সাদা কাগজের কুঁচিতে ভরা রাস্তাগুলো সাদা কাগজের কুঁচিতে ভরা। উৎসবে উদ্যাপনের পরে যেমন ভরা থাকে রাস্তা। কাগজের কুঁচিগুলো বইখাতা, নকল করার কাগজের টুকরো। কেউ বেশ যত্ন করে তৈরি করেছে ভালবাসার চিহ্ন। এ সব মাধ্যমিক পরীক্ষার শেষদিনে ‘ভারমুক্ত’ শিক্ষার্থী বাহিনীর কীর্তি। যে কীর্তি দেখে প্রশ্ন উঠছে, পড়ুয়াদের বইখাতা ছিঁড়ে উচ্ছ্বাসের মনোভাব নিয়ে।
বুধবার ছিল জীবনবিজ্ঞান পরীক্ষা। এ দিনই মূল বিষয়ের পরীক্ষা শেষ হল। বৃহস্পতিবার ঐচ্ছিক পরীক্ষা রয়েছে। যাদের পরীক্ষা শেষ হয়েছে এ দিন তাদেরই একাংশ বইখাতা ছিঁড়ে উল্লাস করেছে বলে অভিযোগ। পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গিয়েছে কাগজে ভরা পথ। সেই ছবি অনেকে সমাজমাধ্যমে দিয়ে নাবালক পড়ুয়াদের ‘নৈতিকতার অবনমন’এর উৎস খুঁজছেন কেউ। কেউ শিক্ষার প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের স্পর্ধা।
এ দিন কেশিয়াড়ির বিভিন্ন এলাকায় থানা ও বিডিও অফিসের সামনে বইখাতার টুকরো পড়েছিল। কেশিয়াড়ি হাই স্কুলের পরীক্ষাকেন্দ্র চারটি স্কুলের পড়ুয়ারা পরীক্ষা দিয়েছে। কেশিয়াড়ি কন্যা বিদ্যাপীঠ কেন্দ্রে পাঁচটি স্কুলের পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেয়।
কেশিয়াড়ির কানপুরের বাসিন্দা তথা বাড়িতেই কথাবলা ও মনোযোগ পাঠাগার গড়ে তোলা কবি পরেশ বেরা বলেন, ‘‘সমাজ জুড়ে যে বিকৃত মানসিকতা চলছে এ তারই নিদর্শন। বইয়ের প্রতি ঘৃণা বা অবহেলা থেকে নয়। পরীক্ষা শেষ আর ওই বইয়ের প্রয়োজন নেই। এমন একটা মনোভাব। আর এখন তো বইয়ের প্রতি ভালবাসা অধিকাংশ মানুষের নেই। আমরা এখনও মাধ্যমিকের বই গুছিয়ে রেখেছি।’’
সবংয়ের দশগ্রাম এলাকাতেও দেখা গিয়েছে বইখাতা ছেঁড়ার উচ্ছ্বাস। কেশিয়াড়ি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিশিকান্ত জানা বলেন, ‘‘এটা সামাজিক অবক্ষয় ছাড়া কিছু নয়। তবে ক্যাম্পাসে কিছু করেনি। এই প্রভাব কোথা থেকে এসে পড়ল জানা নেই। এখন পড়াশোনার মান কমেছে। চুরি, টুকলি বেড়েছে। ঘটেছে নৈতিক অবনমন।’’
পড়ুয়াদের আচরণের নিন্দা জানিয়েছে প্রধান শিক্ষকদের সংগঠন ‘অ্যাডভান্সড সোসাইটি ফর হেডমাস্টার্স অ্যান্ড হেডমিস্ট্রেসেস’। সংগঠনের খড়্গপুর মহকুমা শাখার সম্পাদক তথা নারায়ণগড়ের শশিন্দা সাগরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপঙ্কর তেওয়ারি বলেন, ‘‘সমাজ জুড়ে শৃঙ্খলার অভাব। সেই প্রভাব পড়ুয়াদের উপরেও পড়ছে। তবে কিছু ছাত্র এমন করলেও সবাই এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত নয়।’’ তিনি জানিয়েছেন, গতবারের তুলনায় বইখাতা ছেঁড়ার ঘটনা এ বছর অনেক কম।
ঝাড়গ্রাম জেলার বিভিন্ন বাসস্টপেও বই, নকল করার কাগজ ছিঁড়ে উল্লাস করেছে পড়ুয়ারা। ঝাড়গ্রাম উড়ালপুলের দু’পাশ ছেঁড়া কাগজে ভরে ছিল। গোপীবল্লভপুর-১ নয়াবসান জনকল্যাণ বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক তুষারকান্তি মহাপাত্র বলেন, ‘‘এই প্রবণতা প্রতি বছর বাড়ছে। বই পড়ার প্রবণতা কমে গিয়েছে। ওরা এক প্রকার চ্যালেজ্ঞ জানিয়ে বই খাতা ও কাগজ ছিঁড়ে উল্লাস করছে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)