ছবি আঁকেন। কবিতাও লেখেন। এ বার ভোটে দলের প্রচারের জন্য নাটকও লিখে ফেললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! ভোটে প্রচারের জন্য তৃণমূলের তরফে নাটক লেখার ভার দেওয়া হয়েছিল বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের চার নাট্য-ব্যক্তিত্বকে। তাঁরা যে নাটকের খসড়া লিখেছিলেন, তার উপরে ভিত্তি করেই তৃণমূল নেত্রীর এ বারের নাট্য-সৃজন। নাটকটির প্রধান নির্দেশক ব্রাত্য বসু। খসড়া নাটকের নাম ছিল ‘মমতাময়ী বাংলা।’ নতুন করে লেখার পরে মমতা নাম দিয়েছেন ‘জয়তু’!
নাটকের সময় সীমা ২৫ মিনিট। তৃণমূলের সরকার পাঁচ বছরে রাজ্যে কী কী উন্নয়ন করেছে, তা সংলাপে, কবিতার ছন্দে এবং গানের সুরে বেঁধেছেন স্বয়ং মমতাই। তৃণমূলের সাংস্কৃতিক শাখার চেয়ারম্যান, গায়ক ইন্দ্রনীল সেন জানিয়েছেন, নাটকটির মূল বিষয়— মমতা সরকারের আমলে রাজ্যে সর্ব স্তরে উন্নয়ন। বাম আমলে রাজ্যের বেহাল অবস্থা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা কী রকম লড়াই করে হাল ফেরাচ্ছেন, নাটকে তা-ই জানিয়েছেন বিভিন্ন চরিত্র। কন্যাশ্রী, যুবশ্রী, দু’টাকা কেজি দরে চাল, ‘সবুজ সাথী’ সাইকেল দান থেকে শুরু করে লোকশিল্পীদের মাসে এক হাজার টাকা করে রাজ্য সরকারের ভাতা দেওয়া— সবই বলেছেন তাঁরা। তার সঙ্গে তৃণমূলকে ভোট দেওয়ার জন্য স্লোগানও দিয়েছেন নাটকের ৮ চরিত্র।
আগে নাটকের খসড়া শেখর সমাদ্দার, বিজয় মুখোপাধ্যায়, দেবাশিস বিশ্বাস এবং আশিস চট্টোপাধ্যায় যৌথ ভাবে লিখেছিলেন। তা এক রকম চূড়ান্তও হয়েছিল। কিন্তু তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশের ধারণা, বাম-কংগ্রেস জোটের জমি প্রস্তুতির কাজ শুরু হওয়ার পরেই মমতা ভোটের প্রচার কী ভাবে করা হবে, তা নিয়ে নিজের হাতে রাশ নিতে চেয়েছেন। তাই ভোট-প্রচারের নাটক তিনি নতুন করে তৈরি করেছেন। খসড়া নাটকটিতে নাম না করে বিজেপি-র বিরুদ্ধে তোপ দাগা হয়েছিল। ধর্ম নিয়ে রাজ্যে কেমন অশান্তি হচ্ছে, তা খসড়া-নাটকে ছিল। ধর্ম নিয়ে অশান্তি যে মমতা-সরকার বরদাস্ত করবে না, তা নাটকের বিভিন্ন চরিত্র চোখা সংলাপে একযোগে জানিয়েছিল। কিন্তু মমতার সম্পাদিত নাটকে খুব নরম করেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলা হয়েছে। নাটকের এক চরিত্রের অবশ্য সংলাপ আছে, ‘জাত নিয়ে ধর্ম যারা দেশটাকে ভাগ করতে চায়, তাদের সঙ্গে লড়াই করতে হবে।’ কিন্তু তার পরেই নাটকের অভিনেতারা সমবেত কন্ঠে বলেছে, ‘ভাগাভাগি নয়, নয় বিভেদ হিন্দু-মুসলমান, এসো আমরা গড়ে তুলি মানবিকতার স্থান’।
বিরোধী সিপিএম-কংগ্রেস নেতাদের অনেকেই বিজেপি-তৃণমূলে গোপন আঁতাঁতের কথা তুলেছেন। আর সেই কারণেই মমতার নাটকে বিজেপি-কে তেমন ক্ষুরধার আক্রমণ নেই বলে তাঁদের ধারনা। এই বিষয়ে প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি ইন্দ্রনীল। তিনি বলেছেন, ‘‘আমি যত দূর জানি, দিদি যে নাটক লিখেছেন, তাতে নেতিবাচক কিছু নেই। ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দিদি নাটকটি তৈরি করেছেন।’’ আরও এক ধাপ এগিয়ে তৃণমূলের এই প্রচার নাটকের সামগ্রিক পরিকল্পনা রূপায়নের দায়িত্বে থাকা বিজয়বাবুর বক্তব্য, ‘‘দিদি নিরলস পরিশ্রম করে সাধারণ মানুষের জীবনকে যে উন্নত করছেন, নাটকে তা-ই তুলে ধরা হয়েছে।’’
মিনার্ভা থিয়েটারে কয়েক দিন আগে গ্রুপ থিয়েটারের শিল্পীদের দিয়ে নাটকটির অভিনয় করানো হয়েছে। বিজয়বাবু, দেবাশিসবাবুর তত্ত্বাবধানে সেই অভিনয়ের ভিডিও রেকর্ডিং করা হয়েছে। দেবাশিসবাবুরা জানিয়েছেন, ওই অভিনয়ের ভিসিডি এবং ডিভিডি ‘ইচ্ছুক ও আগ্রহী’ বিভিন্ন গ্রুপকে দেওয়া হবে। তৃণমূলের এক নেতার দাবি, ‘‘আমাদের সরকার প্রায় ২৫০টি গোষ্ঠীকে অনুদান দেয়। এক একটি গোষ্ঠীকে বছরে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। তাদের অনেকেই দিদির নাটকে অভিনয় করতে চায়।’’ দলীয় সূত্রে খবর, প্রায় ২০০টি গোষ্ঠী নাটকটি অভিনয় করতে চায়। দক্ষিণবঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় নাটকটি অভিনয়ের আয়োজনের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন ব্রাত্য। উত্তরবঙ্গে এই দায়িত্বে রয়েছেন বালুরঘাটের সাংসদ অর্পিতা ঘোষ। তবে তাঁরা এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। শাসক দলের এক শীর্ষ নেতার কথায়, ‘‘ভোটের প্রচার শুরু হওয়া মাত্র জেলায় জেলায়, ব্লকে ব্লকে নাটকের অভিনয় হবে। এখনও পর্যন্ত ঠিক হয়েছে নাটকটির অন্তত দু’হাজার অভিনয় হবে। পরে সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে।’’