Advertisement
E-Paper

সুবিধা পেতে বিয়ের ভুয়ো শংসাপত্রের চক্র

বিয়ে করলে ১০ হাজার টাকা পাওয়ার কথা নির্মাণ শ্রমিকদের। শ্রম দফতরের উদ্যোগে এমন নিয়ম চালু রয়েছে ২০০৬ সাল থেকে। কিন্তু নিয়মের ফাঁক রেখে দেদার চলেছে বেনিয়ম।

অভিজিৎ চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০০:৩২

বিয়ে করলে ১০ হাজার টাকা পাওয়ার কথা নির্মাণ শ্রমিকদের। শ্রম দফতরের উদ্যোগে এমন নিয়ম চালু রয়েছে ২০০৬ সাল থেকে। কিন্তু নিয়মের ফাঁক রেখে দেদার চলেছে বেনিয়ম। টাকা পেতে হলে উপভোক্তাকে বিবাহ নিবন্ধন শংসাপত্র দাখিল করতেই হয়। আর সেখানেই চলছে ব্যাপক কারচুপি। এমনকী এই প্রকল্পকে ঘিরে তৈরি হয়ে গিয়েছে বড়সড় ভুয়ো বিবাহ নিবন্ধন চক্র।

ঘটনার তদন্তে নেমে চন্দ্রকোনা থেকে চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। উদ্ধার হয়েছে ভুয়ো স্ট্যাম্প, একাধিক সার্টিফিকেট। চক্রের মাথাদের ধরতে ধৃতদের জেরা শুরু করেছে পুলিশ। ঘাটালের সহ-শ্রম কমিশনার দীপনারায়ণ ভাণ্ডারী বলেন, “বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল। আমরা পুলিশকেও জানিয়েছিলাম। বাধ্য হয়ে ঘাটালে এখন ওই টাকা বিলি বন্ধ করে দিয়েছি।’’ পাশাপাশি তিনি জানান, এখন কেউ আবদেন করলে তাঁর স্ত্রীকে অফিসে হাজির থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দম্পতির ছবি তুলে রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দেখা হচ্ছে পঞ্চায়েত প্রধান বা পুরপ্রধানকে সার্টিফিকেটও।

সূত্রের খবর, মূলত গৃহ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরাই এই প্রকল্পের আওতায় আসেন। কিন্তু এই সুবিধাটি যাতে আরও বেশি সংখ্যক মানুষ পেতে পারেন তার জন্য মাটি কাটা, বিদ্যুতের খুঁটিতে উঠে কাজ-সহ বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদেরই এই সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। শ্রম দফতরের তথ্য অনুযায়ী ঘাটাল মহকুমায় ৭০ হাজার নির্মাণ কর্মী রয়েছেন। শ্রম দফতরে নাম নথিভুক্ত হওয়ার এক বছর পর থেকে কোনও নির্মাণ শ্রমিক ওই টাকা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হন।

বিয়ে করলেই ১০ হাজার টাকা। আর সংশ্লিষ্ট উপভোক্তার কন্যা সন্তান হলে দেওয়া হয় ৬ হাজার টাকা। দফতর সূত্রের খবর, কর্মীর অভাবে প্রথম প্রথম বিষয়টি নিয়ে তেমন প্রচার ছিল না। ফলে কেউই প্রায় জানতেনই না। সহ-শ্রম কমিশনার জানিয়েছেন, গত আর্থিক বছর থেকে হাজার হাজার আবেদন জমা পড়তে শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই বহু কর্মী টাকা পেয়ে গিয়েছেন। সহ-শ্রম কমিশনার দীপনারায়ণ ভাণ্ডারী বলেন, “সম্প্রতি প্রচুর আবেদন জমা পড়ছে। আর তখন থেকেই একটি দালাল চক্র নির্মাণ কর্মীদের সঙ্গে মিলে দুর্নীতিতে জড়াচ্ছে। বিষয়টি ধরা পড়ায় আমরা খুশি।’’

সাধারণত নথিভুক্ত কোনও নববিবাহিত কর্মীই অগ্রাধিকার পান। কিন্তু টাকা এসে পড়ে থাকায় প্রথম প্রথম দশ বা কুড়ি আগে বিবাহিত বহু কর্মীকেও টাকা দেওয়া হয়েছিল। সেখানেই বহু গরমিল ধরা পড়ছিল।

অভিযোগ, চন্দ্রকোনার কৃষ্ণপুরে বিবাহ নিবন্ধন আধিকারিক আবু জাফর মল্লিকের স্ট্যাম্প ও সই জাল করে একটি দালাল চক্র কর্মীদের ভুয়ো সার্টিফিকেট তৈরি করছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, ওই আবেদনপত্র শ্রম দফতর ছাড়াও বিডিও অফিসেও বিলি হয়। আবেদনপত্র যেখানে বিনামূল্যে পাওয়ার কথা, সেখানে তা চার থেকে পাঁচশো টাকায় বিক্রি হচ্ছিল বলে অভিযোগ।

ধৃতদের প্রাথমিক জেরায় পুলিশ জানতে পেরেছে, কর্মীদের সঙ্গেই চুক্তি করা হয়েছিল। অনেক সময়ই উপভোক্তা জানতেন না তাঁর কত টাকা প্রাপ্য, অথবা এমন কাউকে উপভোক্তা হিসাবে দেখানো হত যাঁর এই টাকা পাওয়ারই কথা নয়। ফলে উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে আসার পরই কারও কাছে পাঁচ হাজার টাকা কারোর কাছে চার হাজার টাকা পেত ওই চক্রের মাথারা।

সূত্রের খবর, ওই চক্রের বহু সদস্য এই রকম কর্মীদের বুঝিয়ে এই ব্যবসা চালাচ্ছিল। ঘটনায় সরকারি কোনও কর্মীর সঙ্গে ওই চক্রের যোগসাজস রয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখেছে পুলিশ। সম্প্রতি কৃষ্ণপুরের আনিনুর মল্লিক ও নাজিমা বিবির একটি বিবাহ নিবন্ধন শংসাপত্র আফজুল জাফর বাবুর হাতে আসতেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। সই ও স্ট্যাম্প তাঁর নিজের নয়, পরিষ্কার হওয়ার পরই ওই ম্যারেজ অফিসার চন্দ্রকোনা থানায় অভিযোগ করেন। অভিযোগ পেয়েই পুলিশ কৃষ্ণপুর থেকেই রেজাউল সরকার, আমানুল্লা মণ্ডল ও আসিফ আনোয়ারকে গ্রেফতার করে।

বৃহস্পতিবার রাতে তিনজনকে গ্রেফতার করার পর ধৃতদের জেরা করেই পুলিশ বহু তথ্য জানতে পারে। ঘটনার সঙ্গে সরকারি কর্মীদের যোগ থেকে একাধিক রাজনৈতিক দলের বহু নামও জানার পরই পুলিশ ধৃতদের পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার আবেদন করে। বিচারক ধৃতদের আট দিনের পুলিশি হেফাজতে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। চন্দ্রকোনা পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত চলছে। চন্দ্রকোনার এক ম্যারেজ অফিসার তথা আইনজীবী সমীর ঘোষ বলেন, “ঘটনায় কোনও ম্যারেজ অফিসার জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও পুলিশ ব্যবস্থা নিক। কেননা, এতে সরকারি টাকা নয়ছয় থেকে পেশাগত ক্ষতির শিকার হচ্ছিলাম।”

Chandrakona Fake marriage certificate police
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy