আমার ছেলেবেলা যেখানে কেটেছে, সেটা কলকাতা শহর ছিল না। অনিলকাকু যখন মাকে এসে বলত, “বৌদি, কলকাতা যাচ্ছি। বিশেষ কিছু লাগলে মনে করে বলুন।” তখন আমরা ছোটরা বুঝতে পারতাম যে কলকাতা এক বিশাল ব্যাপার। কাঁচরাপাড়ার বাবুমামা বলেছিল, “কলকাতা এক আজব জায়গা, ওখানে জালা ভর্তি করে বাঘের দুধ কিনতে পাওয়া যায়।” সেই কলকাতা শহর যখন থাবা বসাল আমাদের এই আধা জনপদে তত দিনে আমরা বড় হয়ে গিয়েছি।
সুজিত আমার শৈশবের বন্ধু। কলকাতা ছিল ওর চারণভূমি। ও জানত, কলকাতার কোথায় মোচার চপ বা নলেন গুড়ের রসগোল্লা পাওয়া যায়। হাড়কাটা গলি কোন রাস্তা দিয়ে যেতে হয় বা রাজ কপূরের ‘মেরা নাম জোকার’ কোন সিনেমা হলে চলছে। ওর এই অ-পুঁথিগত বিদ্যা আমাকে মুগ্ধ করে রেখেছিল বহু দিন। অন্য দিকে, সুজিত পরম অবহেলায় ওর বন্ধুত্বের পঙক্তিতে আমাকে একটা ছোট জায়গা করে দিয়েছিল। ওর না-এড়ানো আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা প্রায়ই কলকাতা দর্শনে বেরিয়ে পড়তাম। হাওড়া স্টেশনের গলিতে নীল বইয়ের পাতা হাটকে, হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম ‘নিউ এম্পায়ার’ আর ‘লাইট হাউস’-এর লাল-নীল জগতে। বিজ্ঞাপনের রুপোলি চুলের ঢেউ খেলানো সুন্দরীদের দেহ-লতায় সারা শরীর শিরিশির করত। তার পর ময়দানের আনতশির অজ্ঞাতনামা দুই সৈনিককে পিছনে রেখে যেতাম আকাশবাণী ভবন। সেখান থেকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র তাঁর অলৌকিক কণ্ঠস্বরে শোনাতেন ‘আশ্বিনের শারদ প্রাতে...’। উঁকিঝুঁকি মারতাম, যদি এক বার তাঁকে দেখা যায়। সুজিত বলেছিল, “মুনি-ঋষিদের মতো দেখতে ভদ্রলোককে। গাল ভর্তি লম্বা দাড়ি।”
তার পর মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল গ্যালারি পাক দিয়ে, সময় এসে যেত, ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাওয়ার। হাঁটি-হাঁটি পা করে শহিদ মিনারের বাস গুমটি থেকে বাড়ি ফেরার পালা। পেটে তখন ছুঁচো ডন মারছে। সুজিত বলল, “ঘুগনি খাবি। উত্সাহে ওকে প্রায় জড়িয়ে ধরেছিলাম। পকেট কাচিয়ে দেখা গেল দু’জনের কাছে সাকুল্যে ২০ পয়সা আছে। ১০ পয়সা করে ঘুগনি অথবা টিকিট কেটে বাড়ি যাওয়া— এই দুইয়ের মধ্যে বাছতে গিয়ে মিইয়ে গেল খিদে। এক লহমায় সমস্যার সমাধান করে দিয়ে সুজিত বলল, “আগে তো খেয়েনি। বাস ভাড়া কায়দা করা যাবে।” এ জন্যই ওকে গুরু বলে মানতাম।
ঘুগনির ওমে চোখ বুজে এসেছিল। শালপাতাটা পর্যন্ত প্রায় চিবিয়ে থেয়ে ফেলেছিলাম। সুজিত বলল, “চল আজ মিনিবাসে ফিরব।” মিনিবাস তখন কলকাতায় সদ্য আমদানি। বাবুমামা বলেছিল, “মিনিবাস বড়লোকদের ব্যাপার।” মিনিবাস চাপব, মনে দ্বিধা ছিল। সুজিত সাহসী কদমে হেঁটে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ভাড়া কত?”
বাসের কন্ডাক্টর, যার চুলটা অনেকটা রাজেশ খন্নার ঘরানায় কাটা, কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছিলেন, “পা রাখলেই পঞ্চাশ পয়সা।”
সুজিত বলল, “আর যদি পা না-দিয়ে ঝুলতে থাকি?”
—তাতেও টিকিট পাবে, তবে উপরের দিকে যাওয়ার।
তার পর বাসটা চলতে শুরু করল। আর সুজিত বিদ্যুতবেগে দরজার পাশের হলুদ রঙ করা রড ধরে ঝুলে পড়ল। ওর দেখাদেখি আমিও বাদুড়ের মতো আঁকড়ে ধরলাম রড।
বাসটা আস্তে করে থেমে গেল। বাসের ড্রাইভার কর্কশ গলায় বলে উঠলেন, “পোলাপান দুটাকে তুইলা নে।”
কন্ডাক্টর বললেন, “ভাড়া দেবে না বলছে।”
—যা বলছি শোন।
ড্রাইভারের পাশের আসনে আমরা বসে পড়লাম। চালক ভদ্রলোককে দেখে মনে হল, তিনি এক জন ভাঙাচোরা মানুষ, ছিন্নমূল উদ্বাস্তু হয়তো। এর পর আমাকে অবাক করে দিয়ে মাথায় হাত রেখে তিনি বলেছিলেন, “ব্রেক কষলেই তো দু’জনেই একদম পিছনের চাকার নীচে চলে যেতে, সে বোধ আছে! বাপ-মায়ের কথা ভাব না? তাঁদের দুঃখ বোঝ না?”
শহরের মসৃণ রাস্তায় তখন বাস গতিতে ছুটছে। লালবাতির নিষেধে কিছু ক্ষণের জন্য ক্ষান্ত হল সে দৌড়। মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন তিনি, “আর কখনও এ রকম করবা না। কও দেখি, আর হবে না।”
কথা দিয়েছিলাম। সে দিন চোখের কোণে বাষ্প জমেছিল।
এই শহর, এই কলকাতা পরম মমতায় লালন করেছিল আমাকে। এখনও আমি নতজানু হয়ে থাকি এর সামনে। আজ কলকাতা অনেক বেশি তিলোত্তমা, আলোয় ঝলমল। ত্রিফলা বাতিতে তার সব দিক উদ্ভাসিত। কলকাতার আরও শ্রীবৃদ্ধি হোক, কেবল একটাই আকুতি, পোলাপানদের জন্য শহরটার ভালবাসা যেন সে রকমই থাকে।
জন্ম, বেড়ে ওঠা এই শহরেই। শিবপুর বিই কলেজ থেকে স্নাতক, আইআইটি
খড়্গপুর থেকে স্নাতকোত্তরের পর চাকরি করেছেন ভারতবর্ষের বহু শহরে।
তবে অধিকাংশ সময়টাই কেটেছে কলকাতায়। পরবর্তী কালে, জীবিকার
প্রয়োজনে পাড়ি বিদেশে। সিঙ্গাপুরে কিছু দিন কাটিয়ে বর্তমানে মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া প্রদেশের সেন্টারভিলে শহরে বসবাস। সাহিত্য,
রাজনীতি, বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস পড়াশোনার বিষয় হিসেবে খুবই প্রিয়।