স্কুল-কলেজের মেধাবী ছাত্র। এলাকায় পরোপকারী হিসাবে পরিচিত। বুধবার চণ্ডীপুরে বিজেপির তরফে সংবর্ধনা নেওয়া সেই মানুষটা কী ভাবে কয়েক ঘণ্টা পরে খুন হয়ে গেলেন, তা-ই বুঝে উঠতে পারছেন কুলুপের গ্রামবাসী থেকে তাঁর সহপাঠীরা।
মধ্যমগ্রামের রাস্তায় দুষ্কৃতীদের গুলিতে খুন হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথ। আদতে চণ্ডীপুরের প্রত্যন্ত কুলুপ গ্রামের বাসিন্দা বাবা ওঙ্কারপদ রথ ছিলেন গ্রামীণ চিকিৎসক। মা হাসিরানি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত। দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় চন্দ্রনাথ। কুলুপ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পরে ভর্তি হয়েছিলেন বাড়ির অদূরে ইশ্বরপুর বিএম অ্যাকাডেমি হাই স্কুলে। ২০০০ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক পাশের পরে ভর্তি হয়েছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুরের জলচক হাই স্কুলে। ২০০২ সালে সেখান থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ-মাধ্যমিক পাশের পরে অঙ্কে অনার্স নিয়ে রহড়া বিবেকানন্দ সেন্টেনারি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। আর কলেজে পড়ার সময়েই ২০০৩ সালে ভারতীয় বায়ু সেনার চাকরি পেয়েছিল চন্দ্রনাথ। ‘টেকনিক্যাল পার্সন’ হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
চন্দ্রনাথ রথের সঙ্গে সেনার অ্যাভিয়েশন বিভাগে কাজ করতেন মেদিনীপুরের শান্তিনগরের বাসিন্দা তথা প্রাক্তন সেনাকর্মী কৌশিক চন্দ্র। কৌশিক বলেন, ‘‘খুব উজ্জ্বল ছিলেন চন্দ্রনাথ। হাসিখুশি থাকতেন। সহযোগিতা করার মানসিকতা ছিল। আমরা জলন্ধরে এক সঙ্গে তিন বছরে কাটিয়েছি। উনি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরেও পারিবারিক যোগাযোগ ছিল আমাদের। শেষ বার যোগাযোগ হয়েছিল ভোটের আগে। ভোটের পরে আবার কথা হবে বলে জানিয়েছিলেন। সেটা আর হল না!’’
পারিবারিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠা চন্দ্রনাথ ২০১৮ সালে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছাবসর নেন। সক্রিয় রাজনীতির বদলে শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহায়ক হিসাবে যোগ দেন। অবিবাহিত বছর বিয়াল্লিশের চন্দ্রনাথ গ্রামের বাড়িতে কম এলেও পরিবার এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। গ্রামের বাড়িতে মা, ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী এবং এক ভাইঝি থাকেন। আর রয়েছে চন্দ্রনাথের প্রিয় পোষ্য কুকুর ‘কোকো’। পরিবার সূত্রের খবর, গত ২৩ এপ্রিল বিধানসভা ভোট গ্রহণের দিন গ্রামের বাড়িতে ভোট দিতে এসেছিলেন। ভোটের ফলাফল প্রকাশের পরে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর কেন্দ্রের জয়ী প্রার্থী শুভেন্দু নন্দীগ্রামে গিয়েছিলেন। তাঁর সাথে ছিলেন চন্দ্রনাথ। এরপর বুধবার দুপুরে চণ্ডীপুরে এক অতিথিশালায় বিজেপির জয়ী প্রার্থী পীযূষকান্তি দাসের সংবর্ধনা সভায় উপস্থিত ছিলেন চন্দ্রনাথ। ওই রাতেই তিনি মধ্যমগ্রামের ফ্ল্যাটে যাওয়ার পথে খুন হন।
স্থানীয় সূত্রের খবর, চন্দ্রনাথ এলাকায় পরোপকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর এমন মৃত্যুতে হতবাক এলাকাবাসী। চন্দ্রনাথের জেঠতুতো ভাই দেবাশিস রথ বলেন, ‘‘স্কুলে বরাবরই প্রথম সারির ছাত্র ছিল ও। মাধ্যমিকে স্টার মার্কস পেয়েছিল। পরিকল্পিত এই খুনের ঘটনায় তৃণমূলের লোকজনই জড়িত।’’ চন্দ্রনাথের মামা কৌশিক দাসেরও অভিযোগ, ‘‘ঘটনায় তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জড়িত।’’ এলাকাবাসী তথা বিজেপির প্রাক্তন মণ্ডল সভাপতি দেবব্রত কর বলেন, ‘‘বুধবার দুপুরেও চণ্ডীপুরে চন্দ্রনাথের সঙ্গে ছিলাম। উনি বরাবরই এলাকার উন্নয়নের কাজ নিয়ে ভাবতেন। গতকাল আমাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, এখন আমরা সরকারে থাকায় ভাল করে এলাকায় কাজ করতে হবে। কিন্তু রাতেই এরকম দুঃসংবাদ পাব ভাবিনি।’’
বৃহস্পতিবারই চন্দ্রনাথের মাসির মেয়ের বিয়ের দিন ছিল। সেখানেও আসার কথা ছিল চন্দ্রনাথের। এ দিনই সন্ধ্যায় শববাহী গাড়িতে এসে পৌঁছয় তাঁর দেহ।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)