Advertisement
E-Paper

মমতার গুঁতো, নড়ল ন’মাসের জগদ্দল

টানা সাত মাস কেটেছে স্বাস্থ্য ভবনে ধর্না দিয়ে। পরের দু’মাস নবান্নের এ দফতর থেকে ও দফতর ছোটাছুটিতে। শেষমেশ কাজ হল অবশ্য রাতারাতি। মুখ্যমন্ত্রীর এক নির্দেশে টানা ন’মাস স্বাস্থ্য ভবনের টালবাহানায় টেবিলবন্দি পড়ে থাকা চিকিৎসায় গাফিলতির তদন্ত-ফাইল পৌঁছে গেল রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে।

সোমা মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১২ অগস্ট ২০১৫ ০১:৪২

টানা সাত মাস কেটেছে স্বাস্থ্য ভবনে ধর্না দিয়ে। পরের দু’মাস নবান্নের এ দফতর থেকে ও দফতর ছোটাছুটিতে। শেষমেশ কাজ হল অবশ্য রাতারাতি। মুখ্যমন্ত্রীর এক নির্দেশে টানা ন’মাস স্বাস্থ্য ভবনের টালবাহানায় টেবিলবন্দি পড়ে থাকা চিকিৎসায় গাফিলতির তদন্ত-ফাইল পৌঁছে গেল রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে। এবং সব পক্ষ একবাক্যে স্বীকারও করলেন, গাফিলতি প্রমাণিত। ফলে পরবর্তী পদক্ষেপে দেরি হবে না। অথচ ক্ষমতায় আসার পর থেকে খোদ মমতাই বার বার বলে এসেছেন, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যে কোনও অভিযোগে দ্রুত নিষ্পত্তি হবে, শাস্তি পাবেন দোষীরা। যার প্রেক্ষিতে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের এই গাফিলতিতে মেয়ে সুহানা ইয়াসমিনকে হারানো রুহুল আলি মণ্ডলের প্রশ্ন, ‘‘এটাই কি দ্রুততার নমুনা? সব ঘটনা তো মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছয় না। তা হলে সেই ঘটনাগুলোর কি কোনও প্রতিকার হবে না? সুবিচার পাবেন না সন্তান হারানো বাবা-মায়েরা?’’

সমস্ত কিছু শুরু থেকে জানার পরেও যে কাউন্সিল কর্তারা কার্যত চোখ-কান বুজে ছিলেন, তাঁরাও এখন বলছেন, ‘‘সবই তো প্রমাণিত। শুধু ব্যবস্থা নেওয়াটা বাকি।’’ একই বক্তব্য স্বাস্থ্য ভবনের শীর্ষকর্তাদেরও। তাঁরাও বলছেন, ‘‘গাফিলতি নিয়ে তো কোনও সংশয় নেই। ডাক্তাররা যদি এই কাজ করতে পারেন, তা হলে তাঁদের শাস্তিটাও কঠোর হওয়া জরুরি।’’ কিন্তু গাফিলতি যদি প্রমাণিত হয়েই থাকে, তা হলে পদক্ষেপ করার জন্য নবান্ন থেকে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ল কেন? প্রশ্ন তুলেছেন রুহুল। সদুত্তর মেলেনি।

গত ২৫ নভেম্বর উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগরের বাসিন্দা সুহানা স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে রড বোঝাই গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর জখম হয়। প্রথমে বসিরহাট এবং পরে কলকাতার আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে উপযুক্ত চিকিত্‌সা না মেলায় তাকে এসএসকেএমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই রাতে চার ইউনিট রক্ত লাগবে বলে সুহানার পরিবারের লোককে জানিয়েছিলেন এসএসকেএমের ডাক্তাররা। পরদিন, অর্থাত্‌ ২৬ নভেম্বর দুপুরে তা জোগাড়ও করে আনেন বাড়ির লোক। কিন্তু পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় তা সুহানাকে দেওয়ার ‘সময় পাননি’ ডাক্তাররা। রক্তের অভাবে ধুঁকতে ধুঁকতে মারা যায় ওই কিশোরী।

Advertisement

রাজ্যের সেরা সরকারি হাসপাতাল এসএসকেএমে এ ভাবে রোগীমৃত্যুর ঘটনা ঘিরে তোলপাড় শুরু হয়েছিল নানা মহলে। ঘটনার এক দিনের মধ্যেই তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গড়া হয়। সেই কমিটিই চার জন জুনিয়র ডাক্তারকে এই ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করে। ওই চার জনই সেই ২৪ ঘণ্টায় ডিউটিতে ছিলেন। এরই পাশাপাশি ওয়ার্ডে সেই সময়ে কর্তব্যরত দুই নার্সের গাফিলতির কথাও উল্লেখ করা হয়। এসএসকেএম থেকে সেই তদন্ত রিপোর্ট এবং কড়া শাস্তির সুপারিশ স্বাস্থ্য ভবন, রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল এবং স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু তার পরেও গত ন’মাসে ওই চার চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বহাল তবিয়তেই কাজ করে চলেছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।

কেন এত দিনেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হল না? স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এটা ঠিক আমাদের এক্তিয়ারে নেই। তাই আমরা মেডিক্যাল কাউন্সিলের কাছে বিষয়টি পাঠিয়ে দিয়েছি। আশা করি ওরা যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। অভিযোগ তো ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। তাই ব্যবস্থা নিতে দেরি হওয়ার কথা নয়।’’

প্রথমে স্বাস্থ্য ভবন, পরে নবান্নের বিভিন্ন দফতরের দোরে দোরে ঘুরে বেড়িয়েছেন সুহানার বাবা। সুবিচারের আশার আলো দেখেননি কোথাওই। শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ হন রুহুল। সব মিলিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে আটটি চিঠি দেওয়ার পরে নবান্ন থেকে জুলাইয়ের শেষে নির্দেশের চিঠি যায় স্বাস্থ্য ভবনে। তার তিন দিনের মধ্যেই কাউন্সিলে পাঠিয়ে দেওয়া সুহানা-মৃত্যুর তদন্ত ফাইল।

প্রশ্ন উঠেছে, ব্যবস্থা নিতে যখন ‘দেরি হওয়ার যখন কথা নয়’, তখন এত গড়িমসি করে এতগুলো মাস কাটানো হল কেন? সেই প্রশ্নের কোনও সদুত্তর মেলেনি। মেডিক্যাল কাউন্সিলের শীর্ষে আপাতত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ নির্মল মাজি। কী করবে কাউন্সিল? কাউন্সিলের এক কর্তা বলেন, ‘‘স্বাস্থ্য ভবন থেকে আমাদের সদ্য বিষয়টা জানানো হয়েছে। এমনিতে কাউন্সিলে কোনও অভিযোগের নিষ্পত্তি হতে বহু বছর লেগে যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নির্দেশটা এসেছে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে। তাই দ্রুত সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy