সল্টলেকে সমাজকল্যাণ অধিকর্তার দফতরের দোতলায় একটা ঘরে একটা টেলিফোন আর ফ্যাক্স মেশিন রাখা। দু’জন কর্মী সোম থেকে শনি সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা তার সামনে গালে হাত দিয়ে বসে থাকেন। ফোন প্রায় আসেই না। কালেভদ্রে কেউ নম্বর জোগাড় করে কোনও শিশু বা কিশোরের অধিকার হরণের অভিযোগ জানালেও লাভ কিছু হয় না। কারণ, শিশুকে যৌন হেনস্থা, মারধর, স্কুলে ভর্তির জন্য মোটা টাকা দাবি করার মতো সব গুরুতর অভিযোগ পেয়েও ‘হেল্পলাইন’-এর দুই কর্মী সেই অভিযোগ লিপিবদ্ধ করা ছাড়া আর কোনও সাহায্যই করতে পারেন না। মহিলা ও শিশু দফতরের মন্ত্রী শশী পাঁজাও বিষয়টি নিয়ে ওয়াকিবহাল।
শিশু ও কিশোরদের অধিকার রক্ষার কাজে নজরদারি এবং কোথাও সেই অধিকার হরণের চেষ্টা হলে তার মোকাবিলার জন্য গত ফেব্রুয়ারি মাসেই পুনর্গঠিত হয়েছিল ‘রাজ্য শিশু অধিকার রক্ষা কমিশন।’ বাম আমলে এই কমিশনের কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সরকার বদলের পরে নতুন করে সেই কমিশন গঠন করায় অনেকেই আশা করেছিলেন, নির্যাতিত শিশু-কিশোরেরা এ বার অভিযোগ জানানোর এবং সুবিচার পাওয়ার একটা জায়গা পাবে। কিন্তু
তাঁদের নিরাশ করে এই কমিশন ক্ষমতাহীন ঠুেঁটা জগন্নাথই রয়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কমিশনের কর্তা থেকে শুরু করে বিভাগীয় মন্ত্রী সকলে অভিযোগ কার্যত মেনেও নিয়েছেন।
কমিশনের চেয়ারম্যান অশোকেন্দু সেনগুপ্ত-র কথায়, “আমরা ঢাল-তরোয়ালহীন নিধিরাম সর্দার। বেশির ভাগ লোক আমাদের কথা জানেন না। তবু মাঝেমধ্যে হেল্পলাইনে ফোন আসে কোনও শিশু স্কুলের শিক্ষিকার কাছে টিউশন পড়ত না বলে তাকে খারাপ নম্বর দেওয়া হচ্ছে, কিম্বা কারও উপর যৌন হেনস্থা হয়েছে, অথবা স্কুল কর্তৃপক্ষ ভর্তির জন্য বিপুল টাকা চাইছেন, কোথাও পরিবারের মধ্যেই শিশুর উপর মানসিক-শারীরিক নির্যাতন চলছে। পরিকাঠামোর অভাবে কোনও সমস্যার সমাধান করতে পারছি না।”
অশোকেন্দুবাবু আরও জানান, কিছু দিন আগেই কয়েক জন স্কুলশিক্ষিকা ফোন করেছিলেন। শিয়ালদহ-বনগাঁ শাখার একটি ট্রেনে এক অনাথ-ভিক্ষুক কিশোরীকে কিছু লোক হেনস্থা করছে। মেয়েটিকে তাঁরা শিয়ালদহ জিআরপি-তে জমা দেন। কিন্তু সেখানেও মেয়েটি সুরক্ষিত থাকবে কি না, তা নিয়ে ওই শিক্ষিকারা চিন্তায় ছিলেন। তাঁর কথায়, “আমি তখন আমার ব্যক্তিগত যোগাযোগ খাটাই। শেষ পর্যন্ত মেয়েটিকে লিলুয়া হোমে রাখা হয়েছে। কিন্তু কোনও পরিকাঠামো ছাড়া একটা কমিশনের সব কেস তো এ রকম ব্যক্তিগত যোগাযোগের জোরে সমাধান করা সম্ভব নয়।”
নারী ও শিশুকল্যাণ দফতরের অধীনেই এই কমিশন। দফতরের মন্ত্রী শশী পাঁজার কথায়, “অনেক কষ্টে আমরা শিশু অধিকার কমিশন আবার চালু করেছিলাম, কিন্তু এটা সত্যি যে পরিকাঠামো এখনও ঠিকঠাক নেই। ২০টি পদ অনুমোদন পেয়েছে, কিন্তু লোক নিয়োগ হয়নি। উল্টোডাঙায় অফিস হওয়ার কথা, সেখানেও এখনও কাজ শেষ হয়নি। হেল্পলাইনও কাজ করতে পারছে না। আশা করছি ভোটের পরে সব সমাধান হবে।”
কমিশনের কর্তারা অবশ্য বলছেন, কাজটা অত সহজ নয়। তাঁরা জানিয়েছেন, কোনও রাজ্যে যতক্ষণ না ‘শিশু অধিকার রক্ষা কমিশন’ গঠিত হচ্ছে, ততদিন এই সংক্রান্ত কেসগুলি দেখার কথা ‘রাইট টু এডুকেশন প্রোটেকশন অথরিটি’ বা ‘রেপা’-র। যে মুহূর্তে কমিশন গঠিত হয়ে যাবে, তখন থেকেই ‘রেপা’-কে অকেজো ধরা হবে এবং রেপা-র সব কেস তখন ওই কমিশনে চলে আসবে। তাঁদের ক্ষোভ, “রেপার কর্তারাও এখন তাঁদের সব কেস আমাদের কাছে পাঠাতে চাইছেন। কেসের সংখ্যা প্রায় ৫০০ হবে। আমরা বলে দিয়েছি, আমাদের কাগজ রাখার একটা আলমারি-ই নেই তো এত কেস সামলাব কী ভাবে?
শিশু-কিশোরদের নির্যাতন, হেনস্থার মতো এত স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রশাসনের এতটা নির্লিপ্ত থাকাটা বোধহয় উচিত নয়।”