সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান রহস্য ফের উস্কে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার নেতাজি ভবনে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি বললেন, ‘‘১৯৪৫ সালে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়েছে, আমি তা মানতে পারি না। হতে পারে আমার মনের ভুল, কিন্তু আমি যেটা মানতে পারি না, সেটা পারি না। তা হলে স্বাধীনতার পরেও গোয়েন্দাগিরি চলেছিল কেন?’’
এ দিন মমতা যখন এ কথা বলছেন, তখন সেখানে উপস্থিত তৃণমূল সাংসদ সুগত বসু এবং তাঁর মা কৃষ্ণা বসু। নেতাজির ভাইপো প্রয়াত শিশির বসুর স্ত্রী (যিনি ঘটনাচক্রে তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ) এবং তাঁর পুত্র দু’জনেই বিশ্বাস করেন, ১৯৪৫ সালের ১৮ অগস্ট তাইওয়ানের তাইহোকুতে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজি মারা যান। সেই প্রসঙ্গ তুলেই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘কতকগুলো ফাইল দেখে সন্দিহান হয়ে পড়লাম। যদি তিনি মারাই যান, যেটা বলা হয় বিমান দুর্ঘটনায়, সুগত তোমরা মানতে পারো, আমি মানতে পারি না।’’
এলগিন রোডের বাড়িতে গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় ১৯৪১ সালের ১৮ জানুয়ারি গভীর রাতে ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে বিদেশে পাড়ি দেন নেতাজি। সেই ‘মহানিষ্ক্রমণের’ ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ দিন নেতাজি ভবনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো। সেখানেই মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে অন্তর্ধান-রহস্যের প্রসঙ্গ।
রাজ্য সরকারের হাতে নেতাজি সংক্রান্ত যে ৬৪টি গোপন নথি ছিল, তা কিছু দিন আগেই প্রকাশ করে দিয়েছেন মমতা। তাতে নেতাজির অন্তর্ধান নিয়ে বিরাট আলোকপাত না-ঘটলেও মমতার রাজনৈতিক ফায়দা হয়েছে বলেই অনেকের মত। তাঁদের বক্তব্য, নেতাজিকে ঘিরে বাঙালি আবেগপ্রবণ। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়নি। শাসক ও বিরোধী নেতাদের একটা বড় অংশের বক্তব্য, নেতাজি-ফাইল প্রকাশ করে সেই আবেগের হাওয়াই নিজের পালে টানতে চেয়েছিলেন মমতা। পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে। কারণ, কেন্দ্রের হেফাজতেও নেতাজি সংক্রান্ত বেশ কিছু গোপন ফাইল রয়েছে। সেই চাপ এবং নেতাজি পরিবারের বহু সদস্যের আর্জির মুখে আগামী ২৩ জানুয়ারি থেকে পর্যায়ক্রমে সে সব প্রকাশ্যে আনবে বলে ঘোষণা করেছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। কিন্তু তার জেরে নেতাজি-আবেগ যাতে ভোটের বছরে বিজেপি-মুখী না হয়, তা নিশ্চিত করতেই মমতা এ দিন অন্তর্ধান-বিতর্ক ফের উস্কে দিলেন বলে অনেকের মত।
মুখ্যমন্ত্রী এ দিন বলেন, ‘‘নেতাজির অন্তর্ধান নিয়ে রহস্য আজও রয়েছে। এটা আমাদের কাছে লজ্জার। এক বার তো চিতাভস্ম আনার চেষ্টা হয়েছিল। আমি তখন এমপি ছিলাম। সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, হবে না। তোমাকে আগে নিশ্চিত (কনফার্ম) করতে হবে এটা সত্যিই নেতাজির চিতাভস্ম।’’
এ দিনের বক্তৃতায় এশিয়াটিক সোসাইটির এক প্রাক্তন অধ্যাপিকা পূরবী রায়ের নাম করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘রাশিয়ায় নেতাজি ছিলেন এমন কথাও বলেছেন তিনি। আমরা ফাইল দেওয়ার পর কি রাশিয়ার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে?’’ মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ‘‘নেতাজির মৃত্যু কী ভাবে হল তা নিয়ে দেশের মানুষ কিন্তু কৈফিয়ত চাইছে। আগামী এক বছর ধরে রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি, শিক্ষা দফতর এবং রিসার্চ ব্যুরোকে নিয়ে একটি কমিটি কৈফিয়ত চাইবে।’’ সুগতবাবু অবশ্য পরে দাবি করেন, কৈফিয়ত দেশবাসী চাইবেন। তার সঙ্গে কমিটির কোনও সম্পর্ক নেই। ‘‘যে সমস্ত অজানা তথ্য কেন্দ্র এখনও দেয়নি, তা নিয়ে কমিটি চাপ তৈরি করবে,’’ বলেছেন তিনি।
মমতা যা-ই বলুন, সুগত কিন্তু এখনও বলছেন, যাবতীয় প্রামাণ্য নথি ঘেঁটেই তিনি ইতিহাসবিদ হিসেবে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে ১৯৪৫ সালের ১৮ অগস্টের পর সুভাষের কোনও অস্তিত্ব ছিল না। তাঁর কথায়, ‘‘যদুনাথ সরকারের আমল থেকেই ইতিহাসে একটা নিয়ম মানা হয়। যেখানে ঘটনা নিয়ে সংশয়, সেখানে প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ গুরুত্ব পায়। বাবা (শিশির বসু) নেতাজির দোভাষী নাকামুরা এবং অনেক সাক্ষীর বয়ান রেকর্ড করেছিলেন। প্রত্যেকেই দুর্ঘটনার কথা বলছেন।’’ কিন্তু বিশ্বাসে মিলায় সুভাষ, ইতিহাসে নয়। কে না জানে, জনতার বিশ্বাস এবং ইতিহাস অনেক সময়েই পরিপূরক হয় না। সুগতর সোজাসাপ্টা কথা— মানুষের বিশ্বাসকে তিনি অশ্রদ্ধা করেন না। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ নিয়ে কথা বলে। বিশ্বাস নিয়ে নয়।
ঘটনা হল, তাইহোকু-তত্ত্ব মানেন না অনেক ইতিহাসবিদও! নেতাজি ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান স্টাডিজের প্রাক্তন ডিরেক্টর রাধারমণ চক্রবর্তী যেমন মনে করেন, ‘‘বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজি মারা গেলে তাঁর সঙ্গী হবিবুর রহমান বেঁচে থাকলেন কী ভাবে? আজাদ হিন্দ ফৌজকে দান করা টাকা, গয়নার সুটকেসই বা হাওয়া হল কী ভাবে?’’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী শোভনলাল দত্তগুপ্ত মনে করাচ্ছেন, তাইওয়ান সরকার জানিয়েছিল, ১৯৪৫ সালের ১৮ অগস্ট তাইহোকুতে কোনও বিমান দুর্ঘটনা হয়েছিল কি না সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নয়। এই অনিশ্চয়তার একটা ব্যাখ্যা অবশ্য সুগতর ‘হিজ ম্যাজেস্টিজ অপোনেন্ট’ বইতে আছে। তাইহোকুর দুর্ঘটনা ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান আত্মসমর্পণ করার চার দিন পরে। তখন অনেক বিমান দুর্ঘটনার নথিই ছিল না।
তা হলে ইতিহাস আর কোন নথি খুঁজবে? ইতিহাসবিদ রজতকান্ত রায় বলেন, ‘‘এত বিতর্কেরই দরকার নেই। রেনকোজি মন্দিরে রাখা চিতাভস্ম সুভাষের বংশধরদের ডিএনএ-র সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই সব বোঝা যাবে।’’ সুগতবাবু জানাচ্ছেন, ডিএনএ টেস্ট তাঁরাও চান। তবে একই সঙ্গে এটাও মনে করাচ্ছেন যে, উচ্চ তাপে ডিএনএ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাটাও কিন্তু থেকে যায়।