প্রাপ্তি মানুষের ভালবাসা, শ্রদ্ধা। আমার জীবন সংগ্রামের সাক্ষী এ পাড়াটাই।

এখনও নিশুতি রাতে যখন পাড়াটা নিঃস্তব্ধ হয়ে যায়, খোলা জানলা দিয়ে চারপাশের ঝাঁ চকচকে বহুতলগুলির দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকি। মনে পড়ে যায় পুরনো সেই পাড়াটার কথা। তখনই মনের মাঝে সেই খ্যাপা গেয়ে ওঠে একটা গান ‘কে বানালে এমন ঘর ধন্য কারিগর, যে যায় কারিগরির বলিহারি সে মিস্ত্রির কোথায় ঘর...ধন্য কারিগর।’

লেখক বিশিষ্ট বাউলশিল্পী

ছবি: শুভাশিস ভট্টাচার্য।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy