আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। তাড়াতাড়ি দড়ি আনুন—পাহাড়ি পথের বাঁকে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সামনেই সোনাদা থেকে একটু এগিয়ে বাঁকের মুখে রাস্তা থেকে গড়িয়ে পড়ে গিয়েছে তাঁর গাড়ির সামনেই থাকা রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কনভয়ের একটি এসইউভি। দুর্ঘটনার খবর পেতেই নিজের গাড়ি দাঁড় করান মুখ্যমন্ত্রী। তার পরের ২৫ মিনিট ধরে উদ্ধার কাজের রাশ চলে যায় তাঁর হাতেই।
কনভয়ে থাকা কোনও গাড়ি দুর্ঘটনাগ্রস্ত হলেও ‘ভিভিআইপি’দের গাড়ি থামিয়ে দেওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু শুক্রবার পাহাড় থেকে নামার সময় দুর্ঘটনার পরে তার ব্যতিক্রম ঘটালেন মমতা। গাড়ি থেকে নেমেই রাস্তার পাশে এগিয়ে যান। কনভয়ের সব গাড়ি দাঁড়িয়ে যায়। পুলিশ অফিসারেরা ‘ভিভিআইপি’র নিরাপত্তার জন্য চারপাশ ঘিরে দেন। পুলিশ অফিসারদের কয়েক জন জানিয়েছেন, তাতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন মুখ্যমন্ত্রী। তখনই বলে দেন, তাঁকে নিয়ে ভাবতে হবে না।
মুখ্যমন্ত্রী নিজের গাড়ি থেকে নেমেই প্রথমে রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যপালের খোঁজ করেন। তাঁরা দু’জনে একই গাড়িতে ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী তারপরে রাষ্ট্রপতিকে ফোন করে কার্শিয়াং ট্যুরিস্ট লজে বিশ্রাম নিতে অনুরোধ করেন। তত ক্ষণে মুখ্যমন্ত্রী জেনে গিয়েছেন, দুর্ঘটনাগ্রস্ত গাড়িটিতে থাকা নিরাপত্তা অফিসার-কর্মীরা সকলেই বেঁচে গিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের উদ্ধার করতে হবে। কর্ডলেস মাইক চেয়ে নিয়ে তদারকি শুরু করেন মুখ্যমন্ত্রী। সব গাড়ি থেকে দ্রুত দড়ি বের করার নির্দেশ দেন।
দড়ি বেয়ে উঠে আসছেন আহতরা।
রাস্তার পাশে ভিড় থাকলে উদ্ধার কাজে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় মুখ্যমন্ত্রী মাইকে সবাইকে রাস্তার ধার থেকে সরে আসতে বলেন। যে খাদে এসইউভিটি পড়ে গিয়েছে, তার সামনে থেকে সবাইকে সরে যেতে বলেন। তবে পড়ে যাওয়া গাড়িটির আহত অফিসার, কর্মীদের চিৎকার শুনে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই এগিয়ে যান। খাদে প্রায় ঝুঁকে পড়েন তিনি। মাইক হাতে মুখ্যমন্ত্রী বলতে থাকেন, ‘‘আরও দড়ি লাগবে।’’
তারপরে নীচে পড়ে থাকা অফিসারদের জন্য বললেন, ‘‘আরও দড়ি নামানো হচ্ছে। তাড়াহুড়ো করবেন না। মনের জোর রাখুন।’’ একে একে তুলে আনা হয়, আইপিএস-অফিসার-সহ পাঁচ জনকেই। তাঁদের দেখে মুখ্যমন্ত্রী বলে ওঠেন, ‘‘ওঁরা ভয়ে কাঁপছেন। ভয়ের কিছু নেই। সাবধানে উপরে আসুন। সবাই ভাল হয়ে যাবেন।’’
প্রশাসনিক আধিকারিকরা মুখ্যমন্ত্রীকে রওনা হওয়ার তাড়া দিলেও তিনি দুর্ঘটনাস্থল থেকে নড়েননি। বললেন, ‘‘সবাইকে হাসপাতালে পাঠান। আমি রয়েছি।’’ উদ্ধারের পরে নিজের গাড়িতে ওঠার আগে ধন্যবাদ জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উদ্ধারকারী দলকে পুরস্কৃত করার কথাও জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতি ও মুখ্যমন্ত্রী এ দিন বাগডোগরা থেকে দিল্লি চলে যান। তাঁদের বিমান ছাড়ার কথা ছিল বেলা ২টো ৩৫মিনিটে। উদ্ধার কাজ শেষ করে তাঁদের পৌঁছতে দেরি হয়।
(শুক্রবার জয়ন্ত ঘোষাল ও রবিন রাইয়ের তোলা ছবি।)