গত দেড় বছরে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে কলেজ পরিচালন সমিতি একটিও বৈঠক করতে পারেনি। ফলে কলেজের পঠনপাঠনের মান উন্নয়ন দূর, সাধারণ পরিকাঠামোও তৈরি করা যায়নি। কলেজের টিচার-ইন-চার্জ হরিপদ মহাপাত্র অসহায়তার কথা জানিয়ে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে চিঠিও দিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই হোক পরিচালন সমিতির বৈঠক। বুধবার বৈঠকও ডাকা হয়েছিল। সেই বৈঠকও ভেস্তে গেল!
কারণ, পরিচালন সমিতির ৯ জন সদস্যের মধ্যে ৬ জনই অনুপস্থিত। হাজির ছিলেন মাত্র তিনজন। এমনকি যাঁর চিঠির ভিত্তিতে এই বৈঠক ডাকা হয়েছিল, বৈঠকে গরহাজির সেই টিচার-ইন-চার্জও! হাজির ছিলেন বর্তমান পরিচালন সমিতির সভাপতি অমিয় মহাপাত্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি সবিতাব্রত রায় ও কলেজের শিক্ষক প্রতিনিধি নির্মল বর্মণ। এমন ঘটনা ঘটেছে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সাঁকরাইল ব্লকের ‘সাঁকরাইল অনিল বিশ্বাস স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ে।
২০০৭ সালের জুলাই মাসে সাঁকরাইল অনিল বিশ্বাস স্মৃতি মহাবিদ্যালয় তৈরি হয়েছিল। কলেজ তৈরির পর একটি অস্থায়ী কমিটি তৈরি করা হয়েছিল। ২০১২ সালে কলেজে নতুন পরিচালন সমিতি তৈরি হয়। সমিতির শেষ বৈঠক করেছিল ২০১৩ সালের ১১ ডিসেম্বর। তারপর বারবার বৈঠক ডাকা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সদস্যদের অনুপস্থিতির কারণে বৈঠক করা যায়নি। ফলে আটকে কলেজের জমি কলেজের নিজের নামে করা, শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মী নিয়োগের জন্য পদক্ষেপ করা, গ্রন্থাগার তৈরি, গ্রন্থাগারিক নিয়োগ সংক্রান্ত নানা বিষয়। এমন জটিলতার মধ্যে সিদ্ধান্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয়েই করা হবে বৈঠক।
কিন্তু এ দিনের বৈঠকে হাজির ছিলেন অধিকাংশ সদস্যই। বৈঠকে গরহাজির কলেজের টিচার-ইন-চার্জ হরিপদ মহাপাত্রের দাবি, “বুধবার বৈঠকের কথা জেনে তৃণমূলের একাংশ মঙ্গলবারই আমাকে অপহরণ করে বৈঠকে না যাওয়ার ফরমান জারি করে। আমাকে তো চাকরি করতে হবে, তাই ভয়ে বৈঠকে যাওয়ার সাহস পাইনি।” যদিও এই ভয়েই তিনি থানায় পর্যন্ত লিখিত অভিযোগ জানাননি বলে দাবি। অভিযুক্ত তৃণমূলের সাঁকরাইল ব্লক সভাপতি সোমনাথ মহাপাত্রের কথায়, ‘হরিপদ মহাপাত্র এই তো সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ আগে ফোন করেছিলেন। কই তিনি তো অপহরণের বিষয়ে কিছু বললেন না। আমরা ওঁকে অপহরণ করতে যাব বা কেন? সব বাজে গুজব।”
বৈঠকে ছিলেন কলেজ পরিচালন সমিতির বর্তমান সভাপতি অমিয় মহাপাত্র। কলেজে বৈঠক না করতে পারার পিছনে তাঁর যুক্তি, “আমি বারবার বৈঠক ডাকতে চেয়েছিলাম। বর্তমানে কলেজের বিভিন্ন কাজে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, এই আশঙ্কাতে বৈঠক এড়াতে চাইছেন অনেকে।” পরিচালন সমিতির সভাপতি আপনি, অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠবে কার বিরুদ্ধে? তাঁর কথায়, “দলের ব্লক সভাপতির অঙ্গুলিহেলনে টিচার-ইন-চার্জ নানা ধরনের কাজ করছেন। তাই তো টিচার-ইন-চার্জ নিজেও অনুপস্থিত। এর থেকে বড় প্রমাণ আর কী রয়েছে?” বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ সমূহের পরিদর্শক বিনয় চন্দের কথায়, ‘‘অর্ধেকের বেশি সদস্য গরহাজির থাকায় কোরাম হল না। ফলে বৈঠক করা যায়নি। কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত মেনেই পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।”
কিন্তু কেন এমন সমস্যা? স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই কলেজের রাশ কার হাতে থাকবে তা নিয়ে স্থানীয় নেতা রমেন দাস ও দলের ব্লক সভাপতি সোমনাথ মহাপাত্রের দ্বন্দ্ব রয়েছে। বর্তমান পরিচালিত সমিতির সভাপতির কথায়, “কলেজের ক্ষতি হচ্ছে বুঝেই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈঠকেও উপস্থিত হয়েছি। কিন্তু অন্যেরা ভাল না চাইলে কী করতে পারি?”
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, একটি নির্বাচিত পরিচালন সমিতির মেয়াদ ৪ বছর। তার আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হস্তক্ষেপ করতে পারেন না।
তাহলে কী এই ডামাডোল পরিস্থিতিই চলতে থাকবে? বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এক্ষেত্রে এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করতে পারেন। তারপর ফের নির্বাচনের মাধ্যমে পরিচালন সমিতি তৈরি করতে হবে। ফলে, পরবর্তী এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের বৈঠকের আগে পর্যম্ত ঝুলেই থাকল এই কলেজের ভবিষ্যত্।