তরমুজ চাষে সবুজ বিপ্লব।
পশ্চিম মেদিনীপুরের সাঁকরাইলের তরমুজ দেদার বিকোচ্ছে কলকাতার বাজারে। সাঁকরাইলের কোদোপালে এ বার গ্রীষ্মে সরকারি জমিতে ২৫ হাজার কুইন্ট্যাল তরমুজ ফলিয়েছিলেন এই এলাকার চাষিরা। সংখ্যায় প্রায় সাড়ে ১৩ লক্ষ তরমুজ। রেকর্ড ফলনে দাম পড়ে যায়নি। কারণ প্রশাসনের উদ্যোগে ব্র্যান্ডিং করে সেই তরমুজ পৌঁছে গিয়েছে হাওড়া, কলকাতা, বারাসতের বাজারে। প্রতি বিঘাতে গড়ে ২০-২৫ হাজার টাকা লাভ করে হাসি ফুটেছে চাষিদের মুখে।
শুধু তরমুজ নয়, কোদোপালে নানা ধরনের ফল ও শাকসব্জির চাষ হচ্ছে। এখানে চারশো একর জমিতে ব্লক প্রশাসনের উদ্যোগে বহুমুখী কৃষি খামার গড়ে তোলা হয়েছে। খামারের ৯০ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষের জন্য এই বছর থেকে মরসুমি লিজ দেওয়া চালু করেছে প্রশাসন। স্থানীয় ৩০ জন আদিবাসী যুবককে বেছে নেওয়া হয়। যাঁদের নিজস্ব চাষজমি নেই। প্রশাসনের উদ্যোগে তাঁদের চাষ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর পর নামমাত্র টাকায় তাঁদের প্রত্যেককে গড়ে তিন থেকে চার বিঘা করে জমি লিজ দেওয়া হয়। এক বার চাষের জন্য লিজের দর পাঁচশো থেকে এক হাজার টাকা। উন্নত প্রজাতির বীজ ফেলে চাষ শুরু হয় চলতি বছরের গোড়ায়। গত তিন মাসে তারই রেকর্ড ফলন হয়েছে।
কিন্তু শুধু ফলন করলে হবে না। চাই বিপণনের ব্যাবস্থা। সে জন্য ব্লক প্রশাসনের উদ্যোগে কোদোপালের তরমুজের ব্র্যান্ডিং (কোদোপাল ফ্রুট বাস্কেট) করা হয়। সাঁকরাইল বিডিও সৌরভ চট্টোপাধ্যায় জানান, কয়েক দিন স্থানীয় আড়তদারদের মাধ্যমে তরমুজ বাজারে পাঠানো হচ্ছিল। ক্রমে কোদোপালের তরমুজের কদর বাড়তে থাকে। কিছু দিনের মধ্যেই ধুলাগড়, হাওড়া, কলকাতা, বারাসত থেকে ব্যবসায়ীরা সরাসরি কোদোপালে এসে হাজার হাজার তরমুজ নিয়ে যান। কলকাতার নানা বাজারে এ বার ‘কোদোপাল ফ্রুট বাস্কেট’-এর তরমুজ ভাল বিক্রি হয়েছে। সৌরভবাবু বলেন, “এই সাফল্যের পরে বিকল্প অর্থকরী কৃষিজ পণ্য হিসেবে অনেকেই তরমুজ চাষ করতে আগ্রহী হচ্ছেন।”
সাঁকরাইল ব্লকের প্রযুক্তি সহায়ক বোধিসত্ত্ব মাইতি এবং ব্লকের সহকারি প্রকল্প আধিকারিক অভিজিত্ পৈড়া জানান, ডুলুং ও সুবর্ণরেখার মধ্যবর্তী উর্বর কোদোপাল চরের মাটি পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছিল, তরমুজ চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেখানে যে এমন অভূতপূর্ব ফলন হবে, তা কেউই ভাবতে পারেননি।
হরেকৃষ্ণপুর, বাহাদুরপুর, ধিতপুর গ্রামের শিশির সিংহ, অমীর বধূক, দুলাল সিংহ, গৌরাঙ্গ সিয়ান, সন্দীপ সিংহরা জানান, একশো দিনের কাজের মজুরির জমানো টাকা দিয়ে তাঁরা তরমুজ চাষ করেছেন। প্রতি বিঘেতে চাষের খরচ পড়েছে ১২-১৫ হাজার টাকা। চাষের খরচ বাদ দিয়ে বিঘা প্রতি কেউ ২০ হাজার টাকা লাভ করেছেন। কেউ আবার ৩০ হাজার টাকা লাভ করেছেন। হিসেব কষলে লাভের অঙ্কটা কম নয়। সব মিলিয়ে ষাট হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত লাভ করেছেন চাষি। দুলালবাবুদের কথায়, “নিজের জমি ছিল না। সরকারি জমিতে তরমুজ চাষ করে সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে। আমরা এর পর প্রতি বছর তরমুজ চাষ করব। অন্যদেরও জানাচ্ছি, এই চাষে দ্বিগুণ লাভের কথা।” বিডিও বলেন, “উপভোক্তার বাড়িতে নাবার্ড-এর সহযোগিতায় কেঁচো-সার তৈরির প্ল্যান্ট বসানো হবে। এর ফলে, তরমুজ চাষিরা জৈব সার তৈরি করতে পারবেন। তাতে আগামী বছর তরমুজ চাষে আরও লাভের সুযোগ রয়েছে।”