‘এল নিনো’ থেকে নিম্নচাপ অক্ষরেখা পর্যন্ত যাদের জোটবদ্ধ বাধায় শীত এ বার এসেও আসতে পারেনি, ঘূর্ণাবর্ত তাদের অন্যতম। এ বার একটি ঘূর্ণাবর্তই পরোক্ষে শীতের দরজা খুলে দিতে চলেছে বলে আবহবিদদের আশা। ওড়িশার ঘূর্ণাবর্ত বা বা বাংলাদেশের নিম্নচাপ অক্ষরেখা যা পারেনি, মধ্যপ্রদেশের একটি ঘূর্ণাবর্ত সেই বৃষ্টি নামাল দক্ষিণবঙ্গে! আর এই বৃষ্টির দৌলতেই কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গে শীত ফেরার সম্ভাবনা উজ্জ্বল।
প্রতিকূল আবহাওয়ায় এ বার ভরা জানুয়ারিতেও শীত উধাও হয়ে গিয়েছিল দক্ষিণবঙ্গ থেকে। পারদ-পতন তো দূর অস্ত্, রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের নীচেই নামছিল না! এমন পরিস্থিতিতে আমবাঙালির প্রশ্ন ছিল, শীত কি আর মিলবে না? বুধবার সকালেও জোরালো ছিল প্রশ্নটা। ভোরে হাওয়া অফিস মহানগরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করে ১৯.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের থেকে পাঁচ ডিগ্রি বেশি। কিন্তু দুপুরে এক পশলা হাল্কা বৃষ্টির পরেই তাপমাত্রা নেমে যায়। আবহবিদদের একাংশের অনুমান, চলতি সপ্তাহের শেষেই কলকাতার তাপমাত্রা ১৪ ডিগ্রির নীচে নেমে যেতে পারে।
হাওয়া অফিস সূত্রের খবর, মঙ্গলবার বিকেলে পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে বৃষ্টি হয়েছিল। বুধবার বরফ পড়ল সান্দাকফুতে। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকায় কনকনে ঠান্ডা। আগামী কয়েক দিন পশ্চিমের বিভিন্ন জেলাতেও জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়বে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির কাছাকাছি নেমে যেতে পারে।
এ বার দক্ষিণবঙ্গে শীতের মেজাজ অবশ্য মোটেই ভাল নয়। কখনও ওড়িশার ঘূর্ণাবর্ত, কখনও বা বাংলাদেশের উপরকার নিম্নচাপ অক্ষরেখার প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গে মেঘ ঢুকেছে। শীতের মরসুমে মেঘ জমলেই রাতের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। থমকে যায় পারদের পতন। কেন্দ্রীয় আবহবিজ্ঞান দফতরের কর্তারা বলছেন, এ বার গোটা দেশেই শীতের মেজাজ বেশ খারাপ। এর জন্য তাঁরা দায়ী করছেন ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা থেকে বয়ে আসা ঠান্ডা হাওয়া (পশ্চিমি ঝঞ্ঝা)-র দুর্বলতাকে। ওই ঝঞ্ঝাই কাশ্মীরে এসে তুষারপাত ঘটায়। জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়ে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে। আবার ওই সব এলাকা থেকে বয়ে আসা কনকনে উত্তুরে হাওয়ার হাত ধরে জাঁকিয়ে শীত পড়ে দক্ষিণবঙ্গে।
কিন্তু এ বার যে-সব ঝঞ্ঝা আসছে, তার বেশির ভাগই তেমন জোরালো নয় বলে জানাচ্ছেন কেন্দ্রীয় আবহবিজ্ঞান দফতরের ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল গোকুলচন্দ্র দেবনাথ। ঝঞ্ঝার সেই দুর্বলতায় উত্তর ভারতেই জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়ছে না। তুষারপাতও পর্যাপ্ত নয়। ফলে কনকনে ঠান্ডা নিয়ে আসতে পারছে না উত্তুরে হাওয়া। আবহবিদদের অনেকে বলছেন, দুর্বল ঝঞ্ঝার প্রভাবে মধ্য ভারতে ঘুর্ণাবর্ত তৈরি হচ্ছে। তার ফলে উত্তুরে হাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। সাগর থেকে জোলো হাওয়া ঠেলে ঢুকে পড়ছিল দক্ষিণবঙ্গের পরিমণ্ডলে। সেই জোলো হাওয়া ঘনীভূত হয়ে তৈরি করছিল মেঘ।
মাঘের শেষের বৃষ্টিকে শুভ লক্ষণ বলে প্রবচন। এটা মাঘ-সূচনার বৃষ্টি এবং এক দিক থেকে এটাও সুসমাচার বয়ে এনেছে বলেই মনে করছেন আবহবিদেরা। হাওয়া অফিস বলছে, শীতকালে বৃষ্টি হলেই তাপমাত্রা নামতে শুরু করে। কিন্তু এর আগে কলকাতা এবং দক্ষিণবঙ্গের আকাশ মেঘে ঢাকলেও বৃষ্টি নামেনি। এ দিনের বৃষ্টি সেই জন্যই ‘শুভ লক্ষণ’ বলে মানছেন আবহবিজ্ঞানীরা। গোকুলবাবু বলছেন, আজ, বৃহস্পতিবারেই কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৪ ডিগ্রির কাছাকাছি নেমে যেতে পারে। এবং এক ঝটকায় তাপমাত্রা পাঁচ ডিগ্রির মতো নেমে গেলে শীত ভালই অনুভূত হবে।
এ বছর শীতের যা মতিগতি, তাতে অবশ্য হাওয়া অফিসের আশ্বাসেও শীতপ্রেমীরা ভরসা পাচ্ছেন না। অনেকের প্রশ্ন, দিন দুয়েক শীত পড়েই গরম মাথাচাড়া দেবে না তো? শীতের আমেজ তেমন মিলবে না বলেই ধরে নিয়েছেন তাঁরা। হাওয়া অফিস বলছে, শীত এক ধাক্কায় বেশি দিন থাকে না। তবে উত্তর ভারতের পরিস্থিতি যা, তাতে নতুন করে কোনও ঘূর্ণাবর্ত বা নিম্নচাপ অক্ষরেখার সৃষ্টি না-হলে আগামী সপ্তাহেও শীত মিলবে বলে আশা করছেন আবহবিজ্ঞানীরা।