১৭ বছরের হবু বরকে নিয়ে পাকা দেখতে মেয়ের বাড়িতে হাজির ছেলেটির অভিভাবকরা। ১২ বছরের কিশোরীটির বাড়িতে আত্মীয়-পরিজন গিজগিজ করছে। ঘিয়ে ভাজা লুচির গন্ধের সুবাসে খিদে বেড়ে গিয়েছে অতিথি-অভ্যাগতের। পাকা কথার পরে লুচি-মিষ্টির পাতে সবে হাত পড়েছে। আচমকা ছন্দপতন!
পুলিশ নিয়ে হাজির লালগড়ের বিডিও জ্যোতিন্দ্রনাথ বৈরাগী। সঙ্গে লালগড় পঞ্চায়েত সমিতির বন ও ভূমি কর্মাধ্যক্ষ উদয়শঙ্কর রায়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় লালগড়ের গ্রামের গিয়ে মেয়েটির বাড়িতে সটান হাজির হয়ে বিডিও জানিয়ে দেন, নাবালক-নাবালিকার বিয়ে দিলে দু’পক্ষকেই হাজতবাস করতে হবে। দফায় দফায় আলোচনা, তর্ক ও বোঝানোর পরে অবশেষে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ওই নাবালিকার বিয়ে বন্ধ করতে পেরেছে প্রশাসন। মেয়েটি বিডিওকে জানায়, অভিভাবকরা জোর করেই বিয়েতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। মেয়েটির অভিভাবকরা মুচলেকা দিয়ে জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে নাবালিকা মেয়ের বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না তাঁরা। কিন্তু এখানেই থেমে থাকেন নি বিডিও। মকর-পরবের পরে স্কুল খুললে মেয়েটি নিয়মিত স্কুলে হাজির হচ্ছে কি-না সে ব্যাপারে নজরদারি চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
লালগড়ের এই গ্রামের জেতোড় সম্প্রদায়ের একাংশের মধ্যে কম বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। জেতোড় সম্প্রদায়ের লোকজন বংশানুক্রমিক ঝাঁটাশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। খেজুরপাতা দিয়ে ঝাঁটা তৈরি করা হয়। ওই নাবালিকার বাবাও একই কাজ করেন। স্থানীয় একটি মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রের (এমএসকে) পড়ুয়া মেয়েটি এবারই সপ্তম শ্রেণি তে উত্তীর্ণ হয়েছে। এরপরই মেয়েটির অভিভাবকরা বিয়ে দেওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করে দেন। মেদিনীপুর কোতোয়ালি থানার ভাটপাড়া গ্রামের একই সম্প্রদায়ের ১৭ বছরের স্কুলছুট এক কিশোরের সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা এগোয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মারুতি ভ্যানে চেপে ছেলেটি ও তার অভিভাবকেরা লালগড়ে মেয়েটিকে পাকা দেখার জন্য আসেন। অসময়ে বিয়েতে রাজি ছিল না মেয়েটি। কিন্তু প্রতিবাদ করার কোনও উপায়ও ছিল না। তবে পড়শিদের কয়েকজন লালগড় পঞ্চায়েত সমিতির বন ও ভূমি কর্মাধ্যক্ষ উদয়শঙ্কর রায়কে ঘটনাটি জানিয়ে দেন। উদয়শঙ্করবাবু সঙ্গে সঙ্গে বিডিও’কে খবর দেন। লালগড় থানার পুলিশ নিয়ে ছুটে যান বিডিও জ্যোতিন্দ্রনাথবাবু। সঙ্গী হন উদয়বাবু। বিয়ে বন্ধের কথা বলতে মেয়েটির বাড়ির লোকজন ও পরিজনরা তর্ক জুড়ে দেন। আইনের বিধান জানিয়ে ছেলে ও মেয়েটির বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন বিডিও। ছেলে ও মেয়েটির সঙ্গেও আলাদা করে কথা বলেন তিনি। ঘন্টাখানেক বোঝানোর পরে বিয়ের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসেন উভয়পক্ষ। মেয়েটির বাবার বক্তব্য, “প্রশাসন তো বিয়ে বন্ধ করল। আমরাও লিখিতভাবে মেনে নিলাম। কিন্তু সময়ে মেয়ের বিয়ে না দিলে তো সমাজে নিন্দে হবে!”
লালগড়ের বিডিও জ্যোতিন্দ্রনাথ বৈরাগী বলেন, “মানুষগুলির মনের অন্ধকার দূর করার জন্য সব মহলকে আরও সক্রিয় হতে হবে। এলাকায় বাল্যবিবাহ বিরোধী প্রচার ও কর্মসূচি আরও জোরদার করা হবে।” বিডিও জানান, ওই নাবালিকা মেয়েটি অষ্টম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরে কন্যাশ্রী প্রকল্পের আওতায় আসবে। মেয়েটি যাতে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারে এবং অভিভাবকরা যাতে ফের জোর করে বিয়ে না দিতে পারেন, সেজন্য সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।”