Advertisement
E-Paper

‘স্যার কলেজে যাবেন না’, পথ আটকে যুবক

‘আতঙ্ক’ ছবিতে শিক্ষক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় শুনেছিলেন, ‘মাস্টারমশাই আপনি কিন্তু কিছু দেখেননি’। রবিবার মন্তেশ্বরের গৌড়মোহন কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রধান স্নেহাশিস ঘোষ শুনলেন, ‘স্যার কলেজে যাবেন না। ভিতরে গোলমাল চলছে।’

কেদারনাথ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:৩৫

‘আতঙ্ক’ ছবিতে শিক্ষক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় শুনেছিলেন, ‘মাস্টারমশাই আপনি কিন্তু কিছু দেখেননি’। রবিবার মন্তেশ্বরের গৌড়মোহন কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রধান স্নেহাশিস ঘোষ শুনলেন, ‘স্যার কলেজে যাবেন না। ভিতরে গোলমাল চলছে।’

তিনিই যে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হতে চলেছেন, তা এক প্রকার ঠিকই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, রবিবার সেই নতুন অধ্যক্ষ নির্বাচনের সভায় যোগ দেওয়া হল না স্নেহাশিসবাবুর। এ দিন কলেজের পথে মাঝরাস্তা থেকে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠল এলাকারই কিছু যুবকের বিরুদ্ধে। বারবার কলেজে যেতে চাইলেও ওই যুবকেরা কর্ণপাত করেনি বলে অভিযোগ।

এ দিন ওই কলেজের অধ্যক্ষ গোলাম মইনুদ্দিন মিদ্দার অবসর গ্রহণ ও তার সঙ্গেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নির্বাচন ছিল। ওই পদের জন্য যে ক’জন শিক্ষক আবেদন করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ স্নেহাশিসবাবুই ওই পদ পেতে চলেছেন বলে মোটের উপরে ঠিক ছিল। কিন্তু, এ দিন রাস্তায় যে ভাবে বাধা পেয়েছেন, তাতে যথেষ্টই আতঙ্কে স্নেহাশিসবাবু। তাঁর কথায়, ‘‘কলেজের স্বার্থেই দায়িত্ব নিচ্ছিলাম। তবে এমন ঘটনার পরে আর নেব না, এটুকু বলতে পারি।’’ তাঁর অভিযোগ, এ দিন শুধু তাঁকে নয়, তাঁর সঙ্গে থাকা আরও কিছু শিক্ষককেও ওই যুবকেরা কলেজে যেতে বাধা দেয়।

পুলিশ বা কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে স্নেহাশিসবাবু কোনও লিখিত অভিযোগ করেননি। তবে, এই ঘটনার পিছনে শাসকদলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন কলেজ-শিক্ষকদের একাংশ।

কলেজ সূত্রের খবর, গত ১৯ জানুয়ারি বৈঠক করে নতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে যোগ দিতে ইচ্ছুকদের আবেদন জানাতে বলা হয় কলেজের তরফে। স্নেহাশিসবাবু এবং আর এক শিক্ষক তনয়কুমার পাল-সহ কয়েক জন আবেদন করেন। সাধারণ ভাবে, ‘সিনিয়র’ শিক্ষককেই এই পদের জন্য বাছা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মও সে কথা বলে। তবে, প্রথম জন কোনও কারণে অনুপস্থিত থাকলে দায়িত্ব পান দ্বিতীয় জন। শনিবার পরিচালন সমিতির তরফে নোটিস দিয়ে জানানো হয়, রবিবার বেলা ১টার মধ্যে পদপ্রার্থীদের কলেজে হাজির হতে হবে।

এ দিন ১১টা নাগাদ মন্তেশ্বর হাসপাতাল মোড় থেকে স্নেহাশিসবাবু, সংস্কৃত বিভাগের প্রধান রূপা সরকার, বাংলার বিভাগীয় প্রধান শম্পা ঘোষ, বাংলার শিক্ষক শম্পা ঘোষ এবং ইতিহাসের অধ্যাপক অসীম পোড়েল—এই পাঁচ জন কলেজের দিকে রওনা দেন। তাঁদের অভিযোগ, কিছু দূর যেতেই স্থানীয় কিছু যুবক পথ আটকে বলে, কলেজের ভিতরে গণ্ডগোল হচ্ছে তাই যাওয়া যাবে না। এমনকী, গোলমাল মিটে গেলে ডেকে নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেয়। ওই শিক্ষকদের দাবি, তাঁরা কলেজের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যেতে দেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করলেও ওই যুবকেরা কানে তোলেনি। উল্টে এক জন হাত জোড় করে তাঁদের ফিরে যেতে বলে। এর পরে মন্তেশ্বরের বাড়িতে ফিরে যান স্নেহাশিসবাবুরা। তাঁর দাবি, ‘‘দুপুর ১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরেও ডাক না আসায় কলকাতার বাড়িতে ফিরে যাই।’’

কলেজ-শিক্ষকদের একাংশের বক্তব্য, স্নেহাশিসবাবু সময়ে কলেজে পৌঁছে গেলে তাঁকেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ দিতে হতো। কিন্তু তৃণমূলের একটি গোষ্ঠীর পছন্দের তালিকায় তিনি ছিলেন না। তাই বছর ছাপান্নর প্রবীণ শিক্ষককে আটকে দিতেই এই কৌশল নেওয়া হয়। যাতে তাঁর গরহাজিরায় অন্য জন পদ পেয়ে যান। যদিও এই অভিযোগ মানতে চাননি এলাকার তৃণমূল নেতা তথা কলেজের পরিচালন সভাপতি দেবব্রত রায় বলেন, ‘‘এ রকম কোনও ঘটনা ঘটেনি। আমাদের কাছে কেউ অভিযোগও করেননি। কলেজ ক্যাম্পেসে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে আমরাই তো পুলিশের সাহায্য চাইতাম।’’ তাঁর দাবি, এ দিন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের নির্বাচন থাকলেও কেউ দায়িত্ব নিতে চাননি। স্নেহাশিসবাবু বিকেল চারটে পর্যন্ত কলেজে না আসায় অধ্যক্ষ তাঁকেই দায়িত্ব দিয়ে চলে যান।’ খুব শীঘ্রই সমিতির বৈঠক ডেকে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হবে।

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নির্বাচনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মানতে চাননি মন্তেশ্বর ব্লক তৃণমূল সভাপতি সজল পাঁজাও। তাঁর দাবি, ‘‘আমি নেতা হিসাবে কলেজের ভিতরে ঢুকি না। এ দিনও অন্য কর্মসূচিতে ব্যস্ত ছিলাম। তবে এক শিক্ষক কলেজে ঢুকতে পারছেন না বলে কানে এসেছিল। সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের ছাত্র সংগঠনের এক নেতাকে বলি তাঁর সঙ্গে দেখা করে কলেজে নিয়ে যেতে। সাড়ে ১২টা নাগাদ ওই ছাত্র নেতা শিক্ষকের সঙ্গে দেখাও করেন। তবে উনিই যেতে রাজি হননি।’’ স্নেহাশিসবাবু এ কথা মানেননি। তাঁর মন্তব্য, ‘‘২৭ বছর চাকরি করছি। কোনও দিন এমন হয়নি। সাধারণ ভাবে সিনিয়রকেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়।’’

এই খবর জানাজানি হতেই বিরোধীরা বলতে শুরু করেছেন, তৃণমূল প্রভাবিত শিক্ষক সংগঠনের সদস্যই যদি শাসকদলের নেতাদের চাপে কলেজে ঢুকতে না পারেন, তা হলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। ওয়েবকুপার বর্ধমান জেলা সভাপতি সুশান্ত বারিক বলেন, ‘‘মন্তেশ্বর কলেজের সমস্ত শিক্ষকই আমাদের সদস্য। ওখানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের কথা ছিল। আমরা বলেছিলাম, নিয়ম মেনে আলোচনা করে বিষয়টি মেটাতে। এ দিন কী হয়েছে, আমার জানা নেই। কোনও অভিযোগও পাইনি।’’

শাসকদল যাই দাবি করুক না কেন, এ দিনের অভিজ্ঞতার পরে আর বিতর্কে জড়াতে চাইছেন স্নেহাশিসবাবু। ফের নির্বাচন হলে আসবেন কিনা, সে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘ছাত্রছাত্রীদের পড়াতেই চাই। আর কোনও দায়িত্ব চাই না!’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy