বিধানসভা ভোটে জমানা বদলের পরে ফলতার পুনর্নির্বাচনে প্রাথমিক ইঙ্গিত মিলেছিল। কলকাতা ও দিল্লিতে গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ রাজ্যে তাদের জমি ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে আরও রসদ জোগাবে বলে কোমর বাঁধছে বাম ও কংগ্রেস শিবির।
রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের পুনর্নির্বাচনে চতুর্থ স্থানে নেমে গিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস! ওই কেন্দ্রে সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশ গিয়েছিল সিপিএমের দিকে, কিছুটা কংগ্রেসে। বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের নির্বাচিত ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে অন্তত ৬০ জন এর পরে বিদ্রোহী হয়ে রাজ্যে প্রধান বিরোধী দলের স্বীকৃতি আদায় করেছেন, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করার অবস্থান ঘোষণা করেছেন। আবার তৃণমূলের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জন বিদ্রোহ করে দিল্লিতে পৃথক ব্লক তৈরি করে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ-কে সমর্থন করতে চেয়ে লোকসভার স্পিকারকে চিঠি দিয়েছেন। বিজেপির শিবিরে যেতে চাওয়া বিদ্রোহীদের তালিকায় সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত জেলা মুর্শিদাবাদের দুই তৃণমূল সাংসদ আছেন। জেলার আর এক সাংসদেরও সেই তালিকায় নাম লেখানো সময়ের অপেক্ষা বলে সূত্রের খবর। বিজেপির বিরুদ্ধে বাম বা কংগ্রেস নয়, তৃণমূলই মূল শক্তি— গত লোকসভা ভোটে এই প্রচারের পাশাপাশি তৎকালীন শাসক দল পাল্টা মেরুকরণও তীব্রতর করার সব রকম কৌশল নিয়েছিল। সেই ভোটে জয়ী তিন সংখ্যালঘু সাংসদই এখন মত বদল করতে চাওয়ায় রাজনৈতিক সমীকরণেও নতুন মোড় আসবে বলে মনে করছেন সিপিএম ও কংগ্রেস নেতৃত্ব।
প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ও বহরমপুরের প্রাক্তন সাংসদ অধীর চৌধুরী মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সাম্প্রতিক অতীতে ভোট কাছাকছি এলেই তাঁকে ‘বিজেপির এজেন্ট’ বলে দাগিয়ে দিয়ে প্রচার করতেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিযেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বহরমপুর লোকসভা ভোটে ইউসুফ পাঠানকে এনে প্রচার করা হয়েছিল, ইমামের ছেলে প্রাক্তন ক্রিকেটার, ‘সাচ্চা মুসলিম’, তাঁকেই ভোট দিতে হবে। বিজেপির বিপরীতে তীব্র মেরুকরণে মুসলিম ভোট এককাট্টা হয়ে পাঠান জয়ী হয়েছিলেন। দিল্লিতে মমতা যখন কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধীর দ্বারস্থ, সেই সময়ে অধীরের কথায়, ‘‘এখন যা হচ্ছে, তাকে বলে ‘পোয়েটিক জাস্টিস’! গোটা তৃণমূল দলটা বিজেপির কাছে আত্মসমর্পণ করছে। আর আমাদের জেলায় যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, সেই সব ঘসেটি বেগম ও মির জ়াফরকে দেখতে পাচ্ছেন মুর্শিদাবাদের মানুষ!’’ এই পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু-সহ মানুষের বিশ্বাস অর্জন ও তৃণমূলের জায়গা নেওয়ার জন্য বাম-কংগ্রেসের সমঝোতা করে নতুন উদ্যমে ঝাঁপানোর পক্ষেই সওয়াল করছেন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য।
লোকসভা নির্বাচনে বহরমপুরে অধীরের বিরুদ্ধে যেমন তৃণমূলের এক রকম প্রচার ছিল, পাশের মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রে বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী মহম্মদ সেলিমের বিরুদ্ধে আর এক রকম প্রচারপত্র ছড়ানো হয়েছিল। বসিরহাটে দলীয় কর্মসূচির ফাঁকে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সেলিম বলছেন, ‘‘বিধানসভা ভোটের পরেই বলেছিলাম, তৃণমূল দলটা বরফের মতো দ্রুত গলে যাবে! রাজনৈতিক আদর্শ বলে কিছু নেই, সিপিএম-বিরোধিতার জন্য একটা দলের জন্ম হয়েছিল। ক্ষমতায় আসার পরে শুধু অনাচার আর দুর্নীতি। ওযুধের মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরে যেমন জাল-বাজারে তারিখ বাড়িয়ে দেওয়া হয়, সে ভাবেই মেয়াদ উত্তীর্ণ তৃণমূলকে টিকিয়ে রাখতে বিজেপি তারিখ সম্প্রসারণ করাচ্ছে!’’ তৃণমূল সরে যাওয়ার পরে প্রান্তিক মানুষের পাশে থেকে ও রুটি-রুজি, অধিকার রক্ষায় বামপন্থীদের লডাইয়ের ঝাঁঝ বাড়ানোর কথা বলছেন সেলিম।
তৃণমূল শিবিরও বুঝতে পারছে, মুর্শিদাবাদের মতো সংখ্যালঘু-প্রধান জেলায় লড়াই তাদের আরও কঠিন হবে। জঙ্গিপুরের সাংসদ খলিলুর রহমান ঘনিষ্ঠ শিবিরে ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরের বার তিনি আর প্রার্থী হবেন না। তৃণমূলেই রয়েছেন জানিয়েও তাঁর মত, মমতাকে সকলেই নেত্রী মানেন। কিন্তু যোগ্য সম্মান পাচ্ছেন না দলের বিধায়ক, সাংসদেরা। সমস্যা নিয়ে গেলে নেত্রীর কাছে পৌছনো যায় না। অনেক কথা জমে আছে সকলের মনে। কিন্তু শোনার কেউ নেই। দলের মধ্যে দম্ভ, ঔদ্ধত্য অনেককেই আঘাত করেছে, পদে পদে অপমানিত হতে হয়েছে। তাই এই পরিস্থিতি।
আর এই পরিস্থিতির ফায়দা তুলতে আইএসএফ চেয়ারম্যান নওসাদ সিদ্দিকীর প্রস্তাব, মুর্শিদাবাদের রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে সিপিএম তাঁদের সমর্থন দিক। আর নন্দীগ্রাম বিধানসভা ও বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রে আইএসএফের সমর্থনে সিপিএম লড়ুক।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)