Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৮ নভেম্বর ২০২১ ই-পেপার

সুন্দরবনে শিহরণ

শুভাসিশ ঘটক ও নির্মল বসু
সন্দেশখালি ২৮ নভেম্বর ২০১৫ ০১:৩৬
এ বার ফেরার পালা। কপ্টার ধরতে এগোলেন মুখ্যমন্ত্রী।

এ বার ফেরার পালা। কপ্টার ধরতে এগোলেন মুখ্যমন্ত্রী।

সুন্দরবনকে জেলা হিসাবে গড়ে তোলার কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। যা দুই ২৪ পরগনার নদীনালা, জঙ্গলে ঘেরা প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের মধ্যে নতুন আশা জাগিয়েছে।

গত চার বছরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক সরকারি অনু্ষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী সুন্দরবন উন্নয়নে পর্যটন শিল্পের বিস্তারে নানা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। নানা প্রকল্পের নামকরণ করেছেন। তখন থেকেই সুন্দরবনবাসীর অনেকের বিশ্বাস, তাঁদের জন্য আরও বড় কোনও পরিকল্পনা আছে রাজ্য সরকারের। শুক্রবার ন্যাজাটের সভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষণা তাতেই শিলমোহর লাগিয়েছে।

বাম জমানায় ‘সুন্দরবন উন্নয়ন বোর্ড’ গঠন করা হয়েছিল। সুন্দরবনের পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে মূল দিশা স্থির করত এই বোর্ড। সুন্দরবনের পরিমণ্ডল অনু্যায়ী উত্তর ২৪ পরগনার ৬টি ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার ১৩টি ব্লক নিয়েই সুন্দরবন এলাকা। মোট ১০২টি দ্বীপ রয়েছে। যেখানে ৫৪টি দ্বীপে বসতি রয়েছে। সব মিলিয়ে সুন্দরবনে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষের বসবাস। বাকি ৪৮টি দ্বীপ বনাঞ্চল। বছরখানেক আগে সাগর এলাকার দু’টি বসতি দ্বীপ লুপ্ত হয়ে গিয়েছে।

Advertisement

দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন এলাকায় সদর কার্যালয় কলকাতার আলিপুরে। সে ক্ষেত্রে বেশ কয়েক কিলোমিটার উজিয়ে সুন্দরবনবাসীকে আলিপুরে নানা প্রশাসনিক কাজে আসতে হয়। যে কারণে, বাম জমানায় আলিপুর থেকে বারুইপুরে দক্ষিণ ২৪ পরগনা সদর দফতরে স্থানান্তরিত করা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সদর দফতরের তৈরি করার জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, চার বছরে বারুইপুরে একটি জেলা পরিষদের ভবন ও একটি জেলা প্রশাসনের ভবন তৈরি করা হয়েছে। জেলা সদরের জন্য অধিকৃত জমিতে সরকারি আবাসন প্রকল্প করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।


সবিস্তার দেখতে ক্লিক করুন।



সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ তুষার কাঞ্জিলাল বলেন, ‘‘একটি পৃথক জেলা তৈরি হলে তা সুন্দরবনের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে হয় তো আশীর্বাদই হবে। কিন্তু বাস্তবিক পরিস্থিতি অনুযায়ী শুধুমাত্র পরিকাঠানো উন্নয়ন নয়, সুন্দরবন এলাকার মানুষের জীবিকা সব থেকে বড় সমস্যা। সে বিষয়ে আলোকপাত করা হলে সঠিক পথে উন্নয়ন হবে বলে মনে হয়।’’

তবে এ দিন মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় প্রায় আকাশ থেকে পড়েছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা প্রশাসনের কর্তারা। সুন্দরবনের অধিকাংশ এলাকা দক্ষিণ ২৪ পরগনার অধীনেই রয়েছে। জেলা প্রশাসনের কর্তাদের একাংশের বক্তব্য, আয়লার পরে সুন্দরবনের অধিকাংশ এলাকার বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। বহু এলাকায় জমি অধিগ্রহণ সমস্যা থাকায় পুরোপুরি বাঁধ নির্মাণ করা যায়নি। একটি পৃথক জেলা তৈরি করতে হলে পুলিশ ও প্রশাসনিক ভবন তৈরি করা হবে। ফের জমি অধিগ্রহণ নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

জেলা প্রশাসনের এক কর্তার কথায়, ‘‘দুই ২৪ পরগনার জেলা সদর কোথায় তৈরি করা হবে, সেই বিষয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে। উত্তর ২৪ পরগনা ঘেঁষা জেলা সদর তৈরি করাটাই বাস্তবিক সিদ্ধান্ত হবে। সে ক্ষেত্রে একমাত্র বারুইপুরই উপযুক্ত জায়গা। সেখানে বাম জমানায় অধিকৃত জেলা সদরের জমিতে রাজ্য সরকার আবাসন প্রকল্প তৈরি করছে। তা ছাড়া, কেন্দ্রীয় সরকারের ফরমান অনুযায়ী, সুন্দরবনের অধিকাংশ এলাকায় পরিকাঠামো গঠন করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সুন্দরবনের জীবমণ্ডল বজায় রাখতে সম্প্রতি সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি-বেসরকারি পরিকাঠামো ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঝড়খালিতে সরকারি পর্যটন প্রকল্প বাতিল করেছে গ্রিন বেঞ্চ।



যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি না হওয়ায় উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালির খুলনা বা হিঙ্গলগঞ্জের সামশেরনগর থেকে বারাসতে অফিস-কাছাড়ির কাজ নিয়ে যেতে হলে রাতে বাড়ি ফেরাই কার্যত অসম্ভব। একাধিক নদী পেরোতে হয়। অনেক জায়গায় আবার রাতে খেয়া চলে না। সুন্দরবনকে পৃথক জেলা ঘোষণা করায় স্বভাবতই আশায় বুক বাঁধছেন উত্তর ২৪ পরগনার সুন্দরবন এলাকার মানুষও।

তাঁদের প্রাথমিক চাহিদা হল, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিসাধন। একাধিক সেতু তৈরি না হলে তা সম্ভব নয়। বাম আমল থেকেই হাসনাবাদে কাঠাখালি নদীর উপরে সেতুর জন্য টাকা বরাদ্দ হয়ে আছে। সেই বরাদ্দ এই আর্থিক বর্ষে এসে আরও বেড়েছে। সাহেবখালি কিংবা ন্যাজাটে বেতনি নদীর উপরে সেতু হয়নি। স্থানীয় মানুষের বক্তব্য, গত সাড়ে ৪ বছরে যে সরকার হাসনাবাদে সেতুর কাজ শেষ করতে পারল না, নতুন পরিকল্পনা এত অল্প সময়ে বাস্তবায়িত হবে তো? হলেও বা কতটা কাজ হবে, তা নিয়ে কিছুটা সংশয়ও ঘোরাফেরা করছে।

সন্দেশখালির বাম বিধায়ক নিরাপদ সর্দার বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী সর্বত্র বলছেন টাকা নেই। এ দিনও বলেছেন, মাত্র ২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে কি উন্নয়ন সম্ভব? তা হলে কী ভাবে নদীবেষ্টিত দ্বীপভূমিতে মাত্র এক বছরের মধ্যে নদীর উপরে সেতু এবং প্রশাসনিক ভবন তৈরি করে জেলা চালু করবেন?’’ তাঁর আরও বক্তব্য, রেলমন্ত্রী থাকাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সামশেরনগরে রেল পরিষেবা দেবেন বলে হঠাৎ ঘোষণা করে বসেন। কিন্তু কোথায় কী! নিরাপদবাবুর কথায়, ‘‘আসলে সুন্দরবনকে জেলা ঘোষণা করা ভোটের আগে রাজনৈতিক চমক ছাড়া কিছুই নয়।’’ প্রাক্তন সুন্দরবন উন্নয়নমন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ও বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী বাস্তবিকতা মাথায় না রেখে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে সুন্দরবনের মানুষকে খুশি করতে জনমোহিনী পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু সুন্দরবনের মানুষ সব কিছুই খেয়াল রাখেন।’’

সব ছবি: নির্মল বসু।

আরও পড়ুন

Advertisement