দু’টি ঘটনাই বেপরোয়া ভাবে গাড়ি চালানোর। দু’টি ঘটনাতেই গাড়ির চাকায় পিষে মৃত্যু হয়েছে মানুষের। কিন্তু ২৯ দিনের ব্যবধানে ঘটা দু’টি ঘটনায় ফারাক শুধু লালবাজারের মনোভাবে।
১৩ জানুয়ারি রেড রোডে কুচকাওয়াজের মহড়া চলার সময় বায়ুসেনার অফিসার অভিমন্যু গৌড়কে পিষে দিয়েছিলেন তৃণমূল নেতা মহম্মদ সোহরাবের ছেলে সাম্বিয়া সোহরাব। সেই ঘটনায় খুনের মামলা রুজু করে সাম্বিয়া এবং তাঁর দুই বন্ধু শানু ও জনিকে পাকড়াও করেছে পুলিশ। কিন্তু ১১ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার মাঝরাতে গড়িয়াহাটে এক ব্যক্তিকে গাড়িচাপা দিয়ে মারার অভিযোগ উঠলেও টিএমসিপি নেতা কণিষ্ক মজুমদারের বিরুদ্ধে সরাসরি খুনের মামলা তো দূরস্থান, অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলাও রুজু করেনি পুলিশ!
লালবাজারের একাংশ বলছে, ওই টিএমসিপি নেতাকে যে সব ধারা দেওয়া হয়েছে তাতে মানুষ মারার অভিযোগেও প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবেন তিনি। পুলিশ সূত্রের খবর, মামলায় ধারা সংশোধনের আর্জি জানানোর ২৪ ঘণ্টা পরেও কণিষ্ককে ডেকে নতুন ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি তদন্তকারীরা। তার ফলে এই ঘটনার তদন্ত শুক্রবার সকালে যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে গিয়েছে।
পুলিশের একাংশ বলছে, গড়িয়াহাটের ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়া ব্যক্তি বৃহস্পতিবার রাতেই ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে মারা যান। কিন্তু শুক্রবার দুপুরে কণিষ্ককে আলিপুর আদালতে হাজির করানো পর্যন্ত পুলিশ তা ‘জানতে পারেনি’। আদালতকেও তা জানাননি তদন্তকারী অফিসার। শুক্রবার রাতে অবশ্য কলকাতা পুলিশের ডিসি (ট্রাফিক) ভি সলোমন নেসাকুমার জানান, আহত ব্যক্তি মারা যাওয়ায় কণিষ্কের বিরুদ্ধে মামলার ধারায় সংশোধন করে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৪এ ধারা (অভিযুক্তের গাফিলতির ফলে কারও মৃত্যু) যুক্ত করা হয়েছে। কলকাতা পুলিশ আলিপুর আদালতকে শুক্রবার বিকেলে মামলায় ধারা সংশোধনের আর্জি জানিয়েছে।
এই সব ধারা সংশোধনের ফলে কী হবে?
পুলিশ ও সরকারি আইনজীবীদের একাংশ জানান, ওই ধারা যুক্ত করা বা না-করা দুই-ই সমান। কারণ, ৩০৪এ ধারা জামিনযোগ্য অপরাধ। সর্বোচ্চ সাজা দু’বছরের জেল। এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশকর্তার কথায়, ‘‘মামলায় ধারা সংশোধন করে পুলিশ নিজের পিঠ বাঁচিয়েছে। আবার টিএমসিপি নেতা কণিষ্কের গায়ে যেন আঁচ না লাগে, সে দিকেও খেয়াল রেখেছে।’’
রেড রোড কাণ্ডে খুনের মামলা কেন, সেই প্রশ্নের উত্তরে লালবাজারের কর্তারা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, কোনও বেপরোয়া ঘটনার জেরে কারও মৃত্যু হতে পারে, এটা জানা সত্ত্বেও তেমন কোনও কাণ্ড ঘট়ালে সেটিকে খুন বলা যেতে পারে। তা হলে গড়িয়াহাটের রাস্তায় বেপরোয়া ভাবে গাড়ি চালানোর সময় কণিষ্ক কি জানতেন না যে গাড়ির ধাক্কায় কারও মৃত্যু হতে পারে?
এ প্রশ্নের উত্তর পেতে কলকাতা পুলিশের ডিসি (ট্রাফিক) ভি সলোমন নেসাকুমারকে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। এসএমএসের উত্তরও দেননি। তবে লালবাজারের এক কর্তার ব্যাখ্যা, গাড়িটি কণিষ্ক চালাচ্ছিলেন না অন্য কেউ চালাচ্ছিলেন, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রেড রোড কাণ্ডে সেই কারণেই সাম্বিয়া-সহ তিন জনের বিরুদ্ধেই খুনের মামলা দায়ের করা হয়েছে! তা হলে এ ক্ষেত্রে কড়া ধারায় মামলা রুজু করা আটকাল কেন? এ প্রশ্নের উত্তর লালবাজারের কর্তাদের কাছে মেলেনি।
তবে পুলিশের এমন ‘দু’মুখো নীতি’-র ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে লালবাজারের অন্দরে অনেকেই বলছেন, রে়ড রোডে তৃণমূল নেতার ছেলের গাড়ির তলায় সেনা অফিসারের চাপা পরার পরেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রক থেকে চাপ এসেছিল। বিষয়ের গুরুত্ব বুঝে নড়েচড়ে বসেছিল নবান্নও। এই ধরনের ঘটনা যে সহজে ধামাচাপা দেওয়া যাবে না, তা বুঝতে পেরে শাসক দলের নেতার ছেলের বিরুদ্ধেও খুনের মামলা দায়ের করেছিল পুলিশ। কিন্তু গড়িয়াহাটে নিহত ব্যক্তি ফুটপাথবাসী ভবঘুরে। ফলে এই মামলায় তেমন কোনও চাপ নেই বলেই শাসক দলের ছাত্রনেতাকে আইনের বাঁধনে বাঁধার চেষ্টা হয়নি বলেই মনে করছেন কলকাতা পুলিশের অনেকে।