Advertisement
E-Paper

কফিনে ঘরের ছেলে, কান্নায় ভেঙে পড়ল গ্রাম

মহকুমাশাসকের বাংলোর গা ঘেঁষে ছাড়িগঙ্গার পাড় ধরে এগিয়ে গিয়েছে সরু রাস্তা। কয়েক পা এগোলেই ঝুড়ি মেলা বটগাছের নীচে রঙচটা দোতলা বাড়ি। হাটকালনা পঞ্চায়েতের পুরাতনহাটের এই রাস্তায় ভিড়ভাট্টা তেমন দেখা যায় না। বৃহস্পতিবার অবশ্য তিল ধারণের জায়গা ছিল না রাস্তায়। সকাল থেকে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে নিহত জওয়ান, পাড়ার চেনা ছেলেটাকে শেষ বারের মতো দেখতে ভিড় করেছিলেন পড়শিরা।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০১৬ ০২:৩৯
মৃত্যুঞ্জয়বাবুকে শেষ শ্রদ্ধা। নিজস্ব চিত্র।

মৃত্যুঞ্জয়বাবুকে শেষ শ্রদ্ধা। নিজস্ব চিত্র।

মহকুমাশাসকের বাংলোর গা ঘেঁষে ছাড়িগঙ্গার পাড় ধরে এগিয়ে গিয়েছে সরু রাস্তা। কয়েক পা এগোলেই ঝুড়ি মেলা বটগাছের নীচে রঙচটা দোতলা বাড়ি। হাটকালনা পঞ্চায়েতের পুরাতনহাটের এই রাস্তায় ভিড়ভাট্টা তেমন দেখা যায় না। বৃহস্পতিবার অবশ্য তিল ধারণের জায়গা ছিল না রাস্তায়। সকাল থেকে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে নিহত জওয়ান, পাড়ার চেনা ছেলেটাকে শেষ বারের মতো দেখতে ভিড় করেছিলেন পড়শিরা।

বুধবার ছত্রিশগড়ের দান্তেওয়াড়া জেলায় জঙ্গলের রাস্তা ধরে যাওয়ার পথে মাওবাদীদের পেতে রাখা ল্যান্ডমাইন ফেটে মারা যান সিআরপিএফের ২৩০ ব্যাটেলিয়ানের সাত জওয়ান। তাঁদেরই এক জন কালনার বছর বত্রিশের মৃত্যুঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। এ দিন বিকেল পাঁচটা নাগাদ পানাগড় হয়ে তাঁর কফিনবন্দি দেহ বাড়িতে আসে। বাড়ির কাছেই ফাঁকা একফালি জায়গায় ‘গান স্যালুট’ দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয় তাঁকে। চোখের জলে ঘরের ছেলেকে বিদায় জানান এলাকাবাসী।

আত্মীয়েরা জানান, জেঠু রমাপতি মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পরে ৩৫ দিনের ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলেন মৃত্যুঞ্জয়বাবু। সেই শেষ আসা। ছুটি কাটিয়ে সপ্তাহ দুয়েক আগেই কাজে যোগ দেন তিনি। ওই এক মাস বন্ধুদের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা দিয়ে, বছর খানেকের ছেলে অংশুমানকে নিয়ে সময় কাটিয়েছিলেন তিনি। এ দিন সে কথা বলতে বলতেই নিজেকে সামলাতে পারলেন না ঝুমাদেবী। জানালেন বুধবার দুপুর দে়ড়টা নাগাদ শেষ বার মৃত্যুঞ্জয়বাবুর সঙ্গে কথা হয় তাঁর। কিছুক্ষণ কথা বলেই স্ত্রীকে তিনি জানান, গাড়িতে রয়েছেন। নেমে ফোন করবেন। সন্ধ্যায় আবারও ফোন আসে। অচেনা কন্ঠ নাম, ঠিকানা, বাবার নাম নিশ্চিত করার পরে জানিয়ে দেয় ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে মৃত্যু হয়েছে মৃত্যুঞ্জয়বাবুর।

Advertisement

সকাল থেকে মুখোপাধ্যায় বাড়িতে কান্নার রোল ওঠে। শোকস্তব্ধ পড়শিরাও জড়ো হন। মৃত্যুঞ্জয়বাবুর এক দাদা সুরজিৎ মুখোপাধ্যায়ের বলেন, ‘‘পরিবারের কেউই ভাইয়ের চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছে না। পাড়াতেও ছোটদের কাছেই বেশি জনপ্রিয় ছিল ভাই।’’ প্রতিবেশীরাও জানিয়েছেন, ছোট থেকেই ক্রিকেট, ফুটবলের ভক্ত ছিল মৃত্যুঞ্জয়। এক সময় শহরের বিভিন্ন ক্রিকেট টুর্নামেন্টেও তাঁকে চুটিয়ে খেলতে দেখা যেত। বল হাতে উইকেট নেওয়াতেও সুনাম ছিল তাঁর। এখনও ছুটি পেয়ে বাড়ি এলেই এলাকার ছোটদের সঙ্গে চুটিয়ে ক্রিকেট খেলতেন তিনি। মৃত্যুঞ্জয়বাবুর বন্ধুরাও জানান, ছোট থেকেই সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছে ছিল তাঁর। সেই মতো নিজেকে তৈরিও করেছিলেন। ২৬ বছর বয়সে তিনি প্রথমে চেন্নাই, পরে জম্মু এবং ত্রিপুরা হয়ে ছত্তিশগড়ে সিআরপিএফের ২৩০ ব্যাটেলিয়ানে যোগ দেন।

খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে। ভিড় জমাতে শুরু করেন আশেপাশের গজলক্ষ্মীতলা, কোম্পানিডাঙা, নিভুজিবাজার, কৃষ্ণদেবপুর, মালতীপুর, ধাত্রীগ্রাম-সহ বহু এলাকার বাসিন্দারা। বাড়ির বাইরে একটি ফাঁকা জমিতে গোলাপ, গাঁদার পাপড়ি দিয়ে কফিন রাখার জায়গা করা হয়। সেখানেই তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান প্রশাসনের আধিকারিকেরা এবং সাধারণ মানুষ। নিহত জওয়ানের বাড়ি ঘুরে যান জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপার। পিছিয়ে ছিলেন না নেতারাও। সকালে ওই জওয়ানের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে দেখা করেন কালনা বিধানসভার সিপিএম প্রার্থী সুকুল শিকদার। দুপুর থেকে দেহ না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন তৃণমূলের কালনা বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী বিশ্বজিৎ কুণ্ডু এবং পূর্বস্থলী দক্ষিণ কেন্দ্রের স্বপন দেবনাথ। পুরাতনহাটেরই বাসিন্দা সমরেশ অগ্রবাল বলেন, ‘‘ছেলেটার কথা বারবার মনে পড়ছে। ২০০৭ সালে এলাকার একটি দুর্গাপুজার অনুষ্ঠানে দেখা হওয়ায় বলেছিল ‘দুশমন’কে কোনওদিন প্রশ্রয় দিতে নেই। মাথা কখনও ঝোঁকাতে নেই। সেই ছেলেটাই অকালে চলে গেল।’’

বছর দুয়েকের ছেলে অংশু অবশ্য এত কিছু বুঝচে পারছে না। বাড়িতে এত লোকজন দেখে কিছুটা বিহ্বল সে। মায়ের পাশে মোবাইল হাতে ধরে ঠায় বসে সে। আর ঝুমাদেবী কাঁদতে কাঁদতে বলে চলেছেন, ওই ফোনেই ওর বাবাকে হারানোর খবর এসেছিল।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy