Advertisement
E-Paper

গ্যাস লিক করে বস্তিতে বিস্ফোরণ, মৃত শিশু-সহ চার

আনন্দ করে শবে-বরাতের হালুয়া রান্না করতে যাওয়ার এই পরিণতি বোধহয় দুঃস্বপ্নেও দেখেননি তিলজলা রোডের ধারের বস্তির বাসিন্দারা। কোনও ভাবে গ্যাস লিক হয়েছিল বস্তির একটি ঘরের একচিলতে রান্নাঘরে। শুক্রবার বেলা বারোটা নাগাদ সেখানে রান্নার জন্য দেশলাই জ্বালাতেই বিস্ফোরণ। ঘিঞ্জি এলাকায় আগুন মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল আশপাশের চার-পাঁচটি ঘরে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৪ জুন ২০১৪ ০১:১৯
ন্যাশনাল মেডিক্যালে উদ্বিগ্ন পরিজনেরা। শুক্রবার।  ছবি: রণজিৎ নন্দী।

ন্যাশনাল মেডিক্যালে উদ্বিগ্ন পরিজনেরা। শুক্রবার। ছবি: রণজিৎ নন্দী।

আনন্দ করে শবে-বরাতের হালুয়া রান্না করতে যাওয়ার এই পরিণতি বোধহয় দুঃস্বপ্নেও দেখেননি তিলজলা রোডের ধারের বস্তির বাসিন্দারা। কোনও ভাবে গ্যাস লিক হয়েছিল বস্তির একটি ঘরের একচিলতে রান্নাঘরে। শুক্রবার বেলা বারোটা নাগাদ সেখানে রান্নার জন্য দেশলাই জ্বালাতেই বিস্ফোরণ। ঘিঞ্জি এলাকায় আগুন মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল আশপাশের চার-পাঁচটি ঘরে। প্রায় ৯০ শতাংশ পুড়ে গেলেন দুই মহিলা ও এক শিশু-সহ ১২ জন। পুরুষদের বেশির ভাগই উদ্ধার করতে এসে আগুনের কবলে পড়েন। মাঝারি ধরনের অগ্নিদগ্ধ হন আরও তিন জন। ইতিমধ্যে মৃত্যু হয়েছে চার জনের। মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকেরা।

পার্ক সার্কাস স্টেশন লাগোয়া বস্তি থেকে একের পর এক রিকশা ঢুকছিল ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। পুড়ে যাওয়া, আর্তনাদ করতে থাকা মানুষগুলোকে ধরে নিয়ে আসছিলেন এলাকার লোকজন। একটি রিকশায় বসে এক যুবক। হাত-মুখ-গলা সব পুড়ে ঝামা। ‘বঁচা লো, বঁচা লো’ চিৎকার করতে-করতে ন্যাশনাল মেডিক্যালের দরজায় রিকশা থেকে লাফিয়ে নিজেই দৌড়ে হাসপাতালের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলেন তিনি। ছুটে এলেন ওয়াডর্বয়, নার্সরা।

দুপুর তখন প্রায় একটা। ন্যাশনাল মেডিক্যালে ততক্ষণে ভর্তি হয়েছেন ৯ জন পুরুষ, দুই মহিলা ও একটি শিশু। দু’জনকে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অগ্নিদগ্ধ পুরুষ ও মহিলাদের অধিকাংশেরই বয়স ২০-৩০ এর কোঠায়। হাসপাতাল চত্বরে আতঙ্কে, উদ্বেগে তাঁদের আত্মীয়-পরিজনেরা ছুটোছুটি করছেন, চিৎকার করছেন, হাসপাতালের গেট ধরে ঝাঁকাচ্ছেন, বিলাপ করতে-করতে মাটিতে শুয়ে পড়ছেন কিছু মহিলা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবস্থা আরও খারাপ। এমনিতে মেডিক্যাল কলেজ হলেও ন্যাশনালে কোনও আলাদা বার্ন ইউনিট নেই, শুধু মহিলাদের জন্য ৮ শয্যার বার্ন ওয়ার্ড রয়েছে। সেখানে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ বা সংক্রমণ আটকাতে ‘আইসোলেশন রুম’কিছুই নেই। কোনও পুরুষ অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় এলে তাঁর ঠাঁই হয় অন্য রোগীদের সঙ্গে নিউ ক্যাজুয়ালটি ব্লকে। এমন পরিস্থিতিতে একের পর এক প্রায় ৯০% পুড়ে যাওয়া রোগী আসতে থাকায় পরিষেবা সামলাতে নাভিশ্বাস ওঠে কর্তৃপক্ষের। অন্যান্য সব ওয়ার্ড থেকে চিকিৎসকদের জরুরি ভিত্তিতে ডেকে পাঠানো হয়। ততক্ষণে শেখ সাবির আলি নামে বছর বত্রিশের এক অগ্নিদগ্ধের মৃত্যু হয়েছে। অতি সঙ্কটজনক রোগীদের এই হাসপাতালে রাখাটা ঝুঁকির হবে বুঝতে পেরে অগ্নিদগ্ধ চার জন পুরুষ ও তওহিদ নামে একটি ৯ মাসের শিশুকে এম আর বাঙুর হাসপাতালে রেফার করে দেন ন্যাশন্যাল কর্তৃপক্ষ। কারণ বাঙুরের আলাদা বার্ন ইউনিট রয়েছে।

তাতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। অগ্নিদগ্ধদের আত্মীয়-পরিজনের মধ্যে একটা ধারণা তৈরি হয় যে ন্যাশনালে আগুনে পোড়া রোগীর চিকিৎসার ভাল ব্যবস্থা নেই বলে রোগীদের বাঙুরে রেফার করা হচ্ছে। সঙ্গে-সঙ্গে প্রত্যেকেই তাঁদের রোগীকে বন্ড দিয়ে ছাড়িয়ে বাঙুরে নিয়ে যেতে থাকেন। এ দিকে, একসঙ্গে ১২ জন অগ্নিদগ্ধ ন্যাশনাল থেকে বাঙুরে চলে যাওয়ায় চরম সমস্যায় পড়েন বাঙুর কর্তৃপক্ষ।


অগ্নিদগ্ধ এক মহিলা। শুক্রবার, ন্যাশনাল মেডিক্যালে। —নিজস্ব চিত্র।

বাঙুরের সুপার সোমনাথ মুখোপাধ্যায় এর পরে ফোন করেন ন্যাশনাল মেডিক্যালের সুপার পীতবরণ চক্রবর্তীকে। পীতবরণবাবু তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, তাঁরা ৫ জনকে রেফার করেছিলেন। বাকিদের বারবার যেতে বারণ করেছিলেন, কিন্তু পরিজনেরা কথা শুনতে চাননি। পীতবরণবাবুর কথায়, “অতি সঙ্কটজনকদের জন্য এসি ঘর দরকার ছিল। আমাদের যেহেতু আলাদা বার্ন ইউনিট নেই, তাই এসি ঘরও নেই। এই কারণে ৫ জনকে বাঙুরে পাঠিয়েছিলাম। তার আগে এসএসকেএমেও খোঁজ নিয়েছিলাম, কিন্তু ওখানে বার্ন ইউনিটে কোনও শয্যা খালি ছিল না।”

পীতবরণবাবুর আরও বক্তব্য, “সবাই বন্ড দিয়ে চলে যেতে চাইলেন। তখন ওঁদের বললাম, যেতে চাইলে বাঙুরে ভিড় না বাড়িয়ে যেন শম্ভুনাথ পণ্ডিতে যান। সেটাও না-শুনে সবাই বাঙুরে চলে গেলেন।” বাঙুরের সুপার সোমনাথবাবু আবার বলেন, “ন্যাশনাল থেকে পাঠানো রোগীদের কী ভাবে সামলেছি, আমরাই জানি। দু’জন মহিলাকে শম্ভুনাথে রেফার করা হরেছিল। শম্ভুনাথও তাঁদের এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে। পিজি-ও নিতে চায়নি। এতে তো চিকিৎসা ধাক্কা খায়।” বাঙুরে পরে মৃত্যু হয় ন’ মাসের তওহিদ, পনেরো বছরের এক কিশোর মজিসুর রহমান এবং তেহেরা খাতুন (৫২) নামে এক মহিলার।

দুর্ঘটনার পরে তিলজলা রোডের বস্তি এলাকা ছিল থমথমে। দুপুরে রান্না হয়নি অধিকাংশ বাড়িতেই। এলাকার লোক জানিয়েছেন, শবে-বরাত উপলক্ষে বস্তির এক বাসিন্দা হাফিজ গোলাম মুস্তাফা তাঁর রান্নাঘরে গ্যাস জ্বেলে রান্না করতে যান। গ্যাস যে লিক করছে, তা তিনি বুঝতে পারেননি। আগুন জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গেই বিস্ফোরণ। বাড়িতে তখন ন’মাসের তওহিদ, তার মা পিঙ্কি এবং আরও এক জন উপস্থিত ছিলেন। সকলেই পুড়ে যান। বেশ কয়েক জন তাঁদের বাঁচাতে এসেও অগ্নিদগ্ধ হন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওই ঘরটির লাগোয়া আরও কয়েকটি ঘর রয়েছে। বাড়ির সামনে সরু গলি। তার পরে ছোট ছোট ঘর নিয়ে আরও একটি বাড়ি। এই দুই বাড়ির মাঝের গলিটির লোহার গেট ঘটনার সময়ে বন্ধ ছিল। ফলে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পরেও দুই বাড়ির বাসিন্দাদের অনেকে গেট দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারেননি।

দোকানে আগুন, আতঙ্ক। গ্যাস লিক করে আগুন লেগে পুড়ে গেল একটি খাবারের দোকান। শুক্রবার সন্ধ্যায় ভবানীপুরে জাস্টিস চন্দ্র মাধব রোডের এই ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়ায়। দমকলের চারটি ইঞ্জিন আধ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

gas leak tiljala fire blast
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy