কুয়াশার চাদর সরিয়ে তখনও আলস্য কাটেনি আকাশের সুয্যিমামার। শহরের পথবাতির আলোয় পথ দেখে তিনি কিন্তু হাজির। আর তাঁর ডাকে গুটি গুটি পায়ে হাজির হয়েছে খুদেরাও। শীতের রবিবারে একটি ঘন্টায় কিছু কসরৎ শিখে নিয়ে সারা সপ্তাহ জুড়ে তার অনুশীলন করতে। শিশু কিশোরদের জড়িয়ে নিয়ে শীতের দিনগুলিতে এমনই ওম গত ২৫ বছর ধরে ছড়িয়ে আসছেন আর এক সূর্য। এগরা শহরের কসবা এলাকার বাসিন্দা ৬৮ বছরের সূর্যনারায়ণ দাস। কচিকাঁচাদের কাছে যিনি সূর্য দাদু বা ব্যায়াম দাদু।
পেশায় ব্যবসায়ী সূর্যবাবু খবর কাগজেরও এজেন্ট। তবে শহরবাসী তাঁকে অন্যরকম মানুষ হিসাবেই বেশি চেনে। যেমন চিনছে কচিকাঁচারা। আবার পুজোর সময় শহরের পুজোর গাইড ম্যাপ, সারা বছর ধরে বাস ও ট্রেনের সময়সূচি ছাপিয়ে বিনামূল্যে বিতরণ করেন। বছর কয়েক আগে শহরের সমস্ত দোকানপাট, নানা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ইত্যাদি ও বিভিন্ন পেশার মানুষ জনের ফোন নম্বরসহ এক নজরে এগরা নামে একটি বই প্রকাশ করেন। যাতে ঘরে বসেই মানুষ নানা প্রয়োজনে সহজেই তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। তবে অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ছ’মাস ধরে প্রতি রবিবার তাঁকে দেখা যায় অন্য চেহারায়। ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কসবা নিম্ন বুনিয়াদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে মাঠে তিনি শতাধিক শিশু কিশোরের সঙ্গে দৌড়চ্ছেন, লাফাচ্ছেন,হাঁটছেন, খোলা হাতে ব্যয়াম শেখাচ্ছেন। শেখাচ্ছেন অট্টহাসি, মুখে নানারকম শব্দ করতে। কৃষ্ণা মাইতি নামে এক অভিভাবিকার কথায়, ‘‘বিষয়টি বাচ্চাদের কাছে নেশার মতো হয়ে গিয়েছে। আমাদের ঘুম ভাঙার আগে ওরা উঠে পড়ে সূর্যবাবুর নির্দেশ মতো। শুরু করে দেয় ব্যায়াম। আর রবিবার হলেই মাঠে আসার জন্য তাড়া দেয়।”
ব্যবসার কাজে প্রায়ই কলকাতা গিয়ে পৌঁছতে হত ভোরে। সেখানেই বিভিন্ন পার্কে ও মাঠে দেখতেন শিশু থেকে বৃদ্ধদের এই কসরত। দেখাদেখি প্রথমে পাড়ার বাচ্চাদের নিয়ে শুরু করেন ১৯৯২ সালে। সূর্যবাবুর বিশ্বাস, শীতে সকলের মধ্যেই জড়তা আসে। ভোরে উঠতে চান না অনেকেই। বেলা পর্যন্ত আলসেমি করে কাটায় শিশু কিশোর থেকে শুরু করে সবাই। কিন্তু ভোরে উঠে শরীরচর্চা করার অভ্যাস থাকলে মানুষ সুস্থ ও চনমনে থাকবে। এটা সকলেই জানে কিন্তু মানে না। তাই বলেন, ‘‘বাচ্চারা শিখলে বড়রাও তো শিখবে। তাই এই উদ্যোগ।” তাঁর এই উদ্যোগে পাশে রয়েছেন স্ত্রী মিনতিদেবী, ছেলে অরিন্দম। নাতি সায়ন্তন প্রতি ভোরে তাঁর পাশেই থাকে। সূর্যবাবুর কাছে কয়েক বছর ধরে শিখে এখন সূর্যবাবুর পাশাপাশি বাচ্চাদের কসরৎ শেখাচ্ছে তরুন প্রজন্মের সায়ন্তন দাস, শুভাশিস আইচ, সৌম্যদীপ দাসেরা।
সূর্যের আলো ছড়াচ্ছে এভাবেই।