E-Paper

শিথিল নিয়মের সুযোগে মদের দোকান যত্রতত্র

মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় মদ বিক্রি বন্ধে বিক্ষোভ দেখান মহিলারা। সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় সড়ক বা রাজ্য সড়কের ৫০০ মিটারের মধ্যে মদের দোকান খোলায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। পরে, তা ২২০ মিটার করা হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:৫৬

—প্রতীকী চিত্র।

জাতীয় সড়কের ধারে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে গোটা কুড়ি মদের ঠেক। সেখানে ঠাঁই নিয়েছে দুই অপরাধী। পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলে ২০১৮ সালে এই খবর পেয়ে পুলিশ অভিযানে গেলে, খণ্ডযুদ্ধ বাধে। দুষ্কৃতীদের গুলিতে মৃত্যু হয়এক পুলিশকর্মীর।

বর্ধমান শহরে জি টি রোডের ধারে একটি হোটেলে বিক্রি হচ্ছিল দেশি মদ। ২০২২ সালে সেখানে মদ খেয়ে ন’জনের মৃত্যু হয়। জনবহুল এলাকায় কী ভাবে মদ বিক্রি চলছিল, প্রশ্ন ওঠে।

মদের দোকান ঘিরে এমন ঘটনা কম নয়। মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় মদ বিক্রি বন্ধে বিক্ষোভ দেখান মহিলারা। সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় সড়ক বা রাজ্য সড়কের ৫০০ মিটারের মধ্যে মদের দোকান খোলায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। পরে, তা ২২০ মিটার করা হয়। কুড়ি হাজার বা তার কম জনসংখ্যার এলাকায় এই নিয়ম প্রযোজ্য। স্কুল, হাসপাতাল বা ধর্মস্থানের এক হাজার ফুটের মধ্যে মদের দোকানের লাইসেন্স না দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ, বহু জায়গাতেই তা মানা হয় না। আবগারি দফতর সূত্রের দাবি, নিয়মের মধ্যে ফাঁকও রয়েছে। রাজ্যের ১৮টি উন্নয়ন সংস্থা, পুরসভা বা পর্যটন কেন্দ্রে এই বিধি কার্যকর নয়। তা ছাড়া, ব্লক অফিস থেকে পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ বা পঞ্চায়েত অফিসের তিন কিলোমিটার ব্যাসার্ধেও ছাড় রয়েছে। প্রশাসনের দাবি, নিয়মে শিথিলতার সুযোগেই বেড়েছে মদের দোকান। তবে তার পরেও, নিয়ম ভাঙার বহু ছবি ধরা পড়ে।

মুর্শিদাবাদের সুতির সপ্তগ্রাম হাই স্কুলের অদূরেই মদের দোকান চলা নিয়ে ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা। সুতির ধলার মোড়ে স্কুল থেকে আধ কিলোমিটারের মধ্যে মদের দোকানের সামনে ভিড় লেগেই থাকে। গোলমালও বাধে। গত অক্টোবরে পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুরের বারবেটিয়ায় পুলিশ ফাঁড়ির অদূরে চোলাইয়ের ঠেক চলার অভিযোগে সরব হন মহিলারা। স্থানীয় বাসিন্দা শম্পা খিলাড়ির কথায়, “সামনেই প্রাথমিক স্কুল। তাই পাড়ার মধ্যে মদের দোকান আমরা ভেঙে দিয়েছি।’’ বছর দেড়েক আগে সে জেলারই সবংয়ে স্কুলের কিছুটা দূরে মদের দোকানের লাইসেন্স দেওয়া নিয়ে গোলমাল বাধে। এলাকাবাসীর একাংশের অভিযোগ, সেটির সঙ্গে এক তৃণমূল নেতা যুক্ত থাকায়, প্রতিবাদ সত্ত্বেও লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। জেলা আবগারি দফতরের ডেপুটি কালেক্টর প্রদীপ ঘোষের যদিও দাবি, ‘‘সবংয়ের দোকানটি থেকে স্কুল হাজার ফুট দূরে।’’

আলিপুরদুয়ারে কালচিনির চুয়াপাড়ায় সম্প্রতি মদ বিক্রি বন্ধের দাবিতে ডুয়ার্সকন্যার সামনে বিক্ষোভ দেখায় ‘অল বেঙ্গল আদিবাসী স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’। কোচবিহারের পুন্ডিবাড়িতে উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় লাগোয়া ধাবায় মদ বিক্রি নিয়ে নিত্য অশান্তি বাধে। মালদহের ইংরেজবাজারের এক স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মানসী দত্তের অভিযোগ, ‘‘যত্রতত্র মদের দোকান খুলছে। তা পেরিয়ে স্কুলে যাতায়াতে মেয়েরা ভয় পায়।’’ বীরভূমের মুরারইয়ের কনকপুরে শিশু শিক্ষাকেন্দ্র ও ধর্মস্থানের মাঝে মদের দোকান চালুর বিরুদ্ধে গ্রামবাসী প্রতিবাদে নামায়, শেষ পর্যন্ত সেটির লাইসেন্স দেওয়া হয়নি।

বর্ধমানের তেলিপুকুর থেকে শক্তিগড় পর্যন্ত দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের ১২ কিলোমিটার অংশে গোটা চল্লিশ ধাবার অধিকাংশে বেআইনি ভাবে মদ বিক্রি হয় বলে অভিযোগ। জলপাইগুড়ি থেকে শিলিগুড়ির পথে জাতীয় সড়কের ধারে সার দিয়ে মদের দোকান রয়েছে। নদিয়ার কল্যাণীতে গত বছর পর পর ছিনতাইয়ের তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, বাইরে থেকে আসা কিছু দুষ্কৃতী সড়কের পাশে পানশালাগুলিতে ঘাঁটি গেড়েছে।

সূত্রের দাবি, পুলিশ ও আবগারি দফতরের কর্মীদের একাংশকে ‘প্রণামী’ দিয়েই বেআইনি মদ বিক্রি চলে। কোথাও মাসে পাঁচ হাজার, কোথাও ১২ হাজার টাকা দিতে হয় বলে দাবি মদ বিক্রেতাদের একাংশের। সম্প্রতি পূর্ব বর্ধমানের মাধবডিহিতে তোলা চাওয়ার অভিযোগে আবগারি দফতরের চার কনস্টেবলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আসানসোলের এক মদ ব্যবসায়ীর কথায়, ‘‘নেতাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দাবি মতো সাহায্য করতে হয়।’’ পুলিশ কর্তাদের দাবি, চোলাই ও নকল মদ বিক্রি বন্ধে অভিযান চলে। রাজ্য আবগারি দফতরের এক কর্তার কথায়, ‘‘দোকানের লাইসেন্স দেওয়ার চাপ থাকে রাজস্বের তাগিদে।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Liquor Shop Liquor

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy