Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৫ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

নিশিলিগুড়ি

চিঠি আসে হাল্কা আলোয়, গজলের সুরে

কিশোর সাহা
শিলিগুড়ি ১০ জানুয়ারি ২০১৬ ০২:০৬
গজল-সন্ধ্যায় মেতেছেন শহরের বাসিন্দারা। বিশ্বরূপ বসাকের তোলা ছবি।

গজল-সন্ধ্যায় মেতেছেন শহরের বাসিন্দারা। বিশ্বরূপ বসাকের তোলা ছবি।

চিঠ্ঠি আয়ি হ্যায়... চিরকুটে লিখে এগিয়ে দেওয়া হল গায়কের দিকে। গজল গায়ক। যখন গান ধরেছেন, সন্ধ্যা ছাড়িয়ে রাত তখন গড়াচ্ছে যৌবনের দিকে। নেশার হাল্কা আলোয় এখানে কিন্তু কোনও উদ্দাম নাচ-গানের আসর নয়। শুধুই গজল।

সিঙ্গিং-বার বা ডান্স-বারের বাইরে এমন অভিজাত গানের আসরও শিলিগুড়িতে এখন নেহাত কম নয়। উদ্দাম হট্টগোল এড়িয়ে নবদম্পতি বা সপরিবার অনেকে ‘লাইভ মিউজিক’ শুনতে চলে আসেন এমনই আসরে। কেউ বেছে নেন উত্তরায়ণে কোনও ক্লাবের নিরিবিলি পরিবেশ। কেউ বা চলে যান সুকনার রাস্তায় আর এক ক্লাবে।

তবে ওই ধরনের ক্লাবে যাওয়ার কিছু পূর্ব শর্ত থাকেই। হয় সদস্য হতে হবে, না হলে কারও অতিথি হয়ে যেতে হবে। ফলে, সেখানে ভিড় থাকলেও তা একেবারেই সুশৃঙ্খল। শিলিগুড়ি শহরের প্রথম সারির চিকিৎসক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কিংবা নানা দলের প্রদেশ পর্যায়ের নেতাদের অনেকে এখন সেই ক্লাবেই যেন বেশি স্বচ্ছন্দ। শহরের একাধিক রাজনৈতিক দলের জেলা স্তরের অনেক নেতা একান্তে জানিয়েছেন, হই-হট্টগোল থেকে দূরে থাকা ওই ক্লাবের মতো পরিবেশ অন্যরকম।

Advertisement

আবার ট্যুর অপারেটররা অনেকেই জানাচ্ছেন, শিলিগুড়ির সেবক রোডের একটি সিঙ্গিং বার-এ একযোগে ‘থ্রি-টিয়ার’ বন্দোবস্ত করা হয়েছে বলে সেখানেও সন্ধ্যা কাটাতে আগ্রহী হচ্ছেন পর্যটকেরা। সেখানেই একযোগে দুটি ‘ফ্লোর’-এ রয়েছে ‘সিঙ্গিং-বার’। দোতলায় রয়েছে শুধুই ‘গজল’-এর আয়োজন। এখানে পানশালার নাচগানের সঙ্গে উদ্দাম উল্লাস নেই। প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত গজলের সুরে ডুবে থাকার হাতছানিতে ভিড় উপচে পড়ে সেখানেও।

নানা মজাদার ঘটনা ঘটে সেখানেও। কখনও এক প্রশাসনিক অফিসার নেশায় চূর হয়ে একই গজল দশ বার গাইয়েছেন। আবার কখনও কেউ পরপর পছন্দসই গজল শোনার পরে গায়কের হাতে গ্লাস তুলে দিয়ে খাওয়ার জন্য জোরাজুরি করেছেন। আবার নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে গান শুনতে শুনতে কেউ কেঁদে ফেলেছেন, এমন দৃশ্যও দেখতে অভ্যস্ত পানশালার কর্মীরা।

গজল গায়ক আশিস কংসবণিক বলছিলেন, ‘‘চিঠ্ঠি আয়ি হ্যায় শুনে এক জন এগিয়ে এসে তারিফ করলেন। তার পর বললেন আবার গাইতে। শেষ হলে, আবার। তখন ভদ্রলোককে বুঝিয়ে বললাম, অনেকেই অন্য গান শুনতে চাইছেন।’’ সেই ভদ্রলোক কিন্তু গায়ককে ছাড়েননি। পুরো অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত বসে ছিলেন। তার পর কাকুতি মিনতি করে আরও পাঁচ বার শুনলেন একই গান!

গানবাজনা করতে গিয়ে বিপদেও পড়তে হয়েছে অনেককে। তবলাবাদক পান্তুকুমার সাহা শোনালেন এমনই ঘটনা— ‘‘বেশ কয়েক বছর আগে শিলিগুড়ি ঘেঁষা এক পানশালায় গানের সঙ্গে বাজাচ্ছিলাম। হঠাৎই হাজির পুলিশ। গাড়িতে তুলে নিয়ে গেল থানায়। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে আমার। শুনলাম, পানশালার নাকি অনুমতিই নেই। শেষে খবর পেয়ে শিলিগুড়ির অধিকাংশ শিল্পী থানায় চলে এলেন। তাঁদের অনুরোধে আমাকে ছেড়ে দিল পুলিশ।’’

নাটকের অবশ্য বাকি ছিল তখনও। পান্তুবাবুর কথায়, ‘‘পরদিন ছটপুজোর অনুষ্ঠানের মঞ্চে তবলা বাজাচ্ছি। দেখলাম পুলিশকর্তারাও হাজির। অনুষ্ঠান শেষে এক পুলিশ কর্তা এগিয়ে এসে আমাকে বললেন, ‘এত সুন্দর হাত আপনার। একদিন শুধু আপনার বাজনাই শুনব।’ তাঁকে কিন্তু আগের রাতের অভিজ্ঞতার কথা বলে অনুযোগ জানাতে পারিনি।’’

শিলিগুড়ির ট্যুর অপারেটরদের সংস্থার এক কর্তা সম্রাট সান্যাল বলেন, ‘‘নাইট লাইফ মানেই উদ্দামতা— এমনটা ভাবা ঠিক নয়। দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা শিলিগুড়িতে যাতায়াতের পথে থাকার সময়ে নিরিবিলিতে বিনোদনের ব্যবস্থা কী রয়েছে তা জানতে চান। অনেক সময়ে আমরা ক্লাবগুলিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। আবার অনেক সময়ে গজলের আসরে পাঠাই। কিন্তু, ভিনদেশিদের ক্ষেত্রে ভাষার সমস্যা বেশি হয়। হালে কয়েকটি জায়গায় অবশ্য ইংরেজি গানটানও হচ্ছে।’’ সম্রাটবাবুর সংযোজন, ‘‘শিলিগুড়ি অনেক বদলেছে। তা বলে নাইট লাইফ বলতে যা বোঝায়, তা এখানে খুঁজলে মিলবে কি না, সন্দেহ। রাত ১২টায় শিলিগুড়ি পুরোপুরি ঘুমিয়ে পড়ে।’’

এটা ঠিকই যে, রাতভর শিলিগুড়িতে প্রায় কোথাও দোকানপাট খোলা থাকে না। ওষুধের দোকান খুঁজতেও নার্সিংহোম, হাসপাতালে চক্কর দিতে হয়। জংশনের চা দোকানও ইদানীং ১১টার পরেই বন্ধ হয়ে যায়। এনজেপিতে চা দোকান খোলা থাকে মোটে দু’একটা। জেগে থাকে শুধু পুলিশ।

তবে রাত ১২টা পর্যন্ত জেগে থাকার অভ্যাসও নেই কলকাতা বাদে পশ্চিমবঙ্গের অন্য শহরগুলির। সে কথার উল্লেখ করে অনেকেই বলছেন, আগের তুলনায় শিলিগুড়ির সান্ধ্য জীবন আমূল বদলে গিয়েছে। যেমন, একটা সময় ছিল যখন দার্জিলিঙের মতো রাত ৮টায় সুনসান হয়ে যেত শিলিগুড়ির পথঘাট। দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা দার্জিলিঙে যাতায়াতের পথে এক রাত কিংবা কিছু ক্ষণের জন্য জিরিয়ে নেওয়ার জায়গা খুঁজে পেতেন না। কেউ ‘বিয়ার পাব’ খুঁজতেন। কেউ চাইতেন ‘লাউঞ্জ বার’। তখন তো ‘ডিস্কো’র কথা ভাবাও যেত না। আশির দশক থেকে ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে শিলিগুড়ির সান্ধ্য-জীবন। চাঁদমণি চা বাগান উপড়ে উপনগরী হওয়ার পরে সেই বদলে যাওয়ার পালে লাগে পশ্চিমী বাতাস। একাধিক ক্লাব গড়ে ওঠে শিলিগুড়ি ও লাগোয়া এলাকায়। পানশালার সংখ্যাও লাফিয়ে বাড়তে থাকে।

এই মুহূর্তে শিলিগুড়ির উত্তরায়ণ উপনগরীর একটি ক্লাবে উত্তরোত্তর সদস্য-সদস্যা সংখ্যা বাড়ছে। চা বাগানের সৌন্দর্য না-থাকুক, সেখানে ‘সুইমিং পুল’-এর ধারে বসে একা কিংবা বন্ধুদের নিয়ে সন্ধ্যা কাটান, এমন নাগরিকের সংখ্যা খুব কম নয়। সুকনার দিকে রয়েছে আরও একটি ক্লাব। সর্বত্রই আছে গানবাজনার বন্দোবস্ত। তবে বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়া ওই ক্লাবগুলিতে ‘লাইভ’ গানবাজনা হয় না। উপরন্তু, সদস্য কিংবা তাঁদের ‘গেস্ট’ ছাড়া ওই ক্লাবগুলিতে প্রবেশ নিষেধ। যদিও ওই এলাকায় সেখানেই একটি শপিং মল চত্বরে ডিস্কোর আসর বসছে। সেখানে একটি লাউঞ্জ বারে রয়েছে পছন্দসই গান শোনার ব্যবস্থা।

কিন্তু, আধুনিক হলেও ‘নাইট ক্লাব-কালচার’-এর দুনিয়ায় শিলিগুড়িকে এখনও নাবালক হিসেবেই ধরে থাকেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, এখনও শহরের ‘সিঙ্গিং-বার’ নিয়ে চলে কানাঘুষো। সেখানে কেউ গেলে তা নিয়ে বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া হয় নানা সন্দেহ। পানশালা সূত্রে অবশ্য জানা যাচ্ছে, সিঙ্গিং-বারে গিয়ে সম্পন্ন ব্যবসায়ী বিপুল ধারদেনায় জড়িয়ে পড়েছেন— এমন একাধিক ঘটনা রয়েছে। এমনকী, গোছা গোছা টাকা ওড়াতে গিয়ে অফিসের তহবিল তছরূপে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও কম নয়।

এক পুলিশকর্তার কথায়, ‘‘শিলিগুড়ি এখনও ততটা সাবালক হয়নি। ফলে, এ সব সিঙ্গিং-বারে বাড়তি নজর রাখতেই হয়। কারণ, প্রতি পদে গোলমালের আশঙ্কা থেকেই যায়। অনেক সময়ে থানায় অভিযোগ হয়, কারও স্বামী সিঙ্গিং বারে গিয়ে সব টাকা উড়িয়ে দিচ্ছে। আবার কেউ গাড়ি-গয়না বিক্রি করে দিচ্ছেন বলেও স্ত্রী অভিযোগ জানিয়েছেন। সে জন্য নিয়মিত সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে খতিয়ে দেখা হয়। তাতেও কী আর সব সময় অনভিপ্রেত ঝামেলা আটকানো যায়!’’ (শেষ)

(সহ প্রতিবেদন: অনির্বাণ রায়)

আরও পড়ুন

Advertisement