E-Paper

বাংলা-কথায় সাবধান, বার্তা বিজেপি নেতৃত্বের

বিজেপির বিরুদ্ধে ‘বহিরাগত’ এবং ‘বাংলা-বিদ্বেষী’, এই দুই অস্ত্রে বিরোধীদের প্রচার থাকে সপ্তমে। বিভিন্ন সময়ে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা থেকে শুরু করে একাধিক নেতার বাংলা-বাঙালি নিয়ে করা নানা মন্তব্যে অস্বস্তিতে পড়েছে বঙ্গ বিজেপি।

বিপ্রর্ষি চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩২

— প্রতীকী চিত্র।

লক্ষ্য ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে ভুল-ভ্রান্তি এড়াতে বার্তা আসছে বিজেপির শীর্ষ স্তর থেকে। নির্বাচন এলেই রাজ্যে ভিড় বাড়বে ভিন্ রাজ্যের নেতাদের। সেই সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্য থেকেও বিজেপি নেতাদের প্রতিক্রিয়া আসবে পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে। কিন্তু সেই মন্তব্যে যাতে বিপক্ষের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার মতো কোনও কথা না-থাকে, সে বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে বলা হয়েছে।

বিজেপির বিরুদ্ধে ‘বহিরাগত’ এবং ‘বাংলা-বিদ্বেষী’, এই দুই অস্ত্রে বিরোধীদের প্রচার থাকে সপ্তমে। বিভিন্ন সময়ে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা থেকে শুরু করে একাধিক নেতার বাংলা-বাঙালি নিয়ে করা নানা মন্তব্যে অস্বস্তিতে পড়েছে বঙ্গ বিজেপি। পরবর্তী ধাপের নেতাদের বাক্যবাণ তো রয়েইছে। এক দিকে যেমন রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস-সহ এ রাজ্যের বাম-কংগ্রেসের হাতে বিজেপি-বিরোধিতার অস্ত্র শাণিত হয়েছে, তেমনই বিড়ম্বনা বেড়েছে রাজ্য নেতাদের। তবে শুধু তা-ই নয়, রাজ্য নেতাদের একাংশের বিভিন্ন মন্তব্যও ভোটের আগে দলকে বেকায়দায় ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। সূত্রের খবর, এই নিয়ে কড়া বার্তা এসেছে শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে। পশ্চিমবঙ্গের ‘সংবেদনশীল’ বিষয় নিয়ে রাজ্যের নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ না-করে কোনও রকম প্রতিক্রিয়া দিতে নিষেধ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বাংলা-বাঙালি সংক্রান্ত অন্য মন্তব্যের বিষয়েও সচেতন থাকতে বলা হয়েছে ভিন্ রাজ্যের নেতাদের। বিশেষত, বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি, মনীষী, পোশাক-পরিচ্ছদ, উৎসব-পার্বণের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, আমিষ-নিরামিষ বিতর্ক নিয়েও মুখ খোলায় সাবধান হতে বলা হয়েছে। তবে বিজেপি-শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষী শ্রমিকদের হেনস্থার প্রশ্নে সেই অনুপ্রবেশকারী-তত্ত্বেই অনড় রয়েছেন বিজেপি নেতৃত্ব।

বিজেপির এক শীর্ষ নেতার কথায়, “আমাদের দফতরে রোজ শতাধিক লোকের রান্না হয়। অধিকাংশ পদ থাকে আমিষ। বাঙালিকে মাছ-মাংস থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় নাকি? কিন্তু আমাদের কিছু নেতা নানা সময়ে আলটপকা মন্তব্য করেন, যা আমাদের বিরুদ্ধে প্রচারে সাহায্য করে।” বাংলা সংক্রান্ত অন্য বিষয় নিয়েও তাঁর একই মত। যদিও ওই নেতার সংযোজন, তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থা এই সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কিছু বিকৃত প্রচারও করে।

তৃণমূলের মোকাবিলায় পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বাঙালি-অস্মিতাকে আলাদা গুরুত্ব দিতে চায় বিজেপিও। তাদের এক শীর্ষ নেতার কথায়, “তৃণমূল বাঙালি অস্মিতার কথা বলে, অথচ আশাপূর্ণা দেবীর প্রথম প্রতিশ্রুতি, সুবর্ণলতা, বকুল কথা—যা তৎকালীন সমাজ, স্বাধীনতা আন্দোলন, জাতীয়তাবোধ এবং নারী স্বাধীনতার প্রতিফলন, তাকে তৃণমূল সরকার পাঠক্রমে রাখেনি। মহাশ্বেতা দেবী তো পরিবর্তনের পক্ষে ছিলেন। আজ তিনিও ব্রাত্য! এই বিষয়গুলো প্রচারে থাকবে না?”

শুধু ভিন্ রাজ্যের নেতারাই নন, ‘অতি উৎসাহে’ রাজ্যের নেতারাও যে অনেক সময় এলোমেলো মন্তব্য করে দলের বিড়ম্বনা বাড়ান, সেই বিষয়েও বিজেপি কড়া নজর রেখেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্যে এসে নেতাদের সতর্ক করে গিয়েছেন। সম্প্রতি এক সাংসদ যে ভাবে কেন্দ্রীয় সরকার এবং তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, সূত্রের খবর সেই প্রসঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেছেন। তাঁকে বলা হয়েছে, “এটা ভারত। বাংলাদেশ নয়! যাকে অপছন্দ, তাঁকে ফাঁসি দিয়ে দেওয়া যায় না। এখানে যা হবে, গণতান্ত্রিক রীতি মেনে হবে।”

তবে বাংলা-বাঙালির প্রশ্নে বিজেপির সর্বোচ্চ স্তর থেকেই অতীতে যে সব মন্তব্য এসেছে, তাতে এই সতর্ক-বার্তার কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় আছে অন্যদের। তৃণমূল সাংসদ পার্থ ভৌমিকের বক্তব্য, “প্রধানমন্ত্রী সংসদে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’ বলেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ‘সান্যাল’ বলেছেন! রামমোহন রায়কে ইংরেজদের দালাল বলা হয়েছে! এর পরে আর কে কী বলল, তাতে কি যায় আসে? বাংলার মানুষ বিজেপিকে চিনে গিয়েছে।” দলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তীরও দাবি, “বাংলা-বিরোধিতা বিজেপির জিনে রয়েছে। শাহের মিছিল থেকে কলকাতায় বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হয়েছিল! বাংলায় কথা বললে বাংলাদেশী বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে।” সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর মতে, “এই রাজ্যের নেতাদের প্রতি ভরসা নেই, তাই নির্বাচনের সময়ে যাঁদের বাংলা সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই, তাঁদের এনে ভিড় করা হবে। বাঙালি বিদ্বেষ যে বিজেপির মনে আছে, স্বাভাবিকতায় আছে, এই সতর্ক-বার্তা সেটাই প্রমাণ করে।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Assembly Election 2026 BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy