জঙ্গলমহলের একটি বেসরকারি পিটিটিআই কলেজে ঢুকে তাণ্ডব চালানোর অভিযোগ উঠল স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের বিরুদ্ধে। গোলমাল চলাকালীন কলেজের পরিচালন কমিটির এক সদস্যকে নিগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ। বুধবার সকালে পশ্চিম মেদিনীপুরের সাঁকরাইল ব্লকের কুলটিকরি এলাকার ঘটনা।
মাস দেড়েক হল কুলটিকরিতে চালু হয়েছে ‘কুলটিকরি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট অফ হায়ার স্টাডিজ’ নামে ওই বেসরকারি কলেজটি। এনসিটিই এবং পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের অনুমোদন প্রাপ্ত ওই কলেজে গত মে মাস থেকে কর্মরত প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য ডিএলএড (ওডিএল) কোর্সের ক্লাস শুরু হয়ে গিয়েছে। গত ১০ জুন থেকে ডিএলএড কোর্সে নতুন প্রার্থীদের ভর্তির জন্য ফর্ম দেওয়া শুরু হয়েছে।
অভিযোগ, কলেজ চালু হওয়ার পরই স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের একাংশের দাদাগিরি শুরু হয়। তাঁদের দাবি, কলেজে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী নিয়োগের ব্যাপারে স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। এ জন্য কয়েকদিন আগে কলেজ কর্তৃপক্ষকে তৃণমূলের স্থানীয় দলীয় কার্যালয়ে আলোচনার জন্য ডেকে পাঠানোও হয়। কর্তৃপক্ষ অবশ্য তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে যাননি। এরপর গত ২২ মে কলেজে ঢুকে কর্মরত প্রাথমিক শিক্ষকদের ডিএলএড (ওডিএল) কোর্সের ক্লাস জোর করে বন্ধ করে দেন তৃণমূল কর্মীরা।
এ দিন সকাল সাড়ে ১০ টা নাগাদ ডিএলএড কোর্সে ভর্তির ফর্ম দেওয়া ও জমা নেওয়ার কাজ চলাকালীন জনা দশেক তৃণমূল কর্মী বাঁশ হাতে নিয়ে কলেজে ঢোকেন বলে অভিযোগ। স্থানীয় তৃণমূলের লোকজন কলেজে ঢুকে অধ্যক্ষ নন্দদুলাল দত্ত-র কাছে কৈফিয়ত্ চান, বলা সত্ত্বেও কলেজের তরফে কেউ দলীয় কার্যালয়ে নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করতে যান নি কেন?
কলেজের সম্পাদক মৃণালকান্তি বারিক ওই সময় কলেজে ছিলেন না। তবে মৃণালবাবুর ভাই তথা পরিচালন কমিটির অন্যতম সদস্য মিঠুন বারিক ছিলেন। তাঁকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে আলোচনায় না-বসলে কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হবে। মিঠুনবাবু অবশ্য পার্টি অফিসে যেতে রাজি হননি। তাঁর অভিযোগ, “কলেজেই আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তারপরই ওরা ক্ষেপে গিয়ে কলেজের প্রধান ফটক বন্ধ করে দিয়ে কলেজ ভবনের ভাঙচুর করতে শুরু করে। বাঁশ নিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসে কয়েকজন।”
মারমুখি তৃণমূল কর্মীদের দেখে ফর্ম তুলতে আসা প্রার্থীরা আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করে দেন। প্রায় মিনিট কুড়ি এই তাণ্ডব চলে। গোলমাল থামাতে অবশ্য আসরে নামেন শাসক দলের স্থানীয় কর্মীরাই। তাঁরাই মারমুখি কর্মীদের কলেজ থেকে বার করে নিয়ে যান। এমন ঘটনায় রীতিমতো হতভম্ব কলেজ কর্তৃপক্ষ। সাঁকরাইল থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন মিঠুনবাবু। তবে, হামলাকারীদের নাম জানাতে পারেননি। এখনও পর্যন্ত পুলিশ কাউকে ধরতে পারেনি বলে জানিয়েছে।
এ দিকে, স্থানীয় সূত্রের খবর, মিঠুনবাবু পুলিশে অভিযোগ দায়ের করারই পরই তৃণমূলের পক্ষ থেকে কলেজ কর্তৃপক্ষের উপর চাপ দেওয়া শুরু হয়েছে। তৃণমূলের তরফে কলেজ কর্তৃপক্ষকে যে দলীয় কার্যালয়ে ডাকা হয়েছিল, সে কথা স্বীকার করতেই চান না সাঁকরাইল ব্লক সভাপতি সোমনাথ মহাপাত্র। তাঁর দাবি, “ওই কলেজে ভর্তির সময় পড়ুয়া পিছু তিনলক্ষ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় মানুষ এ সবের প্রতিবাদ জানাতেই কলেজে গিয়েছিলেন। তার মধ্যে আমাদের সমর্থক থাকতে পারেন। শিক্ষার নামে এমন ব্যবসা আমরা মেনে নেব না।’’
তবে কলেজের সম্পাদক মৃণালকান্তি বারিক বলেন, “ডিএলএড কোর্সে ভর্তির ফর্ম দেওয়া ও জমা নেওয়া হচ্ছে। এখনও মেধা তালিকা প্রকাশ করাই হয়নি। ফলে টাকা নেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন।”
মৃণালবাবুর কথা মতো তিনি নিজেও তৃণমূল সমর্থক। কিন্তু গত দেড় মাস ধরে স্থানীয় তৃণমূল কর্মীরা কর্মী নিয়োগ-সহ নানা দাবিতে পার্টি অফিসে অফিসে গিয়ে আলোচনার দাবিতে অধ্যক্ষকে হুমকি দিচ্ছেন। এমন অশান্তির জন্য কলেজ চালানো মুস্কিল হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। মৃণালবাবুও পাল্টা জানিয়েছেন, ‘‘এতদিন আমরা চুপ করেছিলাম। জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারকে বিষয়টি লিখিত ভাবে জানাব। প্রয়োজনে মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ হব।”
পুলিশের অবশ্য বক্তব্য, “কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্থানীয় কিছু লোকের বচসা হয়েছিল। বহিরাগতরা একটা নোটিশ বোর্ড ভেঙেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।” স্থানীয় সূত্রের খবর, কুলটিকরিতে প্রায় এক একর জমির উপর ওই বেসরকারি কলেজটি গড়ে তোলা হয়েছে। দোতলা ভবনটি তৈরি হয়ে গিয়েছে। এখন ভবনের তিন তলা তৈরির কাজ চলছে।